পাপের শাস্তি, এসেছে খারাপ সময়! জলবায়ু পরিবর্তনকে যেভাবে দেখছেন হিমালয়বাসী

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল সবথেকে আগে ভোগা শুরু করেছেন হিমালয়বাসীরাই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দু'হাজার মিটার ওপরে উঠলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে সেই 'Zone', যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
পাপের শাস্তি, এসেছে খারাপ সময়! জলবায়ু পরিবর্তনকে যেভাবে দেখছেন হিমালয়বাসী

"You are totally at the mercy of Mother Nature in this World, mate. It's just a fact of life."

এই কথার অর্থ উপলব্ধি করছেন উত্তর-পূর্ব নেপালের তাপলেজং জেলার ওয়ালুঙ গ্রামের মানুষ।

"আগেরদিন সকালে আকাশে লাল রঙের একটা মেঘ ছিল। কাল মনে হয় তুষারপাত হবে।" কথাটা বলছিলেন পেম্বা ভূতি শেরপা, ওয়ালুঙের এক ইয়াক প্রতিপালক। গত বছর নভেম্বরের কথা। তাঁর এক বিশেষ গুণ ছিল। গুণটি হলো, তিনি তুষারপাতের একদম অব্যর্থ পূর্বাভাস করতে পারতেন। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাঁর। ভুল কোনওদিনও হতো না। তার কারণও ছিল। ওয়ালুঙ গ্রাম হিমালয়ের কোলে, তামুর ভ্যালির ওপর অবস্থিত। তাঁর প্রতিপালন করা ইয়াকের দল ভ্যালির একদম ওপরের প্রান্তরে চরে বেড়ায়। তুষারপাত শুরু হওয়ার আগে যদি তাদের না নিয়ে আসেন, তাহলে অনেকটা সময়ের জন্য তিনি তাঁর পোষ্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। সেই সঙ্গে তুষারপাতের ফলে বেশিরভাগ সময়ই সম্ভাবনা থাকে ঘাসের ওপর বরফের পুরু চাদর পরে যাওয়ার। সেক্ষেত্রে ইয়াকগুলিও একেবারে না খেতে পেয়ে মারা যাবে। পেম্বা সেই লাল মেঘ দেখে আর অপেক্ষা করেননি। পুরো পালকে ধরে নিয়ে চলে এসেছিলেন। কিন্তু তুষারপাত হয়নি। তার পূর্বাভাস মেলেনি।

ডিসেম্বরের ২৯ তারিখে অবশেষে তুষারপাত হয়, এবং সেই দিনের তুষারপাত এতদিনের সব ঘাটতি একসঙ্গে মিটিয়ে দেয়। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে তিন ফুট পুরু বরফ জমে যায়। যা কষ্মিনকালেও দেখেননি পেম্বা। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন এই ভাবে তুষারপাত হতো না, এবং প্রথম তুষারপাত হতো সেপ্টেম্বরে।

অতীতে শীতের মরশুম মানেই প্রায় পাঁচ থেকে ছয়বার নিজেদের মাথার ওপর ছাদ বাঁচাতে লড়াই করতে হতো পেম্বাদের। এতটাই ভারী তুষারপাত হতো। তিনি জানাচ্ছেন, এই বছর বরফ তো পড়েনি বটেই, সেই সাথে এই প্রথম একদিনে এমন অস্বাভাবিক হারে তুষারপাত হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দিল্লিবাসীর নাভিশ্বাস! পরিবেশ ধ্বংসের পরিণাম ফলছে, বাসের অযোগ্য হবে রাজধানী?

প্রতি বছর শীতের আগমন ঘটলেই দিল্লির বায়ু আরও দূষিত হয়ে যায়। প্রায় বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে দিল্লির বাতাস। প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় পাঞ্জাব, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশে চাষিদের ফসলের গোড়া পোড়ানো।

এই অস্বাভাবিক তুষারপাত চরম বিপদে ফেলেছে ইয়াক প্রতিপালকদের। হঠাৎ করেই তারা আবিষ্কার করছেন যে, একদিন আগে পর্যন্তও তারা ঠাহর করতে পারছেন না, কবে তুষারপাত হবে। হঠাৎ করেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। এই ভাবে কত কয়েক মাসে ৬-৭টি ইয়াকের মৃত্যুও হয়েছে, এবং প্রতিপালকের নেপালি মুদ্রায় প্রায় নয় লক্ষ ষাট হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

দু'বছর আগেই ঠিক এইভাবেই প্রায় ৯০টি ইয়াক হারান পেম্বা। ক্ষতির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় দশ হাজার মার্কিন ডলারে।

তবে জানা যাচ্ছে, শুধু নেপাল নয়, ভুটান এবং সিকিমও একইভাবে ভুক্তভোগী। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তুষারপাতকেই অনিশ্চিত করে তোলেনি, সেই সঙ্গে হিমালয়ের কোলে ছড়াচ্ছে বিভিন্ন রোগ, দেখা দিচ্ছে পানীয় জলের সমস্যা।

সবথেকে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল সবথেকে আগে ভোগা শুরু করেছেন হিমালয়বাসীরাই। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দু'হাজার মিটার ওপরে উঠলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে সেই 'Zone', যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে সবচেয়ে দ্রুত এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ওয়ালুঙের বাসিন্দারা বলছেন, 'কাওয়া ন্যায়ামপা', বা খারাপ সময় এসে গেছে।

