গৌতম দেবকে মনে পড়ে মিথ‍্যে আর দুর্নীতির পচা শামুকে পা কাটা রাজ্যবাসীর?

সমূলে সব হারিয়ে পথে বসা রাজ্যবাসী আজ বেশি করে মনে করছে আর এক নেতার কথা। তিনি গৌতম দেব। সিপিএম নেতা, রাজ্য রাজনীতির পরিচিত মুখ, প্রাক্তন মন্ত্রী।

tiasa gupta
৪ মিনিট
গৌতম দেবকে মনে পড়ে মিথ‍্যে আর দুর্নীতির পচা শামুকে পা কাটা রাজ্যবাসীর?

৩৪ বছরের বাম জমানার পতন। নতুন দিশা দেখিয়ে তৃণমূল দুর্গের অভ্যুদয়। পর পর ভোটে সাফল‍্য। তারপরেই টানা দুর্নীতি। সারদা, নারদা, সিন্ডিকেট এবং শেষ ঝটকা এসএসসি নিয়োগ কাণ্ড। এই সবের মূলে ছিল সিঙ্গুর থেকে টাটা-র সরে যাওয়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় আবার উঠে এল সেই ইতিহাস। এবার তিনি সরাসরি দাবি করলেন, টাটা সিঙ্গুর থেকে সরে গিয়েছিল সিপিএমের জন‍্য। সিপিএম সমর্থকরা মনে করছেন গৌতম দেবের সেই কথা, 'প‍্যাথোলজিক‍্যাল লায়ার'।

এসএসসি-র চাকরিপ্রার্থীরা পথে বসে। অন‍্যদিকে দিনের পর দিন দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হচ্ছে। মোদ্দা কথা হলো, আজ বেশি করে আলোচনায় আসছে আড়ম্বরহীন বামপন্থী নেতাদের জীবনধারার কথা। সেই সঙ্গে সমূলে সব হারিয়ে পথে বসা রাজ্যবাসী আজ বেশি করে মনে করছে আর এক নেতার কথা। তিনি গৌতম দেব। সিপিএম নেতা, রাজ্য রাজনীতির পরিচিত মুখ, প্রাক্তন মন্ত্রী। ২০১২ সালে তিনি সিপিএমের উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন।

অসুখে শরীর নুইয়ে পড়লেও বারবার তাঁকে মঞ্চে দেখা গেছে স্বীয় মেজাজে। বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর মেজাজটাই আসল রাজা। তাঁর আক্রমণের ঝাঁজে ফালাফালা হয়েছেন কখনও তৃণমূল নেত্রী, কিংবা বিজেপি। কখনও আবার আরএসএস-এর উদাহরণ টেনে খোদ দলের আত্মসমালোচনা করেছেন। তাই আজ তিনি আগের ফর্মে থাকলে হয়ত খানিকটা গলা তুলে আক্রমণের মেজাজে আসরে নামতে পারত সব হারানো বামফ্রন্ট। রাজ্যকে আজ পাতালঘরের অন্ধকারে টেনে নামাল যে সরকার, তাকে পথ দেখিয়ে দিতে আজ কি বেশি করে প্রয়োজন ছিল না গৌতম দেবের মতো নেতার?

স্নায়ুর অসুখে বহুদিন ধরে একরকম ঘরবন্দি তিনি। এখন খুব একটা কোথাও যান না। সকালবিকেল চলে ফিজিওথেরাপি। এ-ঘর থেকে ও-ঘর যেতেও মাঝে মধ্যে সাহায্যের দরকার হয়। এই বছরের ১৪ মে দীর্ঘদিন পর দলের কোনও কর্মসূচিতে দেখা যায় সিপিএম নেতা গৌতম দেবকে। দলের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই-এর সর্বভারতীয় সম্মেলন উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনি। দলের বর্ষীয়ান নেতা গৌতমবাবু হঠাৎ করে প্রকাশ্যে কোনও দলীয় কর্মসূচিতে যাওয়ায় জল্পনা শুরু হয়। তাহলে তিনি কি সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরছেন? বোধহয় আর সেটা সম্ভব নয়। কারণ শরীর সায় দিচ্ছে না। অশক্ত শরীর নিয়ে আগেও তাঁকে দেখা গেছে নিজস্ব মেজাজে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৪০০ স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে জীবন কাটল বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের, সততার সহজপাঠ ছিল হাতের কাছেই

Buddhadeb Bhattacharjee: পশ্চিমবঙ্গের আদ্যন্ত `ভদ্রলোক মুখ্যমন্ত্রী’র কথা কি বেশি করে মনে পড়ছে না রাজ্যবাসীর?

