বড়দিনের মিষ্টিমুখ, ৯০ পেরিয়ে আজও নবীন সালদানহা, রইল তিন নারীর অসাধ্যসাধনের গল্প

Saldanha Bakery: বর্তমানে বেকারির দায়িত্বে আছেন দেবোরার কন্যা, আলিশা অ্যালেকজান্দ্রা। বিলেত থেকে পড়াশুনো সেরে ফিরে তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন পারিবারিক বাণিজ্যের ঘোড়দৌড়ের ব্যাটন।

rudranjan
৪ মিনিট
বড়দিনের মিষ্টিমুখ, ৯০ পেরিয়ে আজও নবীন সালদানহা, রইল তিন নারীর অসাধ্যসাধনের গল্প

হিমেল কোলাহল নিয়ে এসে পড়েছে শীত। লকডাউন আর করোনাকালের সতর্কতাবাণীকে একপাশে রেখে উৎসবের আলোয় সেজে উঠেছে নাগরিক জীবন। এই এত আয়োজন যে রসনাপূর্তি ছাড়া বৃথা তা কে না জানে? সে দুর্গাপুজোর সময় রাস্তার ধারের রোল চাউমিন হোক বা ইদের মরশুমে জাকারিয়া স্ট্রিট, কলকাতাবাসীর পেটপুজো চলতেই থাকে। আর এই খাদ্যপ্রিয় কলকাত্তাইয়াদের ভোজন সংস্কৃতির আবহমানের মেজাজ আঁকড়ে আজও 'সগৌরবে চলিতেছে' পুরনো কলকাতার ‘সালদানহা বেকারি’।

রফি আহমেদ কিড়ওয়াই রোড ধরে কিছুটা সামনে এগোলেই চোখে পড়বে একটা হলুদ বিস্তৃত পাঁচিল, উপরে লাল অক্ষরে সযত্নে লেখা ‘সালদানহা’। ভিড় সেখানে লেগেই থাকে, অষ্টপ্রহর মেলা গাড়ি ঘোড়ার ভিড়। এরই মধ্যে আপনাকে সিঁড়ি ধরে উঠে যেতে হবে দোতলায়। অবশ্য শুনে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, আদতে গোটা প্রক্রিয়াটা ঠিক ততটা সরল নাও হতে পারে। বড়দিনের আগে প্রায় যে কোনও সময়েই এই সিঁড়িটায় লেগে থাকে লম্বা লাইন। সকলেই অপেক্ষমান, নিজের খাদ্যপেটিকাখানা হাতে নেওয়ার জন্য। এদের অধিকাংশই ‘সালদানহা’র নিয়মিত গ্রাহক। এখন অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারে এ বেকারির নাম দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়েছে, ফলত নানা অঞ্চল থেকে মানুষজন স্বাদের ভাগ নিতে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। যাই হোক, লাইনে দাঁড়িয়ে খানিক শীতঘাম ঝরিয়ে অবশেষে আপনি উপরে উঠলেন। কী ভাবছেন? দেখবেন দোকানের লম্বাটে শো কেস, তাতে থরে থরে সাজানো খাদ্যসামগ্রী, ওপারে ব্যস্ত হাতে কাজ সামলাচ্ছে একাধিক দোকানি? আজ্ঞে না।

মেঝে জুড়ে খবরের কাগজের আসন বিছনো, তার উপরেই পসরা সাজিয়ে বসেছেন কর্মচারীরা। এদিক ওদিক ডাঁই করে রাখা ফ্রুট কেকের ভিড়, বাতাসে ভ্যানিলা এসেন্সের গন্ধ ভরপুর। এরই মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য চলছে, আগ্রহী খরিদ্দারদের সঙ্গে হাসিমুখে কথাবার্তা বলছেন বেকারির মালিকপক্ষ। এ বেকারির বিবর্তনের যে প্রচলিত গল্প পাওয়া যায়, তাও রীতিমতো আকর্ষণীয়।

শোনা যায়, ‘সালদানহা’র ঐতিহ্য শাসন করে তিন প্রজন্মের তিন কন্যা। মোনা সালদানহা, দেবোরা অ্যালেকজান্দ্রা এবং তাঁর মেয়ে আলিশা অ্যালেকজান্দ্রা। ১৯৩০ সাল। উবেলিনা সালদানহা নামক এক রমণী গোয়া থেকে এসে বাসা নিলেন কলকাতার এক প্রসিদ্ধ গোয়ানিজ খ্রিস্টান পাড়ায়। এই উবেলিনা সম্পর্কে হতেন মোনার শাশুড়ি। তা যাই হোক, অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরে তিনি শুরু করলেন কেক পেস্ট্রির ব্যবসা। প্রত্যেকদিন জনা কুড়ি কর্মচারী ‘সালদানহার’ খাদ্যসামগ্রীর বাক্স বয়ে নিয়ে বেড়াত কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। এই বাক্সওয়ালার পসরার ঝুলিতে থাকত সানলাইট বিস্কুট, লেমন টার্ট এবং বাবা কেকের মতো খাবার দাবার। তখন ব্র্যান্ডটির নাম অবশ্য ছিল 'আই, সালদানহা'। দেশ স্বাধীন হল, সালদানহাদের সুখাদ্য পরিবেশনার কাজ কিন্তু চলতে থাকল পুরোদমে।

