স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু রহস্য!?

Amit Pratihar
৪ মিনিট
স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যু রহস্য!?

মহাপুরুষ, মুনি, ঋষিদের মৃত্যু হয় না। তাঁদের মহাপ্রয়ান ঘটে, তাঁরা দেহ রাখেন। পৃথিবীতে যে নির্দিষ্ট কাজের জন্য তাঁদের আগমন, সেই কার্য্যিসিদ্ধির পরেই তাঁদের আত্মা দেহত্যাগ করে। আমরা যারা খুব সাধারণ মানুষ তারা মহাপুরুষদের মৃত্যু নিয়ে খুবই কৌতূহল বোধ করি। কীভাবে হয় মহাপুরুষদের মৃত্যু? আমাদেরই মতো সাধারণ ভাবে, যন্ত্রণা পেতে পেতে হঠাৎ দম ত্যাগ করেন তাঁরা নাকি কোনও দিব্যজ্যোতির বিচ্ছুরণ ঘটে তাঁদের মহাপ্রয়ান কালে?

৪ঠা জুলাই ১৯০২ সালে মৃত্যু হয় স্বামী বিবেকানন্দের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। কেন এত অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন তিঁনি? তাঁর কি কঠিন কোনও দুরারোগ্য ছিল? নাকি তিঁনি তাঁর ইচ্ছায় এই ধরাধামকে বিদায় জানান?

৪ঠা জুলাই, ১৯০২ সাল। দিনটা ছিল শুক্রবার। আর পাঁচদিনের মতো একটা স্বাভাবিক দিন ছিলো সে'দিনটাও। স্বামীজি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে, বেলুর মঠে নিজের ধ্যানকক্ষে ধ্যানমগ্ন হয়েছেন। স্বামীজির তখন শান্ত রূপ। তাঁর ধ্যানপর্ব শেষ হলে তিঁনি শুরু করলেন গান। তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানেন, ভীষণ ভাল গানের গলা ছিল স্বামীজির। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবও তাঁর গান শুনে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়তেন। গানের আসর জমেছিল বেশ সেদিন। এদিকে সকালে বেলুড়ের ঘাটে জেলেদের নৌকা ভিড়েছিল। প্রচুর ইলিশ উঠেছিল। অনেকেই জানেন না স্বামীজি ছিলেন বেজায় খাদ্যরসিক। ইলিশের খবর তাঁর কান অবধি পৌঁছালে তিঁনি নির্দেশ দেন ইলিশ কিনে এনে দুপুরে জমিয়ে রান্না করার। ইলিশের ঝাল-ঝোল-অম্বলের মতো পদ দিয়ে সেদিন দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন স্বামীজি। দুপুরের খাওয়ারের পর বিশ্রাম নেওয়ার মানুষ তিনি নন। সে'দিনও নেননি। সোজা লাইব্রেরিতে ঢুকে যান, তারপর সঙ্গী প্রেমানন্দকে নিয়ে বেড়িয়ে আসেন বেলুড় বাজার পর্যন্ত। মঠে ফিরে সন্ধ্যা সাতটার আরতির পর ফের ধ্যানের ঘরে ঢুকে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর স্বামীজির ঘর থেকে সাড়া এল, গরম লাগছিল তাঁর। জানলা খুলে দেওয়া হল। তাঁর সঙ্গী ব্রজেন্দ্র, স্বামীজির পা টিপে দিতে শুরু করলেন– তখনও কেউ জানতেন না স্বামীজির মহাক্ষণের আর বেশি দেরি ছিল না। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা এগিয়ে রাত হতেই সব কিছু বদলে যেতে শুরু করল। স্বামীজির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হতে শুরু করলো, ভিজে গেল তাঁর সর্বাঙ্গ, হাত পাখা দিয়ে তাঁর শিষ্যরা তাঁকে অবিরাম বাতাস দিতে লাগলেন, তারপর হঠাৎই স্বামীজির ভিতর থেকে কান্নার রোলের মতো আওয়াজ বেরিয়ে এলো, সঙ্গে জোরে জোরে শ্বাস পড়ছিল তাঁর; অথচ মুখে কোনও কথা নেই তাঁর।

রাত তখন ৯টা ১০, বালিশ থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল তাঁর মাথা, দেহ স্তব্ধ; মুখে ঠোঁটে লেগে আছে হালকা হাসির রেশ। সন্ন্যাসী গুরুভাইরা মনে করলেন, ভাবসমাধি হয়েছে হয়তো তাঁর। কেউ তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে তাদের মাঝে আর স্বামীজি নেই বেশিক্ষণ। চলল শ্রীরামকৃষ্ণের নাম গান। আরও কিছুক্ষণ স্বামীজির কোনও সাড়া না মেলায় বেলুড় থেকে ডাক পাঠানো হলো ডাক্তার মহেন্দ্র মজুমদার এবং বৈকুন্ঠনাথ সান্যালকে। কিন্তু ডাক্তারের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দেহ রাখলেন ভুবনেশ্বরী দেবীর ভুবনজয়ী পুত্র। চলে গেলেন স্বামী বিবেকানন্দ। রাতটুকু কাটতেই সকাল থেকে মঠে ভিড়। খুব ভোরের দিকে চলে এলেন স্বামীজির মানসকন্যা সবথেকে প্রিয় এবং কাছের শিষ্যা সিস্টার ভগিনী নিবেদিতা। তাঁর গুরুর মৃত্যু তাঁর কাছে ছিল পৃথিবীর শেষতম দিনের মতো। তিঁনি কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারেননি স্বামীজির এই এত অল্পবয়সে মহাপ্রস্থান। স্বামীজির মাথার কাছে নিশ্চুপ হয়ে বসেছিলেন তিঁনি। ইতিমধ্যেই খবর পাঠানো হলো স্বামীজির মা’কে। দ্রুত চলে এলেন স্বামীজির ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত এবং স্বামীজির ভগ্নীপতি। কিছুক্ষণ পরেই এলেন ভুবনেশ্বরী দেবী সঙ্গে নাতি ব্রজমোহন ঘোষ। নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এলেন একটু পরের দিকে।

