নীল-সবুজে মোড়া পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর কুন্নুর

Anasuya Sen
৪ মিনিট
নীল-সবুজে মোড়া পাহাড়ের কোলে ছোট্ট শহর কুন্নুর

সালটা ২০১৯, নভেম্বর মাস, তখনও আমাদের দেশে এসে পৌঁছয়নি করোনা মহামারী | সেই সময় সকলে নিশ্চিন্তে, মনের আনন্দে পরিবারকে নিয়ে ঘুরতে যেতেন | ঘোরার পিছনে কোনও ভয় থাকতো না, ছিল না এত ধরণের নিয়ম শৃঙ্খলা, মাস্ক পড়া | ২০১৯ সালটা পেরোনোর পরে পরেই ২০২০ সালের শুরুর দিক থেকেই মানুষের জীবন-যাপন পাল্টে গেল | বাঁধা পড়ল সমস্ত জায়গায় যাওয়া আসা | তবে ২০২১ সালের মাঝা মাঝি থেকে আবার মানুষ আগের ছন্দে ফিরছে ঠিকই, কিন্তু পিছনে থাকছে প্রচুর নিয়ম যা মেনে চলতে হচ্ছে সকলকে | এমনকি অনেকে এখনও অবধি ভয় পাচ্ছেন বেড়োতে | তাই সব মিলিয়ে বলা যায়, আগে যেই ভাবে মানুষ চলা-ফেরা করতেন সেখানে অনেকটাই বদল এসেছে | যাই হোক এবার আসা যাক আজ যে বিষয় নিয়ে আমি লিখতে বসেছি |