প্রায় হিমালয়জুড়েই মানুষ বিশ্বাস করেন যে পাহাড়ে দেবতারা থাকেন এবং মানুষের কুকর্মে রুষ্ট হয়ে তারা এইভাবে শাস্তি দেন। ওয়ালুঙের মানুষই যেমন মনে করছেন, তাঁদের পাপের ফলস্বরূপ তাঁরা এই শাস্তি পাচ্ছেন।

ইয়াঙচেন শেরপা বলছেন, " আমি ঠিক জানি না কীভাবে নিজেকে ব্যক্ত করব, কিন্তু আবহাওয়া আগে এরম ছিল না। এখন বরফ পড়া কমে গেছে, আগের থেকে বহুগুণ বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে।" কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "সময় পাল্টেছে, মানুষ পাল্টেছে। সব ভালো মানুষেরা আজ মৃত।"

তবে বুদ্ধের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন না এঁরা। এঁদের বিশ্বাস, কুকর্মের শাস্তি যেমন পাচ্ছেন, তেমনভাবেই নিজেদের যদি এরা শুধরে নেন, তাহলে এর থেকে মুক্তিও তাঁরা নিশ্চয়ই পাবেন।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সাত দিনের ব্যবধানে দুটো ঘূর্ণিঝড়: জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা কি এটাই?

Climate change impact on cyclone: ২৮ অক্টোবরে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ে অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, ঠিক সাত দিন পর ৩ নভেম্বরে ল্যান্ডফল করে ‘মুরাসু’। আবহাওয়াবিদদের ভাষায়, এই পিঠোপিঠি ঝড়ের ঘটনাকে বলা হয় ‘ক্লাইমেটোলজিক্যাল অ্যানোমালি'। বঙ্গোপসাগরের এই ‘ওভার-এনার্জাইজড’ অবস্থাই, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতা।

কোথায় আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, কতটা ক্ষয়ক্ষতি, বাংলায় কী প্রভাব?

Cyclone Murasu: ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাব কাটতে না কাটতেই বঙ্গোপসাগরে তৈরি হয় ঘূর্ণিঝড় মুরাসু। মঙ্গলবার ভোরে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে শক্তিশালী এই ঘূর্ণিঝড়। নেল্লোর, প্রকাশম ও বাপটলা জেলায় গাছ উপড়ে পড়েছে, নিচু এলাকা জলমগ্ন হয়েছে। তামিলনাড়ু ও ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা জারি হয়েছে। বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলবে মুরাসু?

ভুটানে হড়পা বানের জেরে উত্তরবঙ্গে আতঙ্ক, কী পরিস্তিতি এখন?

Bhutan Flash Flood: ভুটানের শিনতাফু হ্রদ ভেঙে হড়পা বানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাস্তা ও পর্যটনকেন্দ্রের পরিকাঠামো। বন্যার আশঙ্কায় আলিপুরদুয়ারের কুমারগ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরানোর উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। শুক্রবার সকালে সংকোশ নদীর জলস্তর না বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে। পরিস্থিতি এখন কেমন?

মাত্র ১০০ বই থেকে ১০ হাজার! অসমের চা-বাগানের শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ছেন অনিন্দিতা

Assam Library Initiative: মাত্র ১০০টি বই নিয়ে ২০২০ সালে অসমের চা-বাগান এলাকার শিশুদের জন্য লাইব্রেরি শুরু করেছিলেন অনিন্দিতা গগৈ। আজ তিনটি লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পরিবারের ৪০ লক্ষ টাকারও বেশি বিনিয়োগে এগিয়ে চলেছে এই উদ্যোগ। কীভাবে শিশুদের পড়াশোনা ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করছেন অনিন্দিতা?

Cyclone Arnab: কোথায় আছড়ে পড়ল অর্ণব, কতটা ক্ষয়ক্ষতি? বাংলায় কতটা প্রভাব?

Cyclone Arnab: অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া, ভারী বৃষ্টি ও জল জমার জেরে বিপর্যস্ত একাধিক এলাকা। ৮৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানো হয়েছে। বাংলার কোন কোন জেলায় ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস, আর কতটা প্রভাব পড়তে পারে ঘূর্ণিঝড়ের?

অ্যানথ্রোপিকের মতো এআই সংস্থাগুলি যেভাবে হয়ে দাঁড়াচ্ছে জলবায়ু সংকটের কারণ

The AI Carbon Bill: অ্যানথ্রোপিকের আইপিও ফাইলিংয়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে বড় ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ-জলের ব্যয় বাড়ছে। ২০২৫-এ ডেটা সেন্টারগুলিতে ঘণ্টা প্রতি বিদ্যুৎ ব্যবহার, ৪৪৮ টেরাওয়াটে পৌঁছবে।

লুলার জয়ের পরেও কেন স্বস্তিতে নেই 'পৃথিবীর ফুসফুস' আমাজন?

lula's amazon policy: প্রথম পর্বে পিছিয়ে থাকার পর, কুড়ি দিনে এক কোটিরও বেশি ভোট বাড়িয়ে লুলা দা সিলভা চতুর্থবার ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। লুলার আমলে, আমাজনের জঙ্গল উজাড় হওয়া ৭১% কমেছে, তবু আইনসভায় ডানপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি হওয়ায়, আমাজনের সংকটজনক সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়ে গেলই।

ঘূর্ণিঝড় অর্ণব : কোথায় রয়েছে, বাংলায় কতটা দুর্যোগের আশঙ্কা?

Cyclone Arnab: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে অর্ণব। বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে এই ঝড়। সরাসরি বাংলায় আঘাত না হানলেও মঙ্গলবার থেকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তরবঙ্গেও বৃষ্টি হতে পারে। কোন কোন জেলায় দুর্যোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?