বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিণাম কী? দেশ কি বড় বিপদের সম্মুখীন?

Piya Saha
৩ মিনিট
বিদ্যুৎ ঘাটতির পরিণাম কী? দেশ কি বড় বিপদের সম্মুখীন?

বিদ্যুতের রেকর্ড চাহিদা। অন্যদিকে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির কয়লাও এসে থেকে ঠেকেছে তলানিতে। ফলে, দেশজুড়ে বিভিন্ন জোনে ৭৫৩টি যাত্রাবাহী ট্রেন আপাতত বাতিল করল কেন্দ্র। রাজধানীতে মজুত রয়েছে মাত্র একদিনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের কয়লা। দিল্লি সরকার জানিয়েছে, এই অবস্থা চললে দিল্লি মেট্রো বা হাসপাতালের মতো জরুরি পরিষেবা বন্ধ রাখতে হবে। পাঞ্জাবে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎমন্ত্রী হরভজন সিংয়ের বাড়ির সামনে প্রতিবাদ দেখিয়েছেন কৃষকরা। বিদ্যুতের সংকটের মুহূর্তে প্রশ্ন জাগে, তবে কি বিজ্ঞানীদের আশঙ্কাই সঠিক? ফুরিয়ে এসেছে পৃথিবীর কয়লার ভান্ডার? না কি দেশজুড়ে বিদ্যুতের সংকটের নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনও কারণ? রইল বিস্তারিত তথ্য।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণ কী?

ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি-ব্যয়কারী দেশ। আর এই শক্তির অধিকাংশই উৎপাদন হয় কয়লা থেকে। তাছাড়া বছরের এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় কয়লাও বেশি লাগে। শুধু ভারতে উৎপাদিত কয়লা দিয়ে সেই চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়না। কিন্তু বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আমদানি ধাক্কা খেয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদার মূল কারণ রেকর্ড পরিমাণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি।

উত্তর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় তাপমাত্রা হাফ সেঞ্চুরির দোরগোড়ায়। গতকাল প্রয়াগরাজের তাপমাত্রা ছিল ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গতকাল দুপুর পর্যন্ত দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২ লক্ষ ৭ হাজার ১১১ মেগাওয়াট, যা সর্বকালীন রেকর্ড। সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি-র দৈনিক রিপোর্ট বলছে, দেশের ১৬৫টি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ৫৬টিতে কয়লার মজুত ১০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। অন্তত ২৬টিতে এই মজুতের পরিমাণ পাঁচ শতাংশেরও কম।

রাজধানীর ২৫-৩০ শতাংশ বিদ্যুতের চাহিদা মেটায় দাদরি-২ এবং উঞ্চহার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। দু'টির কোনওটিতেই এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত কয়লা মজুত নেই। উত্তরপ্রদেশেও কয়লা মজুতের পরিমাণ ২৬ শতাংশে ঠেকেছে। হরিয়ানা, গুজরাত, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ- এই রাজ্যগুলিতে বিদ্যুৎ সংকট শোচনীয় রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে গুজরাত, অন্ধ্রপ্রদেশের মতো শিল্পসমৃদ্ধ রাজ্যে বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় কয়লামন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশি বলেছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির জন্য ২ কোটি ১৫ লক্ষ টন কয়লার সঞ্চয় আছে আমাদের। সাত-দশ দিন নিশ্চিন্তে চলে যাবে। ভয়ের কোনও কারণ নেই । রোজ নতুন করে কয়লার ভাঁড়ার পূরণ করার কাজও চলছে। কিন্তু প্রশ্ন, এর ভবিষ্যত কী?

'অল ইন্ডিয়া পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার্স ফেডারেশন' বিবৃতি দিয়ে বলেছে, কয়লা, রেল এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রকের সমন্বয়ের অভাবের ফল এই বিদ্যুতের সংকট দেখা দিয়েছে।

একটি রিপোর্ট বলছে, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লার ওপর নির্ভরশীল রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম ছত্তিশগড় (৯১%)। দিল্লি ( ৮৬%) , পশ্চিমবঙ্গ ( ৮২%), উত্তরপ্রদেশ (৭২%) এবং মহারাষ্ট্র (৬৬%) কয়লার ওপর নির্ভরশীল।

ভবিষ্যৎ

বিদ্যুতের চাহিদা বছর বছর যে হারে বাড়ছে, তাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় একমাত্র ভরসা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎসগুলি। এক্ষেত্রে দেশের মধ্যে কর্নাটক পথপ্রদর্শকের ভূমিকা নিতে পারে। তথ্য বলছে, রাজ্যের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ৫২% তৈরি হয় পূরণযোগ্য শক্তির উৎস থেকে। বাকি ৩৪% শক্তির চাহিদা মেটায় থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলি, হাইড্রো এবং নিউক্লিয়ার প্লান্ট থেকে যথাক্রমে ১২% ও ৩% বিদ্যুৎ তৈরি হয়। ফলে রাজ্যে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জোগান দিতে কোনও সমস্যা নেই।

২০২২ সালের মার্চ মাস অবধি দেশে ১১০ গিগাওয়াট শক্তির উৎপাদন সক্ষম হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর স্থির করা লক্ষ্যের মাত্র ৬৩%। কিন্তু দেশের সর্বত্র যে সমানভাবে কাজ হয়নি, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে 'এমবার' নামক সংস্থার রিপোর্ট। রিপোর্টে রয়েছে, দেশের মাত্র চারটি রাজ্য, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, কর্নাটক এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেই স্থির লক্ষ্যের তিন চতুর্থাংশ কাজ এগিয়েছে। এরপর উত্তরাখণ্ড ও সিকিম রাজ্যেই কাজ হয়েছে অর্ধেকের বেশি। অথচ মহারাষ্ট্র, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো বেশি চাহিদাসম্পন্ন রাজ্যগুলিতে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক কাজও এগোয়নি।

এই অবস্থায় লক্ষ্যপূরণের সময় ২০২২ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০৩০ করা হয়েছে। লক্ষ্য অনুযায়ী, ভারত এই দশকের শেষে ৪৫০ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন করবে। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ৪২.৫ গিগাওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উৎপাদন বৃদ্ধি করবে। লক্ষ্যপূরণের স্বার্থে এই আট বছরে বর্তমান পরিস্থিতিতে পাঁচ গুণ বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, চার গুণ বেশি বায়ুচালিত শক্তির উৎপাদন এবং তিন গুণ বেশি পরিমাণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। তবে কাজে গতি না এলে যে পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের মূল রোগ হল, সমস্যার কথা অস্বীকার করা। যা এক্ষেত্রেও করেছেন প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার বাকিরা। প্রধানমন্ত্রীর মতে, দেশে কোনওভাবেই কয়লার কোনও সংকট নেই। তবে পর্যাপ্ত রেলের রেক না থাকায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিতে কয়লা পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না। দ্রুত পরিস্থিতি ঠিক হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন তাঁর ক্যাবিনেটের মন্ত্রীরা। কিন্তু আর কতদিন? এখন সেটাই দেখার।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।