শাকভাতের পাতে পুঁটি মাছভাজা, ভুলে যাওয়া দেশের রান্নার স্বাদ

...আস্ত আরেকটা দেশ! আস্ত আরেকটা ভাষা। জিহ্বার স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ নিয়ে সে দেশ তো হারিয়েই গেছে কবে। মেঘমল্লারের বিপ্রলম্ভ আলাপে সে কি আর ফিরবে কখনও?

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
শাকভাতের পাতে পুঁটি মাছভাজা, ভুলে যাওয়া দেশের রান্নার স্বাদ

তোমার দেশ কোথায় গো?

এমন প্রশ্ন কেবলই ঘুরপাক খায়। এ দেশ তো আর আলাদা ভূখণ্ডের দাবি নিয়ে মিছিলে নেমে পড়তে পারে না! এদেশের কথায় বুকের ভেতর একখান তারের বাঁশি বেজে ওঠে। সে বাঁশির সুরে অবয়ব পেতে থাকে আস্ত একখানা গাঁওঘর, খেতখামার। সেই খেতখামারের দেশে এই এরকম শ্রাবণ দিনে রাস্তায় ঢেলে ঢেলে কাডুল বিক্কিরি হয়। মানষে উবু হয়ে বসে টিপে টুপে সে কাডুল কিনে নেয় ভারি সোহাগে। কাডুলের রস দিয়ে ক্ষীর দিয়ে লাল মুড়ি খেতে যা সুখ! লালি গরু ওই দ্যাখেন কাডুলের ভুতুরি কেমন মন দিয়ে খাচ্ছে। কাডুলরে কাঁঠাল কইলে কি আর স্বাদ লাগে?

স্বাদের জিহ্বাখান মগজের মধ্যে কে যে গঁদের আঁঠা দে সেঁটে দেছে, কে জানে! বরষার জলে আমে ক্যামন ঝাঁজ ঝাঁজ ভাব ওঠে না? উঠবই তো, জলের ছোঁয়ায় অমন হয় বইকি। দ্যাখেন না, শোকেতাপে তেতেপুড়ে মানুষ পুকুরঘাটের পাশটিতে ক্যামন আদুর গায়ে বসে থাকে। জলের সে ক্ষমতা আছে তো! আমের ভেতরে শোকতাপ না থাক, শেষবেলার খানিক অভিমান থাকে হয়তো। তা সেই ঝাঁজ ওঠা আমে খানিক কাসুন্দি মেখে খাও না কেন! মরিচ ডলে ডলে এমন পাকা আমমাখা যারা খেত, তারা ওই চলে যাচ্ছে ওই দূরে। আরও দূরে। আরেকটা দেশ ওই কেমন হেঁশেলের তল্পি নিয়ে মুখ উঁচিয়ে হাঁটা লাগিয়েছে দেখো।

তা মানুষের স্বাদ-আহ্লাদ নিয়ে একখান দেশ বুঝি হারিয়ে যেতে পারে? পারেই তো। পারছেই তো। প্রতিদিন সে কেবলই ঘুরে মরছে শহরের আনাচকানাচে। তাকে বুঝি তুমি উদ্বাস্তু জীবন বলবে না? সেই দেশঘরের মেটে উনোন, নিভু আঁচে দুধের কড়া, সেই সমস্ত নিয়ে আস্ত একখান রান্নাঘর পড়ে রইল জীবনের কোন প্রান্তে। সে জীবন কি আসলেই ফেলে আসা আরেকখান দেশের মতো মাথার ভিতরে অবিরাম জেগে উঠতে চায় না? চায় চায়। আপসের জীবন ঠেলে সে জীবন এখনও তিসি বাটা দিয়ে আমড়ার অম্বল খেতে চায়। সেই অম্বলে এক মুঠো ভাত তুলে নাও না কেন ফুলকাটা বাটিতে! আওয়াজ করে চুমুক দাও ! উফ! এমন বিচ্ছিরি আওয়াজ করে যে মানুষ খায়, সে খাক না বাপু। অমন আওয়াজ করে খেলে ওর ঠাকমা মুখ টিপে হাসতেন। বলতেন, আর এক মুঠো ভাত আর আমড়ার ঝোল নিবি দিদিভাই?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মুরগির সালন, কলিজার ভুনা, চিংড়ির টক... রান্নার গন্ধে মিশে থাকা গল্প

ফুপাতো বুনের মেয়ে সে যে কী সুন্দর মুরগির সালন রান্ধে! তবে যতই তোমরা এখন প্যাঁজ দে ভরিয়ে দাও কেন, আগের মতো বাস নেই গো রান্নায়। এমন ফেলে আসা জীবনের গন্ধে আবার সবাই নড়েচড়ে বসে।

বেলাগাম পেট চুক্তি সেইসব জীবন বর্ষার শহরে ঘুরেফিরে আসতে চায়। অফিসফেরতা মানুষের তখন কাটিং চায়ে প্রজাপতি বিস্কুট ডুবিয়ে খেতে বড় ভালো লাগে। ভাললাগারও তো অভ্যাস বদলায়! ঘিয়ের চাঁছি দিয়ে চিনি দিয়ে এমন বিকেলে কে মুড়ি মেখে দেবে বলো তোমায়? যে দিত, সে তো আসলে আস্ত আরেকটা দেশ। সে দেশ হারিয়ে গেছে জিহ্বার মানচিত্র থেকে। সে দেশে শাপলার ভেলা ভাজা ছিল, মাছের তেল পোটা আর তরিতরকারির খোসা দিয়ে বাটিচচ্চড়ি ছিল, বিয়েবাড়ির ভোজে মাসকলাইয়ের ডাল ছিল। সেই জীবনটা ভালো কি মন্দ, সে নিয়ে কি বিচার চলে? তবে সে একটা অন্য দেশ। সে একটা অন্য ভাষা। সেই ভাষা গাঁ-গঞ্জ, মফসসল পেরিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।

আপনারা কি ভাবেন, মান্য চলিত ভাষা কেবল মানুষের মুখে মুখে ফেরে? তা নয়, তা নয়। ভাতের থাল থেকে মুদির দোকানের ভাঁড়ার, ভাষার আগ্রাসন চলতেই থাকে, দিনে দিনে, রাতে রাতে। সে আগ্রাসনে কাডুলের রস দিয়ে মাখা ক্ষীরের বাটি পড়ে থাকে সেই কোথায়! কত দূরে! সে তো আসলে আরেকটা হারিয়ে যাওয়া দেশ, আরেকটা হারিয়ে যাওয়া ভাষা। সেই হারিয়ে যাওয়া ভাষায় একেকদিন পদ্য লিখতে ইচ্ছে করে বেদম। জামবাটিখানা নামিয়ে নিয়ে তখন যবের ছাতু দিয়ে আখের গুড় মেখে খেতে ইচ্ছে জাগে। এসব ইচ্ছে আষাঢ়ের পূর্ণিমার মতো ভারি নাজুক, ভারি ব্যক্তিগত!

চাঁদের আলোয় চন্দ্রাহত মানুষের মতো একটা বেপথু জিহ্বা তখন এই ঘরবাড়ি, দোকানপাট, অফিসকাছারি- সমস্তকিছু পেরিয়ে আস্ত একখানা গোলরুটির মতো চাঁদকে পিছনে ফেলে ভাতের গন্ধের মধ্যে তলিয়ে যেতে চায়। সেই আশ্চর্য ভাতের গন্ধে উদ্বাস্তু মনের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে কি মেঘমল্লার বেজে ওঠে না? একখান ওস্তাদ বীণকর যেমন করে আলাপ করেন! তেমন করে ভাতের গন্ধ ফিরিয়ে আনতে পারেন কি কেউ?

শেষ রাত্তিরের পূর্ণিমার চাঁদ আরও মোলায়েম হয়ে এলে এমন সব মানুষি ইচ্ছে পেয়ে বসে। শহর খুঁজে তখন নোনা কিনতে সাধ যায়, বঁটি পেতে ঢেঁকিশাক কুটে নিতে ইচ্ছে করে। অসুখে ভুগে ভুগে হাড়মাস কালি হয়ে গেছে যে মেয়ের, সে মেয়েরে তুমি ডুমুরের ঝোল খাওয়াবে না? এমন বর্ষার জলে বউনুটি শাক ভরে গেছে এদিকসেদিকে। আহা! শাকভাতের পাতে একখান সরল পুঁটি ভাজা খেতে ইচ্ছে হয় না কি তোমার? হামানদিস্তেয় মুড়ির ছাতু খানিক খানিক গুড় আর কাঁচা মরিচ দিয়ে খেতেও সাধ যায় না!

হয়তো যায়, হয়তো যায় না। সে জীবনে ছাইগাদা ছিল, আস্তাকুঁড় ছিল। সেসব আস্তাকুঁড়ে শ্রাবণ জলে লাউকুমড়োর চারা মাথা তুলে দাঁড়াত নিজের খেয়ালেই। কুমড়োর ডগা সেদ্ধ দিয়ে ভাত খাবে মাণিক? ফ্যানসা ভাতে সরবাটা ঘি দিই খানিক? পূর্ণিমার আলোয় এমন কত কত যে বর্ণ-গন্ধ পথ খুঁজে বাড়ি ফিরতে চায়! চাইলেই কি আর ফেরা যায়!

সে তো আস্ত আরেকটা দেশ! আস্ত আরেকটা ভাষা। জিহ্বার স্বাদ, বর্ণ, গন্ধ নিয়ে সে দেশ তো হারিয়েই গেছে কবে। মেঘমল্লারের বিপ্রলম্ভ আলাপে সে কি আর ফিরবে কখনও?

(সমাপ্ত)

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?