আগামী দু'বছরে কলকাতার চেহারা বদলে দেবে ই-বাস?

এবার থেকে কলকাতা ও রাজারহাট নিউটাউন এলাকায় চলবে বৈদ্যুতিন বাস। পরিবহণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আপাতত ১০ টি বাস চালু করা হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আরও ৪০ টি বাস চালু হওয়ার কথা রয়েছে। রাজ্য সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে কলকাতা শহরের বুকে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে সিএনজি এবং বিদ্যুৎচালিত গাড়ি চালানো।

এ প্রসঙ্গেই পরিবহণ মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম বলেছেন,' ২০১১ সাল থেকে কলকাতাকে স্মার্ট সিটি তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল।' এই শহরের বুকেই পরিবেশ বান্ধব ট্রাম, মেট্রোর পরে ই-বাস নিঃসন্দেহে কলকাতাকে দূষণমুক্ত প্রাণের শহর করে তুলবে।' তাছাড়া বর্তমানে প্রতি লিটার পেট্রোল, ডিজেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা চালুর পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার ।এই কারণেই বছরের শুরুতেই সিএনজি ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে রাজ্যে। তবে নতুন বাসগুলি এক বেসরকারি সংস্থাকে গতবছরেই বরাত দেওয়া ছিল ৫০ টি বাস তৈরির।


শহরের বুকে বৈদ্যুতিন বাস


গত বছরেই রাজ্য পরিবহণ নিগম সূত্রে জানা গিয়েছিল, ফাস্টার অ্যাডাপশন অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং অফ এলেক্ট্রিক ভেহিকেল ( ফেম) প্রকল্পের আওতায় ১৫০ টি বৈদ্যুতিন বাস রাজ্যে চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল এর মধ্যে পঞ্চাশটি বাস নিউটাউনকে কেন্দ্র করে কলকাতার মোট দশটি রুটে চলাচল করবে। অন্য বাসগুলি চলার কথা ছিল হলদিয়া আসানসোল ও দুর্গাপুরে। সেইমতো পঞ্চাশটি বাস তৈরি জন্য পিএমআই ফোটন নামের একটি সংস্থার সাথে চুক্তি হয়েছিল রাজ্য সরকারের। ফলস্বরূপ গত বছর পুজোর অনেক আগেই একটি নমুনা বাস (প্রোটোটাইপ) নিউটনকে কেন্দ্র করে কলকাতার পাঁচটি রুটে দফায় দফায় পরীক্ষা করা হয়েছিল। শোনা গেছে,সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন বাসগুলি তৈরিতে প্রয়োজনীয় বদলেরও। এই চুক্তি অনুসারে বুধবার উদ্বোধন করা বাসগুলি গত বছর পুজোর আগেই চালু হওয়ার কথা ছিল।


পিএমআই এর সাথে রাজ্যের চুক্তি অনুসারে, নির্মাণ সংস্থাই এই বাসগুলি চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।রাজ্য পরিবহণ নিগম শুধুই কন্ডাকটর দেবে।একমাসে প্রতিটি বাসকে ন্যূনতম পাঁচ হাজার কিলোমিটার চলতে হবে। এক্ষেত্রে রাজ্যকে প্রতি কিলোমিটার পিছু ৮৬ টাকা দিতে হবে। তবে আগেও শহরে ৮০টি বিদ্যুৎচালিত বাস চালু হয়েছিল। সঙ্গে শহরের বিভিন্ন জায়গায় মোট ৭৬টি চার্জিং স্টেশন বসানো হয়েছিল।এই চার্জিং স্টেশনের সংখ্যাও কয়েক গুণ বাড়বে আগামী দিনে। রাজ্য সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩৫০০ চার্জিং স্টেশন তৈরি হবে শহর এবং শহরতলি জুড়ে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ১,২৪০ টি ই-বাস পরিষেবা চালু করা হবে বলেও জানা গেছে। পরিবহণ দপ্তর সূত্রে খবর, এই বছরের মধ্যেই অন্তত ৪০০টির বেশি বাস চালু হতে পারে বলে। ২০২৩ সালের মধ্যে চালু হবে বাকি ৮০০টি ই-বাস। তাছাড়া অন্তত ১০০ জনের যাত্রীবাহী একটি বিদ্যুৎচালিত ফেরি সার্ভিস চালুর ভাবনা রয়েছে রাজ্য সরকারের। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়িত হতে পারেও বলে জানা গেছে। সাথে রাজ্য সরকার ১০০০ টি সিএনজিচালতি বাস চালু করার কথাও ভাবছেন।