এরপর বেলা চারটে নাগাদ মঠেই গঙ্গার ধারে দাহ করা হয় স্বামীজিকে। তাঁকে যেখানে দাহ করা হয়, ১৬ বছর আগে গঙ্গার ঠিক বিপরীত দিকে দাহ করা হয়েছিল তাঁর গুরু শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণকে। স্বামীজির শেষকৃত্যের সময় শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন নিবেদিতা। শেষকৃত্যের ঠিক আগেই তিনি একটি রুমালে গুরুর পায়ের ছাপ নিয়ে নেন। চন্দনকাঠের চিতায় স্বামীজির নিথর শরীরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিঁনি। চিতাতে অগ্নি সমর্পণের পর নিবেদিতা নিজে স্বামীজির চিতার চারদিকে গোলগোল ঘুরতে থাকেন। গাউনে আগুন লেগে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্রহ্মানন্দের নির্দেশে এক সন্ন্যাসী তাঁকে ধরে অন্যত্র বসান। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ দাহকাজ সম্পন্ন হয়।

প্রখ্যাত লেখক শঙ্করের স্বামীজির আত্মজীবনী ‘দ্য মঙ্ক অ্যাজ ম্যান’ বইতে স্বামীজির স্বাস্থ্য নিয়ে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন অনিদ্রা, যকৃৎ ও কিডনির সমস্যা, মাইগ্রেন, ডায়বেটিস, হৃদরোগের মতো কমপক্ষে ৩১টি ব্যাধি ছিল স্বামীজির। দীর্ঘসময় ধরে তিঁনি এতগুলো রোগ নিয়ে জর্জরিত ছিলেন। শেষের দিকে তাঁর শরীর অধিকাংশ সময়ই খুবই খারাপ থাকতো। তাঁর শিষ্যদের মতে স্বামীজির নিজেও জানতেন তিঁনি মৃত্যুবরণ করতে চলেছেন। তিঁনি শিষ্যদের বলতেন ও যে তিনি ৪০এ পড়ার আগেই এই ধরাধামের মোহমায়া ত্যাগ করবেন। ৩৯ বছর, ৫মাস, ২৫ দিন বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। প্রসঙ্গত মৃত্যুর ঠিক দু'দিন আগে অর্থাৎ ২রা জুলাই, ১৯০২ সালে তিঁনি তাঁর পরমশিষ্যা ভগিনী নিবেদিতাকে মঠে নিমন্ত্রণ জানান। পঞ্চব্যঞ্জন এবং নানান পদ দিয়ে নিবেদিতাকে খাওয়ান। নিবেদিতার আপ্যায়ন করেন নিজের গুরুর মতো করেই। এবং খাওয়ার শেষে তিঁনি নিজে জগ থেকে জল ঢেলে নিবেদিতার হাত পা ধুইয়ে দেন। নিবেদিতা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করেন, এ আপনি কী করছেন গুরুদেব, এ তো আমার করার কথা। আপনি আমার গুরুদেব, আমি আপনার শিষ্যা।

স্বামীজি উত্তরে বলেন, কেন যীশুখ্রিস্টও তো তাঁর শিষ্যদের হাত পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।

উত্তরে নিবেদিতা বলেন, কিন্তু সে তো তাঁর মৃত্যুর আগে।

এরপর স্বামীজি হেসে ওঠেন আর বলেন, 'Silly Girl'

এই ঘটনার ঠিক দু'দিন পরেই স্বামীজির মৃত্যু হলে ভগিনী নিবেদিতা বুঝতে পারেন যে স্বামীজি আগে থেকেই জানতেন তাঁর মৃত্যুর কথা। ১৮৯৮ সালে শৈবতীর্থ অমরনাথে গিয়ে ইচ্ছামৃত্যুর বর পেয়েছিলেন স্বামীজি। সেখানেও তাঁর সঙ্গী ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। স্বামীজির গুরু শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেব বলতেন, ‘নরেন যবে বুঝতে পারবে তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তখন সে নিজেই চলে যাবে।’

প্রশ্ন জাগে মনে, স্বামীজি নিজের মৃত্যুদিন কি তবে নিজে নিজেই নির্ধারিত করেছিলেন? তিনি কি চাইলেই আমাদের মাঝে থেকে যেতে পারতেন আরও কিছুটা সময়?

লিখেছেন
Amit Pratihar
Amit Pratihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।