শুভ মহালয়া বলা কি ভুল? দিনটির তাৎপর্য জানলে চমকে যাবেন

Durgapuja 2022: মহালয়ার তিথি থেকেই দেবীপক্ষর সূচনা। কী তাৎপর্য এই দিনের?

Ahana Das
৩ মিনিট
শুভ মহালয়া বলা কি ভুল? দিনটির তাৎপর্য জানলে চমকে যাবেন

আশ্বিনের শারদপ্রাতে বাজিছে আলোকমঞ্জরি...

লাইনটা শুনলেই যেন মনটা জুড়িয়ে ওঠে বাঙালির । বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের সূচনা এটি। এই দেবীবন্দনা দিয়েই শুরু হয়ে মা দুর্গার আরাধনা। যে দিনটিকে আমরা মহালয়া বলি। মহালয়ার অর্থ হলো পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবীপক্ষের শুরু। পুরাণমতে এই দিনই মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন মা দুর্গা। বাঙালির মহালয়া বলতেই সবার প্রথমে মাথায় আসে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কণ্ঠে স্তুতিপাঠ। এই বিশেষ দিনে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার জন্য বিশ্বজুড়ে বাঙালি অপেক্ষা করে থাকেন বছরভর। এই মাতৃ-আরাধনা শুনতে ভোর ৪টে-তে উঠতেও দ্বিধা বোধ করে না ঘুমপ্রিয় বাঙালি। কারণ তাদের মনে তখন শুধু একজনই বাস করেন, দেবী দুর্গা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মহালয়ার নিজস্ব সাংস্কৃতিক মর্যাদা আছে বাঙালিদের কাছে।

মহালয়ার এই দিনে অর্থাৎ পিতৃপক্ষের এই শেষ লগ্নেই বাঙালি তারা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করে বিভিন্ন জায়গায়। যদিও 'মহালয়া' শুভ না অশুভ, এই নিয়ে যথেষ্ট মতবিরোধ আছে সমাজে। কারও মতে এটি শুভ, কারোর মতে এটি অপবিত্র। একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে এই দিনটাকে ঘিরে। যদিও পুরাণে বা শাস্ত্রে এটি শুভ না অশুভ, তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। ব্যাখ্যা না মিললেও আনন্দ এবং আবেগকেই এখানে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয়। যদিও একথা সত্য যে, শাস্ত্রে এই দিনে পূর্বপুরুষদের জল নিবেদনের বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। তাই এই দিনটি অশুভ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিৎ নয়। মহালয়ার ব্যাখ্যা নানা ভাবে করা যেতে পারে, তবে বেশিরভাগ মানুষই দেবীপক্ষের শুরু হিসেবে দিনটিকে জেনে এসেছে। যদিও মহালয়ার গুরুত্ব মহাভারতের দিক থেকেও বিবেচনা করা যায়। আশ্বিনের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপুরুষকে জলদান করে স্বর্গে ফিরে যাওয়ার কাহিনি শোনা যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বোধন নয়, ইছামতির বিসর্জনে শুরু হয় হুল্লোড়! ৩৮৭ বছরে এটাই ঐতিহ্য বসু বাড়ির পুজোর

Durga Puja 2022: বাংলা চলচ্চিত্রের স্বনামধন্য কৌতুক অভিনেতা বিশ্বনাথ বসুর বাড়ির পুজো বলেও পরিচিত এটি। এই পুজোতে বলি প্রথারও একটি অভিনব রীতি রয়েছে।

পুরাণ মতে, ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর অমর হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর পরাজয় নিশ্চিত ছিল কোনও নারীশক্তির কাছে। যখন অসুরদের অত্যাচারে দেবতারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন, সেই সময় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এই ত্রিশক্তি একত্রে এক নারীশক্তি সৃষ্টি করেন। তিনিই হলেন দেবী দুর্গা। দেবী দুর্গা এই দিনেই মহিষাসুরকে বধ করেন। যেহেতু অশুভ শক্তির বিনাশ করে যেহেতু শুভশক্তির সূচনা হয়, তাই এই দিনটি শুভ বলে মনে করেন অনেকে।

