বড়দিনের মিষ্টিমুখ, ৯০ পেরিয়ে আজও নবীন সালদানহা, রইল তিন নারীর অসাধ্যসাধনের গল্প

হিমেল কোলাহল নিয়ে এসে পড়েছে শীত। দু'দুটো লকডাউন আর করোনাকালের সতর্কতাবাণী কে একপাশে রেখে উৎসবের আলোয় সেজে উঠেছে নাগরিক জীবন। এই এত আয়োজন যে রসনাপূর্তি ছাড়া বৃথা তা কে না জানে? সে দুর্গাপুজোর সময় রাস্তার ধারের রোল চাউমিন হোক বা ইদের মরশুমে জাকারিয়া স্ট্রিট, কলকাতাবাসীর পেটপুজো চলতেই থাকে। আর এই খাদ্যপ্রিয় কলকাত্তাইয়াদের ভোজন সংস্কৃতির আবহমানের মেজাজ আঁকড়ে আজও 'সগৌরবে চলিতেছে' পুরনো কলকাতার ‘সালদানহা বেকারি’। 

রফি আহমেদ কিড়ওয়াই  রোড ধরে কিছুটা সামনে এগোলেই চোখে পড়বে একটা হলুদ বিস্তৃত পাঁচিল, উপরে লাল অক্ষরে সযত্নে লেখা ‘সালদানহা’। ভিড় সেখানে লেগেই থাকে, অষ্টপ্রহর মেলা গাড়ি ঘোড়ার ভিড়। এরই মধ্যে আপনাকে সিঁড়ি ধরে উঠে যেতে হবে দোতলায়। অবশ্য শুনে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, আদতে গোটা প্রক্রিয়াটা ঠিক ততটা সরল নাও হতে পারে। বড়দিনের আগে প্রায় যে কোনো সময়েই এই সিঁড়িটায় লেগে থাকে লম্বা লাইন। সকলেই অপেক্ষমান, নিজের খাদ্যপেটিকাখানা হাতে নেওয়ার জন্য। এদের অধিকাংশই ‘সালদানহা’র নিয়মিত গ্রাহক। এখন অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারে এ বেকারির নাম দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়েছে, ফলত নানা অঞ্চল থেকে মানুষজন স্বাদের ভাগ নিতে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। যাই হোক, লাইনে দাঁড়িয়ে খানিক শীতঘাম ঝরিয়ে অবশেষে আপনি উপরে উঠলেন। কী ভাবছেন? দেখবেন দোকানের লম্বাটে শো কেস, তাতে থরে থরে সাজানো খাদ্যসামগ্রী, ওপারে ব্যস্ত হাতে কাজ সামলাচ্ছে একাধিক দোকানি? আজ্ঞে না।

মেঝে জুড়ে খবরের কাগজের আসন বিছনো, তার উপরেই পসরা সাজিয়ে বসেছেন কর্মচারীরা। এদিক ওদিক ডাঁই করে রাখা ফ্রুট কেকের ভিড়, বাতাসে ভ্যানিলা এসেন্সের গন্ধ ভরপুর। এরই মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য চলছে, আগ্রহী খরিদ্দারদের সাথে হাসিমুখে কথাবার্তা বলছেন বেকারির মালিকপক্ষ। এ বেকারির বিবর্তনের যে প্রচলিত গল্প পাওয়া যায়, তাও রীতিমতো আকর্ষণীয়। 

শোনা যায়, ‘সালদানহা’র ঐতিহ্য শাসন করে তিন প্রজন্মের তিন কন্যা। মোনা সালদানহা, দেবোরা অ্যালেকজান্দ্রা এবং তাঁর মেয়ে আলিশা অ্যালেকজান্দ্রা। ১৯৩০ সাল। উবেলিনা সালদানহা নামক এক রমণী গোয়া থেকে এসে বাসা নিলেন কলকাতার এক প্রসিদ্ধ গোয়ানিজ খ্রিষ্টান পাড়ায়। এই উবেলিনা সম্পর্কে হতেন মোনার শ্বাশুড়ি। তা যাই হোক,  অসাধারণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির জোরে তিনি শুরু করলেন কেক পেস্ট্রির ব্যবসা। প্রত্যেকদিন জনা কুড়ি কর্মচারী ‘সালদানহার’ খাদ্যসামগ্রীর বাক্স বয়ে নিয়ে বেড়াত কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। এই বাক্সওয়ালার পসরার ঝুলিতে থাকত সানলাইট বিস্কুট, লেমন টার্ট এবং বাবা কেকের মতো খাবার দাবার। তখন ব্র্যান্ডটির নাম অবশ্য ছিল 'আই, সালদানহা'। দেশ স্বাধীন হল, সালদানহাদের সুখাদ্য পরিবেশনার কাজ কিন্তু চলতে থাকল পুরোদমে।