১৯৬৪ সালে উবেলিনার পুত্র দেঞ্জিলের সঙ্গে পরিণয় সম্পর্কে আবদ্ধ হলেন মোনা সালদানহা। দেঞ্জিল পেশায় ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। আচিরেই পেশা ছেড়ে তিনিও এসে যোগ দিলেন পারিবারিক ব্যবসায়। ২০১৯ সালে, বার্ধক্যজনিত কারণে দেঞ্জিলের মৃত্যু ঘটেছে। মোনার মেয়ে দেবোরার স্মৃতিতে আজও ঝাপসা হয়নি সেই সব দিন যখন দেঞ্জিল ঠায় বসে থাকতেন দোকানের কাউন্টারে, আমুদে আলাপচারিতা চালাতেন ক্রেতাদের সঙ্গে। শাশুড়ির কাছ থেকে সযত্নে বেকারির দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন মোনা সালদানহা। গোয়ানিজ মিঠাই তৈরির ঐতিহ্যও তিনি পেয়েছেন উবেলিনার কাছ থেকে। আর আজ, সেই ঐতিহ্য তিনি পরম আদরে বিলিবণ্টন করছেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। মনে রাখতে হবে সালদানহারা যে সময়ে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন সে সময়ে রাজ্যে তো বটেই দেশেও সামনে থেকে উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি তেমন একটা ছিল না। এটাই মোনা-আলিশাদের ইউএসপি। আজও বহু উদ্যোগীর অনুপ্রেরণা হতে পারেন তাঁরা।

বর্তমানে বেকারির দায়িত্বে আছেন দেবোরার কন্যা, আলিশা অ্যালেকজান্দ্রা। বিলেত থেকে পড়াশুনো সেরে ফিরে তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন পারিবারিক বাণিজ্যের ঘোড়দৌড়ের ব্যাটন। ‘সালদানহা’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য খাবারের দাম। আশ্চর্য সস্তা দামে গ্রাহক এখানে পেতে পারেন ওয়ালনাট কেক, আলমন্ড কেক, ম্যাকরুন, চিজ পাফের মতো অভিনব খাবার দাবার। এ ছাড়াও হাল ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রধানত আলিশার পরিকল্পনাতেই সংযোজিত হয়েছে চিকেন বাকেট কেকের মতো দ্রব্য। সাবেক ধাঁচের নীলচে সাদা বাক্স, উপরে গাঢ় নীল রঙে লেখা বেকারির নাম, খুললেই ছড়িয়ে পড়বে এক ঘর সুগন্ধ।

কেক পেস্ট্রি ছাড়াও ‘সালদানহা’র নিয়মিত ক্রেতাদের অনেকেই আসে দৈনিক পাউরুটি সংগ্রহ করতে। ‘হোম বেকারি’র রুটির স্বাদের যে নিজস্ব ছাঁচ ‘সালদানহা’ তৈরি করেছে তার জুড়ি অন্যত্র মেলা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, সে সম্বন্ধে পাঠক নিশ্চিন্ত হতে পারেন। বাড়িতে বানানো কেক পেস্ট্রির জায়গায় আজেকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে নামকরা সব ব্র‍্যান্ড, ঝাঁ চকচকে তাদের বহিরঙ্গ। এ অবস্থায় ‘হোম বেকারি’র পুরনো ঐতিহ্য প্রত্যহ সযত্নে রক্ষা করছে ‘সালদানহা বেকারি’।

বড়দিনের কেক প্রস্তুতকারী পুরনো দোকানপাটের অভাব কলকাতা শহরে অবশ্য নেই। যিশুর জন্মদিন এগিয়ে এলেই কলুটোলা লেনের মন্টুর বেকারির ওভেনের আঁচ বৃদ্ধি পায়। ঔপনিবেশিক কাল থেকে দক্ষিণ কলকাতার বো ব্যারাকে অবস্থিত তাদের দোকান জে এন বড়ুয়ার কাটতি অব্যাহত রয়েছে আজও। এ ছাড়াও আছে ‘নাহুমস’। হগ মার্কেটের আলোকোজ্জ্বল এ দোকানের আছে কলকাতার প্রাচীনতম ইহুদি বেকারির তকমা। দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মধ্যে আজকের দিনেও দোকানের কাঁচঘর প্রায় নিভু নিভু হয়ে আসে, উপচে পরে ভিড়, সন্ধ্যের মধ্যেই কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। এদের পাশেই কিন্তু নিজস্ব একটা জায়গা দখল করে রয়েছে ‘সালদানহা’। ইতিবৃত্তরা সময়ের ফেরে ফিকে হয়ে আসে, বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেয় কখনওসখনও। ‘সালদানহা বেকারি’ শহর কলকাতার ইতিবৃত্তের এক অন্যতম আকর, শীতের শহরে তাকে কুর্নিশ।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।