প্রাচীন এই মন্দিরের আদলেই তৈরি হয় সংসদ ভবন! ভারতের অজানা ইতিহাস, নাকি স্রেফ মিথ?

Chausath Yogini Temple Mitaoli : মূল ওই গোলাকার মঞ্চেই সেই সময় হতো পুজো পার্বণ। সেইসঙ্গে হতো নাচও। এখন অবশ্য সেসবের প্রতিধ্বনিও মুছে গিয়েছে।

inscript
৩ মিনিট
প্রাচীন এই মন্দিরের আদলেই তৈরি হয় সংসদ ভবন! ভারতের অজানা ইতিহাস, নাকি স্রেফ মিথ?

চম্বল নদীর নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন। সেই চম্বল থেকে প্রায় ৪৭ মাইল দূরে পাহাড় আর এবড়োখেবড়ো পাথরের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে একটা মন্দির। পাথরের তৈরি সেই প্রস্তরসৌধের ওপর রোদের আলো ঝিলিক মেরে যায়। কিন্তু অন্যান্য মন্দিরের মতো নয় এটি। প্রাচীনত্বের ছোঁয়া যেন প্রতিটি ধাপে, ভাঙা ইটের খাঁজে লেগে রয়েছে। আলো আর ছায়ার এই লুকোচুরির মধ্যেই আপনাকে স্বাগত জানিয়েছে মধ্যপ্রদেশের মিতাউলি জায়গাটি। আর সেখানেই রয়েছে এই অদ্ভুত, রহস্য আর মিথে ঢাকা এই শিব মন্দির। তবে ইতিহাস স্রেফ শিব মন্দির হিসেবে একে মনে রাখেনি। বরং স্থানীয়দের কাছে এর পরিচয় ‘যোগিনী মন্দির’ হিসেবেই। আরও ভালো করে বললে, চউসাট যোগিনী মন্দির।

গোয়ালিয়রের কাছেই এই মিতাউলি গ্রাম। আর গ্রামেরই এক পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই যোগিনী মন্দির। একটু ভেতরে ঢুকলে সমস্ত ছবিটা আপনার নজর কাড়তে বাধ্য। ঠিক মধ্যিখানে রয়েছে গোলাকার একটি মঞ্চ। আদতে সেটাই মন্দির। থামের আড়াল আবডালে লুকোচুরি খেলতে খেলতে পৌঁছে যাবেন মূল জায়গায়। ছোট্ট একটি দরজা, আর তার ভেতরেই রয়েছে শিবলিঙ্গ। ইতিহাস বলে, ১১-শ শতকের আশেপাশে কচ্ছপাঘাটার মহারাজ দেবপাল এটি তৈরি করেছিলেন। মূল ওই গোলাকার মঞ্চেই সেই সময় হতো পুজো পার্বণ। সেইসঙ্গে হতো নাচও। এখন অবশ্য সেসবের প্রতিধ্বনিও মুছে গিয়েছে।

এসব ভাঙা কাহিনির পাশেই রয়েছে আরও বিস্ময়। কেবল গোলাকার মঞ্চ নয়, গোটা মন্দিরটিরই আকৃতি বৃত্তাকার। ভেতরে শিব মন্দির ঘিরে রয়েছে ৬৪টি কক্ষ। আর প্রতিটি কক্ষে একজন করে পাথরে খোদাই করা নারীমূর্তি। শাস্ত্রমতে, এঁরাই হলেন যোগিনী। মোট ৬৪ জন যোগিনী ঘিরে রয়েছে পুরো মন্দিরটিকে। সেজন্যই এর নাম চউসাট যোগিনী মন্দির (হিন্দিতে চউসাট মানে চৌষট্টি বা ৬৪)। ঐতিহাসিকরা বলেন, ভারতের নানা প্রান্তে এরকম বেশকিছু যোগিনী মন্দির তৈরি হয়েছিল। মিতাউলির এই মন্দিরটি এখনও ধুলোয় মিশে যায়নি। তাই ঐতিহাসিকদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