আরও পড়ুন-   ‘আমায় রবি ঠাকুর বানিয়ে দে মা!’ মোহন ভাণ্ডারিকে দেশ চিনল যে গল্পে

১৯৬৪ সালে উবেলিনার পুত্র দেঞ্জিলের সঙ্গে পরিণয় সম্পর্কে আবদ্ধ হলেন মোনা সালদানহা। দেঞ্জিল পেশায় ছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। আচিরেই পেশা ছেড়ে তিনিও এসে যোগ দিলেন পারিবারিক ব্যবসায়। ২০১৯ সালে, বার্ধক্যজনিত কারণে দেঞ্জিলের মৃত্যু ঘটেছে। মোনার মেয়ে দেবোরার স্মৃতিতে আজও ঝাপসা হয়নি সেই সব দিন যখন দেঞ্জিল ঠায় বসে থাকতেন দোকানের কাউন্টারে, আমুদে আলাপচারিতা চালাতেন ক্রেতাদের সঙ্গে। শ্বাশুড়ির কাছ থেকে সযত্নে বেকারির দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিলেন মোনা সালদানহা। গোয়ানিজ মিঠাই তৈরির ঐতিহ্যও তিনি পেয়েছেন উবেলিনার কাছ থেকে। আর আজ, সেই ঐতিহ্য তিনি পরম আদরে বিলিবণ্টন করছেন তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। মনে রাখতে হবে সালদানহারা যে সময়ে এই কাজে যুক্ত হয়েছেন সে সময়ে রাজ্যে তো বটেই দেশেও সামনে থেকে উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার সংস্কৃতি তেমন একটা ছিল না। এটাই মোনা-আলিশাদের ইউএসপি। আজও বহু উদ্যোগীর অনুপ্রেরণা হতে পারেন তাঁরা। 

বর্তমানে বেকারির দায়িত্বে আছেন দেবোরার কন্যা, আলিশা অ্যালেকজান্দ্রা। বিলেত থেকে পড়াশুনো সেরে ফিরে তিনি কাঁধে তুলে নিয়েছেন পারিবারিক বাণিজ্যের ঘোড়দৌড়ের ব্যাটন। ‘সালদানহা’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য খাবারের দাম। আশ্চর্য সস্তা দামে গ্রাহক এখানে পেতে পারেন ওয়ালনাট কেক, আলমন্ড কেক, ম্যাকরুন, চিজ পাফের মতো অভিনব খাবার দাবার। এ ছাড়াও হাল ফ্যাশনের সাথে তাল মেলাতে প্রধানত আলিশার পরিকল্পনাতেই সংযোজিত হয়েছে চিকেন বাকেট কেকের মতো দ্রব্য। সাবেক ধাঁচের নীলচে সাদা বাক্স, উপরে গাঢ় নীল রঙে লেখা বেকারির নাম, খুললেই ছড়িয়ে পড়বে এক ঘর সুগন্ধ।

কেক পেস্ট্রি ছাড়াও ‘সালদানহা’র নিয়মিত ক্রেতাদের অনেকেই আসে দৈনিক পাউরুটি সংগ্রহ করতে। ‘হোম বেকারি’র রুটির স্বাদের যে নিজস্ব ছাঁচ ‘সালদানহা’ তৈরি করেছে তার জুড়ি অন্যত্র মেলা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, সে সম্বন্ধে পাঠক নিশ্চিন্ত হতে পারেন। বাড়িতে বানানো কেক পেস্ট্রির জায়গায় আজেকের  বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে নামকরা সব ব্র‍্যান্ড, ঝাঁ চকচকে তাদের বহিরঙ্গ। এ অবস্থায় ‘হোম বেকারি’র পুরনো ঐতিহ্য প্রত্যহ সযত্নে রক্ষা করছে ‘সালদানহা বেকারি’।

আরও পড়ুন-‘আমায় রবি ঠাকুর বানিয়ে দে মা!’ মোহন ভাণ্ডারিকে দেশ চিনল যে গল্পে

বড়দিনের কেক প্রস্তুতকারী পুরনো দোকানপাটের অভাব কলকাতা শহরে অবশ্য নেই। যিশুর জন্মদিন এগিয়ে এলেই কলুটোলা লেনের মন্টুর বেকারির ওভেনের আঁচ বৃদ্ধি পায়। ঔপনিবেশিক কাল থেকে দক্ষিণ কলকাতার বো ব্যারাকে অবস্থিত তাদের দোকান জে এন বড়ুয়ার কাটতি অব্যাহত রয়েছে আজও। এ ছাড়াও আছে ‘নাহুমস’। হগ মার্কেটের আলোকোজ্জ্বল এ দোকানের আছে কলকাতার প্রাচীনতম ইহুদি বেকারির তকমা। দুপুর পেরিয়ে বিকেলের মধ্যে আজকের দিনেও দোকানের কাঁচঘর প্রায় নিভু নিভু হয়ে আসে, উপচে পরে ভিড়, সন্ধ্যের মধ্যেই কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। এদের পাশেই কিন্তু নিজস্ব একটা জায়গা দখল করে রয়েছে ‘সালদানহা’। ইতিবৃত্তরা সময়ের ফেরে ফিকে হয়ে আসে, বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেয় কখনওসখনও। ‘সালদানহা বেকারি’ শহর কলকাতার ইতিবৃত্তের এক অন্যতম আকর, শীতের শহরে তাকে  কুর্নিশ।

More Articles

;