অম্বুবাচীর বিকেলে খিচুড়ি আর মাছের চচ্চড়ির গন্ধ

অম্বুবাচীর বৃষ্টিভেজা মাঠের মধ্যে ওই দ্যাখো একখান বাউনের ঘরের বেধবা কেমন উনোকুঁজো হয়ে শুয়ে আছে। ওর বুঝি বা খিদে লেগেছে খুব। ওর মায়ে এমন দিনে মাছের তেল, মাছের পোটা ভেজে মরিচ ডলে ভাত মেখে খাইয়ে দিত কেমন যত্নে!

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
অম্বুবাচীর বিকেলে খিচুড়ি আর মাছের চচ্চড়ির গন্ধ

প্রতিটা দিনের শুরুই ভারি অন্যরকমের। এই ধরো না এমন আষাঢ় দিনে, সেই কোন সকাল থেকে আকাশে আকাশে মেঘেদের চলাচল। মেদুর সকালে তাই মাঠে মাঠে মেঘের ছায়া এলিয়ে পড়েছে। এক একটা বীজতলা আবার নরম সবুজ মখমলি ধানের রঙে ভরে উঠেছে। সেদিকে তাকিয়ে অপলক চেয়ে থাকে ওই যে ফকির সাহেব, ওরে কি আপনি কবি বলবেন না? কাদায় গোড়ালি ডুবিয়ে নুয়ে পড়ে ধানের রঙে ওর মনখানা ভরে উঠছে ওই। দু'-একখানা কাস্তেচেরা এদিকওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাদা খুঁটে খুঁটে কী খাচ্ছে, কে জানে! ওদের যেন ব্যস্ততা নেই কোনও। তবে তিলে মুনিয়া আর বাবুইদের অবিশ্যি এক দণ্ড বসে থাকার জো নেই। ওরা বেনা ঘাসের পাতায় পাতায় দোল খাচ্ছে অকারণেই। মানুষের পা পড়ে না ওদিকে বড়। অমন ঝাড় হয়ে আছে, ওই যে বেনা ঘাসের ঝাড়! বোড়া সাপেদের ভারি পছন্দ ওসব। কেজো মানুষেরা তাই ওপথ এড়িয়ে চলে এমন ব্যস্ত সকালেও। তবে ব্যস্ততারও তো রকমফের আছে! খুকুর ঠাকুমা তাই ওই দ্যাখো না কেমন আল পেরিয়ে চলেছে ওই। ভোরের হাওয়ায় হাড় জিরজিরে শরীরখানা বেআব্রু হয়ে পড়তে চাইছে বারবার, তবু মানুষের সংকোচের সঙ্গে সে পারবে কেন! ওর চলে যাওয়ার দিকে আঙুল তুলে ও পাড়ার বউ ওর বরেরে বলতেছে, চক্কোত্তিবাড়ির ঠাকুমা কই চললেন গো? কই চললেন সে জেনে মানুষের কিছু যাবে-আসবে না, তবু মানুষের স্বভাব তো! সে সবকিছুর সুলুক সন্ধান চায়।

মাঠ পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা বরাবর ঠাকুমা চলেছেন ওই বিশেদের বাড়ি। চলেছে অম্বুবাচীর তদ্বির করতে। একথা-সেকথার পর বুড়ি কাজের কথা পাড়ছে ভারি সংকোচে। খানিক জড়সড় হয়ে বসেছে দ্যাখো কেমন! বলতেছে, বিশুরে, তোর বাপ থাকতি তো সিধে পাটিয়ে দিত, তাই ভাবলাম তোরে বলি! সকাল সকাল বিশুর রাজ্যির কাজ। সিধের কথায় বিশু খানিক সতর্ক হয়ে বসে। আতপ চালের কেজি দিনে দিনে বাড়ছে, দানা আকের গুড় কিনতে গেলে এখন নগদা কড়ি লাগে। সেদিন তো আর নেই, এ পাড়ায় ছ'টা শাল হতো আখের মরশুমে। বুড়ি বলে চলেছে নিজের মতো। বেশি কিছু চাইনি রে বাপ, ক'খান গাছের আম-কাঁঠাল-নারকেল দিস বাপ। বউমারে আমি বলব এখন, এক পোয়া করে দুধ যদি পাটিয়ে দিতে পারিস। মুখ ফুটে আর কার কাছে চাইব বল! বিধবা মানুষ। জানিস তো, ছেলেরা আমার জন্মশত্তুর, চাইলেই কি দেবে ওরা?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আষাঢ়ের মেঘ আর সরষে বাটা দিয়ে খয়রার ঝাল

গিমে শাকের বাটিচচ্চড়ি, ঘ্যাটকোল পাতা বাটা আর খয়রার ঝাল, এই তো আজকের রান্না। কড়কড়া স্বর্ণ চালের ভাতে টুকুনখানিক ঘ্যাটকোল বাটা মেখে নিয়েছে বুড়ি।