কিন্তু যোগিনী মূর্তি কেন? এর জন্য যেতে হবে প্রাচীন ভারতের সামাজিক ও পৌরাণিক কথায়। আজকে দিল্লি কিংবা মুম্বইয়ের মতো জায়গাতেও মেয়েরা নিজেদের সুরক্ষিত মনে করেন না। গার্হস্থ্য হিংসা তো আছেই, সেইসঙ্গে রয়েছে ধর্ষণ, খুন। নির্ভয়া থেকে কামদুনি, কিংবা হালের শ্রদ্ধা ওয়ালকরের নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের আতঙ্কিত করেছে। কিন্তু একটা সময় এই মেয়েদেরই সম্মান ছিল অনেকটা উঁচুতে। ইতিহাস সাক্ষী থেকে সীতা, দ্রৌপদী কিংবা গার্গীদের কাহিনির। যোগিনী মন্দির আসলে সেই নারীদের, নারীশক্তিকেই সম্মান জানায়। শিবলিঙ্গ থাকলেও মূলত যোগিনীদের মূর্তি পূজিত হয়। আর মন্দিরের ছাদ বলেও কিছু নেই, পুরোটাই খোলা আকাশের নীচে। প্রকৃতিকে আহ্বান করাও তো একরকমের সাধনাই।

হিন্দু পুরাণ বলে, যে নারীরা যোগশাস্ত্রের অধ্যায়ন করতেন, চর্চা করতেন, তাঁরাই যোগিনী। নারীরা আসলে মুক্ত বিহঙ্গ, প্রকৃতির রূপ ধরা দেয় তাঁদের আত্মায়, শরীরে। সেই কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা এই মন্দির। বেশিরভাগেরই আকৃতি এমন গোলাকার হয়। তবে স্থাপত্যের দিক দিয়েও মিতাউলির এই চউসাট যোগিনী মন্দির অনন্য। গোটা মন্দিরে অজস্র ছোট ছোট ছিদ্র রয়েছে, যাতে বৃষ্টি হলে জল না দাঁড়ায়। সেইসঙ্গে বৃত্তাকার গঠনের জন্য ভূমিকম্পের হাত থেকেও রক্ষা পায় এই মন্দিরটি। তবে এসবের বাইরেও আরও একটা কারণে বিখ্যাত এই যোগিনী মন্দির। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের আধুনিক ইতিহাস আর পার্লামেন্ট বা সংসদ ভবন।

এখন ভারতের নতুন সংসদ ভবন তৈরি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু পুরনো ঐতিহাসিক ভবনটির কথা এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। ব্রিটিশদের হাতে তৈরি এই সংসদেই একের পর এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। একটা সময় দেখেছে নাশকতামূলক হামলাও। কিন্তু একটু ভাল করে পুরনো সংসদ ভবনের চেহারাটার কথা ভাবুন। তারপর দেখুন মিতাউলির এই চউসাট যোগিনী মন্দিরের দিকে। বেশ অনেকটা মিল পাচ্ছেন না? সেই গোলাকার স্থাপত্য, ভেতরে মূল মন্দির... তবে সংসদ ভবনকে ঘিরে রেখেছে ১৪৪টি স্তম্ভ। এক্ষেত্রে রয়েছে ৬৪ জন যোগিনীর মূর্তি। ঐতিহাসিকদের একাংশের অনুমান, এই মন্দির দেখেই নাকি সংসদ ভবন তৈরির নকশা করেছিলেন এডউইন লিউটিয়েন্স ও হারবার্ট বেকার।

১৯২০-র দশকে ব্রিটিশ ভারতের দিল্লিতে তৈরি হয় সংসদ ভবন। তারপর থেকেই একটু একটু করে সামনে আসে এই তথ্য। সত্যিই কি মধ্যপ্রদেশের এই যোগিনী মন্দিরকে দেখেই নকশা করেছিলেন সংসদ ভবনের স্থপতিরা? নাকি গোটাটাই মিথ? এর কোনও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায়নি সেভাবে। কিন্তু এতটা গঠনগত সাদৃশ্য কি নেহাতই কাকতালীয়! তবে এই মিথ, রহস্য আর ইতিহাসের ওপরই এসে পড়ে সূর্যাস্তের আলো। যোগিনী মন্দিরেও প্রদীপ জ্বলে ওঠে নিভৃতে। যারা আসেন, তাঁরা নাকি অদ্ভুত একটা শক্তি অনুভব করেন এই মন্দিরে। এভাবেই সবকিছু মিলিয়ে ঠাই পায় যোগিনী মন্দির। নিছক সামান্য মন্দির নয়, নারীশক্তির উদযাপন।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।