আরও পড়ুন-রান্নাঘরে যাত্রা শুরু, আজ ঠাঁই লাখো দেশবাসীর হৃদয়ে, ভিকো-র লড়াইটাকে স্যালুট


এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, গত মাসেই দিল্লীতে কেন্দ্রের ফেম -২ প্রকল্পের আওতায় কলকাতায় ২০০০ টি বৈদ্যুতিক বাস সরবরাহের অধিকাংশ পায় টাটা মোটরস। এছাড়া প্রথম ২৫০ টি বাস তৈরির বরাত পেয়েছে অশোক লেল্যান্ডস। চুক্তি অনুযায়ী, বাসের দামের ৬০ শতাংশ টাকা প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে সংস্থাকে দেবে কেন্দ্র। বদলে আগের মতোই বাস চালানো এবং তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে নির্মাণকারী সংস্থাকে। ফলস্বরূপ অশোক লেল্যান্ডসের দেওয়া বাসগুলির প্রতিটির জন্য প্রতি এক কিলোমিটারে ৪৭ টাকা ৪৯ পয়সা হিসেবে দৈনিক ২০০ কিলোমিটারের ভাড়া দিতে হবে সংস্থাকে।


মুর্শিদাবাদে বৈদ্যুতিন বাস তৈরির কারখানা


এবছর শিল্প সম্মেলনের মঞ্চ থেকে রাজ্য নতুন আশার আলো দেখছে। জানা গেছে, এবছরে মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের শিল্পতালুকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করে শুরু হতে চলেছে ই-বাস তৈরির কারখানা। কৌশিস ই মোবিলিটি প্রাইভেট লিমিটেড নামক সংস্থাটি ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদ জেলা শিল্প কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার তন্ময় ব্রহ্ম জানিয়েছিলেন, ' ই- বাস তৈরীর কারখানা হলে তা প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।ফলে জেলার মানুষের অনেক সুবিধা হবে।


সংস্থার সিইও রবি কুমার পাঙ্গা শিল্প সম্মেলনে জানিয়েছিলেন,'আমাদের চাহিদা ছিল নদী বন্দরের কাছে কোন জমি।সেইমতো রেজিনগরের জমি আমাদের পছন্দ হয়েছে। আগামী দুবছরে কাজ শেষ হয়ে যাবে। প্রায় চার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হবে'। ১০ থেকে ১২ মিটার বাস তৈরি করবে এই সংস্থা। যার প্রতিটির আনুমানিক দাম হবে প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা। জানা গেছে পেরু, ইজরায়েল সহ বিভিন্ন দেশেও তাদের তৈরি ই-বাস সরবরাহ করে এই সংস্থা। তবে শুধুই ই - বাস নয় ই-রিক্সা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে এই সংস্থার।


কলকাতা ভারতের সবথেকে দূষিত শহরগুলির মধ্যে একটি। তবে রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে আগামী দুবছরে তিলোত্তমার ভোল বদলে দিতে পারে মনে করছেন অনেকেই।  পরিবেশ, কর্মসংস্থান এবং মূল্যবৃদ্ধিকে এক ঢিলেই নিশানা করতে চাইছেন তৃণমূল সরকার।

 

More Articles

;