ইন্দিরা হত্যা: ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?

Indira Gandhi Assassination: বেলা প্রায় আড়াইটার সময় ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তবে তখনই সরকারিভাবে মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়নি।

inscript
৩ মিনিট
ইন্দিরা হত্যা: ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন?

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। দিল্লির সকালটা ছিল একেবারে সাধারণ দিনের মতো। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রতিদিনের মতোই অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব কিছু বদলে যায়। নিজের দেহরক্ষীর গুলিতে প্রাণ হারান ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। ইন্দিরার মৃত্যুদিনে ঠিক কী হয়েছিল?

ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর একমাত্র মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি রাজনীতির পরিবেশে বড় হয়েছেন। বাবার কাছ থেকেই শিখেছিলেন দেশ চালানোর শিক্ষা। স্বাধীনতার সময় থেকেই কংগ্রেস দলে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তখন দেশ নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল যেমন খারাপ অর্থনীতি, দারিদ্র্যতা পাশাপাশি চারদিকে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ। এই সব পরিস্থিতি তিনি শক্ত হাতে সামলেছেন। তাঁর নেতৃত্বে দেশে শুরু হয় গ্রিন রেভলিউশন, যার ফলে খাদ্য উৎপাদন অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। তিনি ব্যাংকগুলিকে সরকারি করেন, এরফলে সাধারণ মানুষও সহজে ঋণ ও ব্যাংকের সুবিধা পায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শান্তিনিকেতন থেকে তিহারের জেল! ইন্দিরা এবং গায়ত্রী দেবীর সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে

Gayatri Devi’s relationship with Indira Gandhi: এর ফলেই একসময় স্বাধীন পার্টি থেকে ১৯৬২ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া গায়ত্রী দেবী রাজনীতির ময়দান থেকে চিরকালের মতো সরে দাঁড়ান।

১৯৮০-র দশক থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। পঞ্জাবে আলাদা ‘খালিস্তান’ রাষ্ট্রের দাবি ক্রমশ জোরদার হচ্ছিল। প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় সরকার শিখ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৮৪ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন ব্লু স্টার’। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বর্ণমন্দিরে আশ্রয় নেওয়া শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উৎখাত করা। নির্দেশ মতো সেনারা মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে। বহু মানুষ নিহত হন, স্বর্ণমন্দিরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পর শিখ সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়। রক্তক্ষয়ী এই অভিযানে সরকারি হিসাবে ৮৩ জন সেনা নিহত হন, আহত হন প্রায় ২৫০ জন। অন্যদিকে, ৪৯২ জন শিখ যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান। তবে বিভিন্ন সূত্রের দাবি, হতাহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।

এই ঘটনার ঠিক পাঁচ মাস পর ৩১ অক্টোবর সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর ইন্দিরা গান্ধী নিজের বাসভবন ১, সাফদরজং রোড থেকে বের হচ্ছিলেন। সেদিন সকালে ব্রিটিশ অভিনেতা পিটার উস্তিনভের-কে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। অফিসে যাওয়ার পথে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই শিখ দেহরক্ষী— বেয়ান্ত সিং ও সৎবন্ত সিং। ইন্দিরা হাসিমুখে তাঁদের দিকে এগিয়ে যান। ঠিক তখনই বেয়ান্ত সিং রিভলভার থেকে তিনটি গুলি চালান। সঙ্গে সঙ্গে সৎবন্ত সিংও আরও ২৫ রাউন্ড গুলি করেন, ইন্দিরা গান্ধী মাটিতে পড়ে যান। তাঁকে দ্রুত নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে যান— তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব নয়। চিকিৎসকেরা পরে জানান, ইন্দিরার শরীরে ২৮টিরও বেশি গুলির চিহ্ন ছিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কী ভাবে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

National Emergency : এই জরুরি অবস্থা ২১ মাস ধরে চলে, ১৯৭৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এই সময়ে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়, বিরোধী নেতাদের কারারুদ্ধ করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয় এবং নির্বাচন স্থগিত হয়।

বেলা প্রায় আড়াইটার সময় ইন্দিরা গান্ধীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তবে তখনই সরকারিভাবে মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়নি। সন্ধ্যে ছ'টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় তাঁর মৃত্যুর সংবাদ। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে এর প্রভাব পড়ে। দিল্লি, কানপুর, পাটনা-সহ বহু শহরে ছড়িয়ে পড়ে শিখ-বিরোধী দাঙ্গা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,৭৩৩। বেসরকারি হিসেবে সংখ্যা আরও বেশি। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর পুত্র রাজীব গান্ধী।

ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর নেতৃত্ব, নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে আজও নানা মত রয়েছে। কেউ তাঁকে শক্তিশালী শাসক হিসেবে দেখেন, কেউ বা তাঁর সিদ্ধান্তগুলিকে বিতর্কিত মনে করেন। তবে এটা সত্য, ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪ ভারতের ইতিহাসে এক গভীর ছাপ রয়ে গিয়েছে।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই আপত্তি, ১০ মাসে দুই কমিশনারের ১৪ বার প্রশ্ন

Election Commission SIR: এসআইআর ঘিরে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। গত ১০ মাসে দুই নির্বাচন কমিশনার ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ফর্ম ৬ বদল, ভোটার তথ্যভান্ডারের কেন্দ্রীয়করণ, পশ্চিমবঙ্গের আপিল এবং প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইন মেনে চলার বিষয়টি ফের আলোচনায়।