২০১৬ সালের ১৮ এপ্রিল- অসুখ উড়িয়ে চেনা মেজাজে ঝোড়ো ব্যাট করেন গৌতম দেব। কথার তোড়ে উড়িয়ে দেন বিরোধীদের। হাবড়ায় জোটপ্রার্থীর সমর্থনে প্রচারে হাজির হন তিনি। মঞ্চে তাঁকে দেখা যায়, সেই পুরনো আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। পাক্কা ৪০ মিনিট ধরে একদিকে বিজেপিকে বেঁধেন এই বলে যে, "বিজেপিতে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কোনও নেতা নেই।" অন্যদিকে সরাসরি বলেন, "মমতাকে না সরালে রাজ্যের ক্ষতি হয়ে যাবে। তৃণমূল দলটাকে পেট্রল-ওয়াশ করতে হবে। মমতা সত্যি কথা খুব কম বলে। সাধারণত ছেলেরা গুল মারে। মেয়েরা গুল মারে ভাবতে পারি না।" জ‍্যোতিপ্রিয় মল্লিককে তিনি 'পশ্চাৎপক্ক’ বলে কটাক্ষ করেন। আবার অনুব্রত মণ্ডলের নাম না করে তাঁকে 'ষাঁড়’ বলেও টিপ্পনি কেটেছেন। এভাবেই তিনি নানা শ্লেষাত্মক, তির্যক মন্তব্য করে শ্রোতাদের মাত করেন। মুহুর্মূহু হাততালি। তাঁর রাজনৈতিক স্টাইলাইজেশন নিয়ে আলোচনা উঠলে বলতেই হয়, এভাবেই তাঁকে মনে রাখবে রাজ্যবাসী।

তাঁর শব্দচয়ন নিয়ে অনেক সময় বিতর্ক হয়েছে। তবে সেই সবের ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। কারণ তিনি বহুদিন আগেই তৃণমূল নেত্রীর অনশন এবং সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে ফালা ফালা করেছিলেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে এসএফআই নেতা সুদীপ্ত গুপ্তর স্মরণে নেতাজিনগরে এক অনুষ্ঠানে গৌতম দেব ছিলেন আগাগোড়া আক্রমণাত্মক। বিস্ফোরক অভিযোগ এনে তৃণমূল নেত্রীকে কথা দিয়ে শূলে চড়ান। তৃণমূল নেত্রীর সততার দাবি গোটাটাই মিথ্যাচারের রাজনীতি- এই অভিযোগ করতে গিয়ে তিনি এক সময়ে বলেন, "অনশনের সময় খিদে পেলে নেত্রী পিছনে চলে যেতেন। ফিশফ্রাই খেতেন। আর কথা বলতেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। বুঝুন কেমন মাল! কী যন্তর!" ঘন ঘন মমতা মোবাইল ফোন নম্বর বদলান। এই দাবি করে গৌতমবাবুর আরও মন্তব্য, "ক্রিমিনাল বেন্ট অফ মাইন্ড! নইলে কেউ এরকম করে?"

তৃণমূলের মহিলা সংগঠন পরে 'মাল’ শব্দ নিয়ে আসরে নামলেও তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ ঝাঁঝালো আক্রমণ আর আপসহীন চরিত্রের জন্য তিনি রাজনীতিতে সমীহ আদায় করে নিয়েছেন। আজ রাজ্য দুর্নীতির পাতালঘরে মুখ লুকিয়েছে। এই অবস্থায় বিজেপি যে এই হাতে-গরম ইস্যু নিয়ে ছেড়ে কথা বলবে না, তা বলাই বাহুল্য। খুব স্বাভাবিকভাবে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক 'অপা' আছে, তারা কাস্টোডিয়ান ছিলেন। কালেক্টর অনেক ছিলেন, যেমন গোঘাটের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক মানস মজুমদার, বলাগড়ের তৃণমূল নেতা শান্তনু ব্যানার্জি। ভাইপোর কালেক্টর, চোর পার্থর কালেক্টর। প্রাক্তন মন্ত্রী শ্যাম মুখার্জী বিনয় মিশ্রর মাধ্যমে ১২ কোটি টাকা তুলে দিয়েছিলেন। রাজ্যজুড়ে এত পাপ! বন্দ্যোপাধ্যায় আর চট্টোপাধ্যায় জয়েন্ট ভেঞ্চার চলছে- ইত্যাদি দাবি করেন তিনি। এইসব অভিযোগ যে বিস্ফোরক, তা বলাই বাহুল্য়। একথাও ঠিক যে রাজ্যের হাওয়া গরম করার জন্য কম উত্তেজনাকর নয়। তবে নিন্দুকরা এমনও বলছেন, তৃণমূলের লাভের গুড় কি তিনি খাননি? তাঁর বিরুদ্ধে তো আবার সারদার টাকা হজম করার অভিযোগ রয়েছে।

সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন বিস্ফোরক দাবি করেন সংবাদমাধ্যমের সামনে যে, শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার তাঁর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। তাঁকে ব্ল্যাকমেল করতেন। সারদায় শুভেন্দুর ভূমিকা কী ছিল, সেই বিষয়ে সিবিআইকে পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেয় কলকাতা হাই কোর্ট। এদিকে নারদা মামলায় নাম জড়ায় শুভেন্দুর। তবে ইডির চার্জশিটে তাঁর নাম না থাকায় আওয়াজ তোলেন কুণাল ঘোষ। সে যাই হোক, পাঁকে পড়া রাজ্যকে সুযোগ বুঝে বিজেপি যে আক্রমণ করবে, তা বলাই বাহুল্য। এই ব্যাপারে শুভেন্দু যে অগ্রণী ভূমিকা নেবেন, সেটাও স্বাভাবিক। তবে তাঁর ক্লিন ইমেজ নিয়েই এত প্রশ্ন। তাও আবার ঘুঘুর বাসায় তিনিও তো ঘর করেছিলেন! আর সময়বিশেষে তাঁর সাম্প্রদায়িক সত্তা যেভাবে প্রকট হয়ে ওঠে, তা নজর এড়ায় না রাজ্যবাসীর।

এই অবস্থায় গৌতম দেবের মতো নেতাকে তো আজ রাজ্যের দরকার। দুর্নীতির পাঁকে রাজ্যকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকারের দিকে চোখে চোখ রেখে তাকানো এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও বিমান বসুর মতো নেতাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কথা আজ বুক বাজিয়ে তো বলতে পারতেন একজনই, যিনি স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে রাজনীতির পাতায় অনন্য, গৌতম দেব।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বাম বসন্ত ফিরবে বার্লিনে? শতাব্দীর সংগ্রাম শেষে আবার নতুন ভোর

Left-Wing Resurgence in Hitler’s Berlin: হিটলারের বার্লিনে ফিরছে বামপন্থা। তরুণরা সংক্রমিত। ইতিহাসের এই বিদ্রূপ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন দুঃস্বপ্নের নগরীতে।

চশমা যখন টেকসঙ্গী, কীভাবে কাজ করে এআই গ্লাস?

Meta AI Glasses: চশমা ব্যক্তিগত এআই সহকারী। চোখের ইশারা ও মৌখিক নির্দেশে কল, ছবি তোলা, ভিডিও রেকর্ডিং থেকে গুগল সার্চ—সবই যখন সম্ভব, তখন এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে? আর ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও এআই-নির্ভর এই চশমা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখবে?

টাকার বিনিময়ে বিজেপি-র প্রচার করেছেন সায়ক! আর আইনি জালে জড়ালেন অলিপাবের নিরীহ কর্মী

Sayak Chakraborty Olypub controversy: নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পাঁচটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে বিজেপির কেন্দ্রীয় দফতরের মোট খরচ ছিল ৫২৯.৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই খরচ হয়েছে প্রায় ২৮৬ কোটি টাকা। সেই প্রচারের একটি অংশ ছিল সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল কনটেন্ট।

SRFTI: কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে?

SRFTI Clash: SRFTI-তে ডানপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠান ঘিরে কেন আপত্তি জানালেন পড়ুয়ারা? বক্তৃতায় কী বলা হয়েছিল, যা নিয়ে তৈরি হয় উত্তেজনা? কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে পরিস্থিতি গড়াল সংঘর্ষে? পড়ুয়া ও আয়োজকদের পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আসল ঘটনা কী?

যে নির্বাচন কমিশনার ভোট চুরি আটকেছিলেন

Election reforms of T. N. Seshan: ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসেছিলেন যে ব্যক্তি, সেই টি. এন. শেষন বলেছিলেন, 'আমাকে এই পদে বসাবেন না, আমি আপনাদের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াব।'

ছদ্ম-বিরোধী তৈরিই কি তবে ভারতের রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন কৌশল?

Indian opposition politics: বিরোধীদের সরাসরি নিষিদ্ধ না করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপ, আইনি ফাঁকফোকর এবং সুপরিকল্পিত দল ভাঙার মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে অনুগত ‘ছদ্ম-বিরোধী’।

EXCLUSIVE: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ভোট না-করানো তৃণমূলের বড় ভুল, নিজেদের ভুল নিয়েও আলোচনার দরকার ছিল: কুণাল

Kunal Ghosh on Mamata Banerjee: ইনস্ক্রিপ্টে ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে তিনি একদিকে যেমন দাবি করেছেন মমতাকে ভয় পেয়েই তাঁকে বারবার নিশানা করা হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে দলের ভুলত্রুটি স্বীকার করে আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

EXCLUSIVE: শেষদিকে দল পরিচালনায় গ্যাপ ছিল, অভিষেকের অফিসও ঠিকঠাক ম্যানেজ করা হয়নি: কুণাল

Kunal Ghosh on Abhishek Banerjee: ইন্সক্রিপ্টের ‘অনিন্দ্য এবং’ পডকাস্টে অভিষেক প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে কুণাল জানিয়েছেন, শেষ পর্যায়ের দল পরিচালনায় আরও ‘সতর্কতা’ প্রয়োজন ছিল। তাঁর দাবি, অভিষেকের অফিসও সব সময় ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি।