অষ্টমী পুজোর রীতিনীতি দেখে নিন একনজরে

Ashtami rituals: অষ্টমীর তিথি এবং নবমীর তিথির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় সন্ধিপুজো। সন্ধিপুজো চলে প্রায় ৪৮ মিনিট ধরে, যার ২৪ মিনিট হয় অষ্টমীর শেষ তিথির এবং বাকি ২৪ মিনিট নবমী শুরুর তিথি।

Amit Patihar
৩ মিনিট
অষ্টমী পুজোর রীতিনীতি দেখে নিন একনজরে

আমাদের ১২ মাসে ১৩ পার্বণ হলেও, বছরের এই পাঁচটা দিনের জন্য আমরা যেভাবে অপেক্ষা করে থাকি, তা যেন পাহাড়ের ট্রেনের টিকিট কেটে দিন গোনার মতো অপেক্ষা। পুজোর এই পাঁচটা দিনের মধ্যে আবার সবথেকে প্রিয় দিনটার কথা জিজ্ঞেস করলে প্রায় প্রত্যেকের উত্তরেই, 'মহাষ্টমী'। ষষ্ঠী, সপ্তমী, নবমী এবং দশমীর দিনগুলো জনপ্রিয় হলেও, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে বাঙালিদের কাছে অষ্টমীই।

নবরাত্রির অষ্টম দিন বা অষ্টমী হল দুর্গাপুজোর পবিত্রতম দিন। আশ্বিন মাসের শুক্লাষ্টমী তিথি যে দিনটিতে পড়ে সেই পবিত্র দিনটিকেই আমরা মহাষ্টমী বলি। অষ্টমী তিথির সঙ্গে জড়িয়ে আছে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির আবির্ভাব তিথি। যে কারণে অষ্টমীর দিনটি দুর্গাপুজোর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন। অষ্টমীতে অস্ত্রপুজো করা হয়। অষ্টমীর তিথিতেই স্বর্গের বিভিন্ন দেবতারা একে একে দেবী দুর্গাকে তাঁদের অস্ত্রপ্রদান করেন অসুরবিনাশ করতে। তাই অষ্টমীর শুভ তিথিতে দেবীর অস্ত্রসমূহকে দেবজ্ঞানে পুজো করা হয়। ভারতের বহু অঞ্চলে এই দিনটিকে 'বিরাষ্টমী' ও বলা হয়ে থাকে।

জনপ্রিয়, জাঁকজমকপূর্ণ, আড়ম্বরে টইটুম্বুর পুজোর এই দিনটা বিশেষ কিছু কারণে অন্যান্য দিনগুলোর থেকে আলাদা। সেই কারণগুলি বর্ণনা করতে গেলে বলতে হয় সন্ধি এবং কুমারীপুজোর কথা। অষ্টমীর এই বিশেষ তিথিতে দেবীদুর্গার পুজোর সঙ্গে হয় কুমারীপুজো এবং সন্ধিপুজো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেখতে এসেছিলেন খোদ বঙ্কিম, ইতিহাস বুকে আজও দাঁড়িয়ে বারুইপুরের রায়চৌধুরীদের দুর্গাপুজো

Durga Puja 2026: রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোরও রয়েছে বেশ কিছু নিয়মকানুন। যা আজও মেনে চলেন পরিবারের মানুষ।

কুমারীপুজোতে কুমারী বালিকাকে মাতৃরূপে বন্দনা করা হয়। শাস্ত্রমতে ১ থেকে ১৬ বছরের কুমারী, অজাতপুষ্প সুলক্ষণা মেয়েকেই দেবীজ্ঞানে পুজো করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কুমারী মেয়েটি ব্রাহ্মণের অবিবাহিত কন্যা কিংবা অন্য কোনো জাত বা গোত্রের অবিবাহিত কন্যা হলেও অসুবিধা নেই। এমনকি কোনো পতিতা মহিলার কন্যাকেও দেবী দুর্গারূপে পুজো করার নির্দেশ দেওয়া আছে শাস্ত্রে। বাংলাদেশ, নেপালে ও ভারতের কিছু কিছু জায়গায় এখনও দুর্গাপূজার অঙ্গ হিসেবে কুমারী পূজা করার রীতি-রেওয়াজ আছে। দুর্গা অষ্টমীর রাতে পাঁচ বা সাত অবিবাহিত কন্যাকে ভোজন করানোর প্রথা আছে। বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে কুমারী কন্যাদের পা ধুইয়ে দিয়ে তাদের আরতি ও পূজা করা হয়।

প্রকাণ্ড প্রতিমার ঠিক সামনে বসানো হয় কুমারী দেবীদুর্গাকে। তিনিই তখন চিন্ময়ী দেবী, তিনিই মহাশক্তি, তিনিই জগৎজননী মা। ভালো করে গঙ্গাস্নানের পর কুমারী দেবীকে পরানো হয় লাল রঙের শাড়ি, চন্দনে সাজানো হয় ললাট, কুমকুমে চর্চিত, আলতা সিঁদুরে অর্চিত, পুষ্পে শোভিত তিনি। এরপর শুরু হয় কুমারীপুজো। পুরুতমশাই শুরু করেন মন্ত্র উচ্চারণ, "কুমারী রক্তবর্ণভা শক্তিহস্তা ভয়ানকি"।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অতীতে দুর্গাপুজো ছিল ফসল কাটার উৎসব, কীভাবে বিলুপ্ত হল দুর্গাভোগ ধান?

Environmental Extinctions: দুর্গাভোগ ধান আর প্রায় নেই। কোনো ধান আর ভাদ্রে কাটা হয় না। সবই কাটা হয় অগ্রহায়ণে। কে জানে আশ্বিন মাসের পূজায় নবপত্রিকায় ব্যবহৃত ধান এখন কোনটা?

সনাতন হিন্দু দর্শন বলে, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় নামক ত্রিবিধ শক্তি আবদ্ধ থাকে কুমারীর মধ্যে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের দশম অনুবাকের ১২৫তম সূক্ত বা দেবীসূক্তে বলা হয়েছে, কুমারীর মাধ্যমেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে, বসুন্ধরার বুকে জন্ম নেওয়া সকল কুমারীই প্রকৃতি দেবীর অংশ। দেবীদুর্গা এই কুমারীরূপ ধারণ করেই অশুভ শক্তির প্রতীক কোলাসুরের বিনাশ করেছিলেন।

অষ্টমীর তিথি এবং নবমীর তিথির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয় সন্ধিপুজো। সন্ধিপুজো চলে প্রায় ৪৮ মিনিট ধরে, যার ২৪ মিনিট হয় অষ্টমীর শেষ তিথির এবং বাকি ২৪ মিনিট নবমী শুরুর তিথি। সন্ধিপুজো হল দেবীর এক অসুরদলিনী রূপের পুজো, যার নাম হল চামুণ্ডা। পুরাণ মতে চন্ড ও মুন্ড নামের দুই অসুরের বিনাশ করতে দেবী দুর্গার ললাট থেকে আবির্ভুত হয়েছিলেন দেবী চামুণ্ডা। অষ্টমী এবং নবমীর ঠিক সন্ধিক্ষণে দেবী চামুণ্ডা বধ করেন দুষ্ট অসুর চন্ড ও মুন্ডকে। তুই সন্ধিপুজো শুরু হয় অষ্টমী এবং নবমীর ঠিক সন্ধিক্ষণেই। দেবী চামুণ্ডার আরাধনা করতে করতেই শুরু হয় মহানবমী।

এছাড়াও, এই তিথিতে পুজো করা হয় মহাগৌরী দেবীরও। পুরাণ মতে, দেবাদিদেবের অর্ধাঙ্গিনী মা পার্বতী ছিলেন গৌরবর্ণা। কিন্তু শিবকে বর হিসাবে পাওয়ার তপস্যায় প্রখর রৌদ্রে তিনি কৃষ্ণবর্ণা হয়ে যান। দেবাদিদেব পার্বতীকে গঙ্গাজলে স্নান করালে তিনি ফের তাঁর গৌর বর্ণ ফিরে পান। বলা হয়ে থাকে যে, অষ্টমীর রাতে দেবী মহাগৌরীর পুজো করলে পাপস্খলন ঘটে। অষ্টমীতে অষ্ট-মাতৃকার আবির্ভাব দুর্গাডামর ও যোগিনীতন্ত্রে বলা বর্ণিত হয়েছে চৌষট্টি যোগিনীর কথা। এই যোগিনীরা মহাশক্তিরূপিণী মহাদেবীর অংশ। এই চৌষট্টি যোগিনী বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিচালনায় মহাশক্তিকে সাহায্য করেন। এই চৌষট্টি যোগিনীর আট জন করে একই দেহে সম্মিলিত হয়ে মহাষ্টমীর দিন আবির্ভূতা হয়েছিলেন আট জন ভয়ঙ্কর দেবী। অশুভ শক্তির বিনাশে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দানবদলনী অষ্ট-মাতৃকা বা অষ্ট-শক্তি। এঁরা হলেন ব্ৰহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বরাহী, নরসিংহী, ইন্দ্রাণী ও চামুণ্ডা। অশুভশক্তিকে বিনাশ করার পর যাঁরা বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন দেবীর দুর্গার অঙ্গে। তাই মহাষ্টমীর দিন পুজো করা হয় অসুরবিনাশিনী অষ্ট-মাতৃকাকেও।

শাস্ত্রমতে, অষ্টমীতে পুষ্পাঞ্জলি দিলে সর্বকর্মে সিদ্ধি লাভ হয়। জীবন থেকে দুঃখ ব্যথা যন্ত্রনা শোক দূরে চলে যায়। বাধা দূর হয়, অর্থ আর সন্তান লাভ হয়। অন্তরের শয়তান শক্তি দুর্বল হয়, শত্রুর বিনাশ হয়। অষ্টমীর দিন নিরামিষ আহার করা হয়। আবার অনেক ভক্ত সারাদিন নির্জলা উপবাস রেখেও কাটিয়ে দেন। বাঙালিদের সঙ্গে অষ্টমী তিথির এই যোগাযোগ যেন আত্মার যোগ।

লিখেছেন
Amit Patihar
Amit Patihar
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।