বিশু খানিক বিরক্ত হয়েই বলে, এসব আজকাল কেউ করে না কি? এসব উঠে গেছে ঠাক্‌মা। বুড়ি কিন্তু ছাড়বার পাত্রী নয়। খুনখুনে গলায় বলে, বলেই চলে... তা বললে হবে কেন বাপ! শাস্তরের বিধেন হল এই। এসব বলে, বুড়ি খানিক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিশে আর কী করে! মানুষ কি আর কেবল শাস্তর পালবে বলে আম-কাঁঠালের সওদা করতে আসে? তার জীবনেও যে এখনও কিছু ঘটে, এটুকুই তো যাচাই করে নিতে চায়, তাই না? মা-বউরে বলে-কয়ে বিশু তাই আষাঢ়ের সকালে গোটা দশের গাছপাকা আম, একখানা আস্ত গলা কাঁঠাল, এক মুঠো গোলাপজাম পাঠিয়ে দিচ্ছে ওই। ইচ্ছে না থাকলেও একখানা ঝুনো নারকেলও দিয়েছে শেষ পর্যন্ত। কাঁচা দুধ খেলে বুড়ির যদি পেট ছাড়ে তো ছাড়ুক, অত ভাবতে পারবে না বিশু।

রজঃস্বলা পৃথিবীর বৃষ্টিমুখরতা নিয়ে ভাবতে ভারি বয়েই গেছে ওর। ধানের বিছন ফুটল কি না সেসব দেখে লাভ কি বাপু? বিশু তাই বসে বসে ডিম-টোস্ট আর দুধ চা খাচ্ছে ওই। বর্ষার সকালে ওর বউ বেশি করে পেঁয়াজ আর মরিচ কুচিয়ে বেশ কড়া করে ডিম টোস্ট ভেজে দেয়। চাটুপোড়া গন্ধে বিশুর আরও খানিক খিদে পায়, বিশু তাই বেশ আওয়াজ করে চায়ে চুমুক দেয় এবার।

এবারে অম্বুবাচী লেগেছে বিকেল বিকেল, ঠাক্‌মা কিন্তু তার আগেই ফলপাকুড় ধুয়ে-মুছে তুলে রেখেছে। বিধবার জন্মটা এমন করে কাটিয়ে দিতে পারলে হয় এবারের মতো। এমন আষাঢ়ের দিনে কাসুন্দি দিয়ে পাকা আম খেতে কী ভালোই না লাগত! গরম দুধে দু'মুঠো ভাত মেখে, খানিক খানিক আম চটকে নিলেই হলো, আহা! এমন ঠান্ডা কাঁচা দুধে চুমুক দিতে কেমন ঘিন্না ঘিন্না করে। সেকথা ক্যামনে বুজাই বলো দেখি! তবু, এ গাঁয়ে মানুষের মন বড় নিচ গো, এরা মানুষরে মানুষ ভাবে না। বিয়ে হয়ে এসে তক দেখচে এদের। এর জল চলে না, ওর হাতে ভাত চলে না এই নিয়েই তো বেঁচে আছে মানুষ! চক্কোত্তিবাড়ির ঠাক্‌মা তাই ইচ্ছে না হলেও অম্বুবাচী পালে মন দিয়ে। পালতে পালতে বুড়া মানুষের খিদা লাগে। লাগবেই তো, লাগবে না? ভাতের খিদে মানুষ স্বগ্‌গে গেলেও টের পায়। বগবগ করে ভাত ফুটলি পর ন্যাজঝোলা পাখি ইলেকটিরির তারে এসে দোল খায়। বুড়ি তখন কী করে? বুড়ি বসে বসে ভাবার চেষ্টা করে, লাল পুঁই দে কুমড়োর ছ্যাঁচড়ার গন্ধ যেন কেমন! চোখ বুজে মনে মনে গন্ধের পিছনে পিছনে ছোটে তখন ও। বর্ষার সন্ধ্যায় কাদের বাড়িতে বুঝি খিচুড়ি বসাল! আহা, গোটা গোটা ছাঁচি প্যাঁজ দে মুসুরির ডালের পাদলা খিচুড়ি খেতে যা সুখ! অম্বুবাচীর ফলপাকুড়ের গন্ধ পেরিয়ে বুড়ি চলেছে ওই, গন্ধের পিছে পিছে। বামুনপাড়া পেরিয়ে ওই যে,আরও দূরে। ঘোষেদের বাড়িগুলো ছাড়িয়ে ক্যানেলের পাড়ে বাউরিপাড়া বরাবর চলে যাচ্ছে ওই। বাউরিদের মেয়েরা যেমন রাস্তায় বসে বসে আমড়া ছ্যাঁচা খাচ্ছিল সেদিন, অমন ইচ্ছে করে বুড়ির। এসব ইচ্ছে কেমন পেটের ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে ওই। কী আর করে বুড়ি মানুষ! ভেজা হাওয়ায় কাঁথাখান গায়ে দিয়ে পাশ ফিরে শোয় কেবল।

তোমরা ভাব, বুড়ির গল্প গাঁজাখুরি মালমশলায় ভরপুর? না গো না! অম্বুবাচীর বৃষ্টিভেজা মাঠের মধ্যে ওই দ্যাখো একখান বাউনের ঘরের বেধবা কেমন উনোকুঁজো হয়ে শুয়ে আছে। ওর বুঝি বা খিদে লেগেছে খুব। ওর মায়ে এমন দিনে মাছের তেল, মাছের পোটা ভেজে মরিচ ডলে ভাত মেখে খাইয়ে দিত কেমন যত্নে! সেসবই ভাবছে বুঝি বুড়ি। ভাবুক ভাবুক, গুপ্তপ্রেশ ফুলপঞ্জিকাখান কোলের ওপর খুলে মাছের পোটা চচ্চড়ির গন্ধে হারিয়ে যাচ্ছে ওই, ওই আমাদের বুড়ি। যাক যাক। এই গাঁয়ের মানুষেরা না-হোক, স্মৃতিরা অন্তত সময় সময় না চাইতেই সিধে পাঠিয়ে দিতে জানে। কী ! ঠিক বললুম তো?

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।