কেবল মহাভারতেই নয়, কৃত্তিবাসের রামায়ণেও পাওয়া যাবে মহালয়ার উল্লেখ। শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা বিজয়ের আগে অকালে দেবী দূর্গাকে এই আহ্বান করেছিলেন। যার জন্য একে অকাল বোধনও বলা হয়। এইদিনে দেবীর চোখ আঁকা বা চক্ষুদান করা হয়। সুতরাং পুরাণ, শাস্ত্র, ইতিহাসে যাই-ই লেখা থাকুক না কেন, দেবীর আগমন মানুষের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দ ও সুখ। সেদিক থেকে বিবেচনা করলেও এই দিনটি আসলে শুভ।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর কণ্ঠে মহিষাসুরমর্দিনী এখনও পর্যন্ত বাঙালির ঘরে ভোর হতে না হতেই বাজতে থাকে। যেন সেই রেকর্ডিং আজও নতুন এবং অদ্বিতীয়। বেজে ওঠে সুপ্রীতি ঘোষের গলায় 'বাজলো তোমার আলোর বেণু'। প্রত্যেক বছর এই একটি সকাল, যেদিন প্রত্যেক বাঙালি গানটি কেবল শোনেই না, উপলব্ধিও করতে পারে। গানটি যেন অন‍্যরকম এক শান্তি বয়ে আনে মনে, এক আশ্চর্য খুশি অনুভব করতে পারে বাঙালি। এমন এক মায়ায় এই গান বেঁধেছে আমাদের, সেই মায়াজালে প্রত্যেকটি বাঙালি মন জড়িয়ে। ভোর থেকেই বাংলার প্রত্যেকটি টেপরেকর্ডার, এফএম একটাই সুর বাজায়, তা হলো 'ইয়া চন্ডী'। সঙ্গে থাকে 'জাগো তুমি জাগো'।

দেবী দুর্গা মর্ত‍্যে আসেন শক্তিরূপে, পাপের বিনাশ করতে, এমনটাই বিশ্বাস। দেবী দুর্গাকে জগতের কল্যাণকারী মনে করা হয়, তাই তিনি জগৎজননী। ভক্তদের ধর্ম, অর্থ, জ্ঞান, মোক্ষ দান করতে মর্ত‍্যে দেবীর আবির্ভাব হয়ে তাই তিনি সর্বকামার্থদায়িনী। দেবী দূর্গা এই জগতের অন্নদাতা, তাই তাঁর নাম অন্নদা। রুদ্রের ঘরনি তিনি, তাই সকলে তাকে রুদ্রাণী নামে চেনে। শত অক্ষি দিয়ে তিনি সব কিছু নিজের নজরে রাখেন, তাই তিনি শতাক্ষী। তিনি পরম বৈষ্ণব, তাই তিনি বৈষ্ণবী; অন্যদিকে তিনিই অঙ্গকান্তি গৌরবর্ণা, তাই তিনি গৌরী নামেও খ্যাত। কৈলাস পর্বতে বাস, তাই তিনি পার্বতী। বহু নামের অধিকারিণী আমাদের দেবী দুর্গা। স্বরূপত তিনি এক ও অভিন্ন এবং অনন্য শক্তির রূপে-রূপান্তরে প্রকাশ হওয়ায় তিনি মহাশক্তি মহামায়া।

বিভিন্ন দেবতার তেজপুঞ্জে সৃষ্টি হয়ে তিনি সমস্ত তেজের উৎস, তাই তিনি প্রতিভাত তেজময়ী। মহিষাসুরকে দমন করার পরেই শাস্ত্রমতে শিবের পায়ে প্রবেশ করেছিলেন দেবী দূর্গা। সেই থেকে তিনি রুদ্রপন্তী উমা, অম্বিকা, হৈমবতী, দুর্গা, গৌরী, ভবানীর মিলিত দৈব সত্তা। ভাবপ্রবণ বাঙালির কাছে তিনি পরিপূর্ণভাবেই শিবপত্নী শিবানী বা সকলের 'মা দুর্গা'। তাই দুর্গাপ্রতিমার মধ্যে দুর্গার মাথার ওপরে শিবের অবস্থান দেখা যায়। পাশে থাকে তাঁর সন্তান-সন্ততি। এই রূপেই আমরা দুর্গাপুজোতে আরাধনা করে থাকি দেবীর।

লিখেছেন
Ahana Das
Ahana Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।