২০১৯-এর দুর্গাপুজোর সময় হটাৎ আমার দাদাকে বললাম পাহাড়ি জায়গায় আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য | তবে যেখানে বেশি ভিড় হয় সেই সব জায়গায় যাবো না, কারণ আমার একটু ফাঁকা জায়গাই পছন্দ | ভিড়ের মধ্যে ঘুরে সেই আনন্দ পাওয়া যায়না যা বেশ ফাঁকা নিরিবিলি জায়গায় পাওয়া যায় | দাদা আমার কথা রাখলো এবং বলল যে পুজোর পর একটা খুব সুন্দর পাহাড়ি জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাবে | সেই মতোই পুজো শেষ হতে ভাইফোঁটার সময় আমি ও মা রওনা হলাম চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে | কারণ চেন্নাইয়ে থাকে আমার দাদা | চেন্নাইয়ে পৌঁছে সেখানে একদিন থেকে পরের দিন আমি,দাদা ও মা রওনা হলাম সেই সুন্দর পাহাড়ি জায়গাটির উদ্দেশ্যে | আর সেই জায়গাটি হলো "কুন্নুর" | তামিল নাড়ুর নীলগিরি জেলায় |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যরাতের ট্রেনে চেন্নাই থেকে রওনা দিলাম সকলে | পরের দিন ভোরে পৌঁছলাম মেট্টুপালায়াম স্টেশনে | চেন্নাই থেকে মেট্টুপালায়াম ট্রেনে খুব বেশি হলে ৯-১০ ঘন্টার দূরত্ব | মেট্টুপালায়াম স্টেশনে নেমে গাড়ি নিয়ে রওনা হলাম কুন্নুরের দিকে | প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘন্টা সময় লাগলো কুন্নুর যেতে | কারণ বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তা বদল করে আমাদের যেতে হয়েছিল | কথা ছিল 'টয় ট্রেনে' করে কুন্নুর যাব কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার কারণে 'টয় ট্রেন' বন্ধ করে দেওয়া হয় | অগত্যা গাড়ি করেই আমাদের পৌঁছতে হয় কুন্নুরে | কুন্নুর যাওয়ার পথটা ছিল অসাধারণ, চারিদিকে গাছ-পালা, পাহাড়ি রাস্তা, কুয়াশাতে ভরে গেছে, তার উপর বৃষ্টি হচ্ছে | আনন্দ হচ্ছিলো খুবই তবে পাশাপাশি ভয়ও করছিল একটু | পাহাড়ি রাস্তায় বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি করে যাওয়া খুবই রিস্ক | যাই হোক পাহাড়ি দৃশ্য, মেঘ, সাথে বৃষ্টি সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়েই পৌঁছে গেলাম কুন্নুরে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যকুন্নুরে নেমেই আমার চোখটা তৃপ্তিতে ভরে গেল | চারিদিকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, সে যেন এক অপরূপ স্বর্গীয় দৃশ্য | কুন্নুরে আমরা যে রিসোর্টটায় ছিলাম সেটা ছিল একদম পাহাড়ের কোলে | নাম 'বেল্লা ভিস্তা' | ভীষণ সুন্দর একটি রিসোর্ট | রিসোর্টটার উল্টো দিকেই পাহাড় | চারিদিকে মেঘ ভেসে যাচ্ছে | নীল আকাশের মধ্যে সাদা মেঘ ও চারিদিকে সুবুজ গাছ-পালা, মন ভরে যাওয়ার মতো একটি জায়গা | দুপুর ১টা নাগাদ ফ্রেশ হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ঐ ছোট্ট শহরটির আনাচে-কানাচে ঘুরতে | প্রথমে গেলাম কুন্নুরের 'সিমস পার্কে' |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যনানা ধরণের গাছ ও ফুলে মোড়া ওই পার্কটি | এত ধরণের ফুলের গাছ ডিজাইন করে সাজানো, তা আগে কোনদিন আমি দেখিনি | বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরী করা হয়েছে ওই পার্কটি | জায়গাটি একটু ঢালু তাই ধীরে ধীরে নামতে হয় | সুন্দর ভাবে রাস্তা তৈরী করা আছে | একদম নিচে নামলে সেখানে বোটিং করারও জায়গা আছে | অনেকেই বোটিং করছিলেন তবে আমরা আর করিনি | প্রায় ২ঘন্টার কাছা-কাছি লেগে যাবে পুরো পার্কটি ভাল করে ঘুরে দেখতে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যসিমস পার্ক থেকে আমরা গেলাম কুন্নুরের ডলফিন নোসে | সেখানে গিয়ে আপনার চোখ অবশই মুগ্ধ হয়ে যাবে | মনে হবে যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছি | ভীষণ সুন্দর একটি জায়গা | মুখের সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে সাদা মেঘ | এক অদ্ভুত দৃশ্য | তবে হ্যাঁ এই জায়গায় গিয়ে একটু সাবধান, প্রচুর ছোট ছোট বাঁদর রয়েছে, মানুষের হাতে কিছু দেখেলেই কেড়ে নিয়ে পালায় | যারা ছবি তুলতে ভালবাসেন তাদের জন্য একদম পারফেক্ট জায়গা | অসাধারণ বেশ কিচু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা যাবে | ডলফিন নোসের উল্টো দিকেই একটি ভীষণ সুন্দর ঝর্ণা আছে, যা মুগ্ধ করবে সকলের চোখ | পাশাপাশি ওই জায়গা থেকেই দেখা মেলে কোদাইকানালের | মেট্টুপালায়াম থেকে কুন্নুর যাওয়ার টয় ট্রেনটিকে বলা হয় কুন্নুরের হেরিটেজ ট্রেন | সেটি হ'ল লাইট ব্যাকড্রপস এবং সেতুগুলির মধ্য দিয়ে একটি স্লো-মোশন টয় ট্রেন যা উচ্চ উচ্চতায় রোলার-কোস্টার রাইডকে চিত্রিত করে |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যউনিশ শতকের যুগে চা এবং কফি পরিবহনের মাধ্যম এই হেরিটেজ ট্রেনটির পরিষেবা শুরু হয় | এই টয় ট্রেনের যাত্রাটা অনেকটা শামুকের গতির মতো, ঘন্টায় ৬০কিলোমিটার বেগে এই ট্রেন চলে | বিস্তীর্ণ এলাকা জোড়া চা-বাগান এবং মেঘ ও কুয়াশার রহস্যে মোড়া পাহাড়ি পথের উপর দিয়ে এই ট্রেন যাত্রা করে | জায়গাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বলিউডের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ভীষণ ভাবে আকর্ষণ করে | শাহরুখ খান ও মালাইকা অরোরা খান অভিনীত 'দিল সে' ছবির মধ্যে 'চল ছাইয়া ছাইয়া' গানের সিকোয়েন্সটির শুটিং এই খানেই হয়েছিল |

এছাড়াও কুন্নুরে দেখার মতো রয়েছে, সেন্ট জর্জ চার্চ, লস ফলস, রাল্লীয়া দাম, লাদি ক্যানিন সিট্, রয়েছে, কেটটি ভ্যালি, ল্যাম্বস রক, ওয়েলিংটন স্টেশন, হিডেন ভ্যালি সহ আরও কিছু জায়গা |

কুন্নুরে বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ এতটাই গভীর, যে সেখানে যিনিই যাবেন তাকে কুন্নুর বারবার আকর্ষণ করবে |

কীভাবে যাবেন?

হাওড়া বা শিয়ালদাহ স্টেশন থেকে থেকে চেন্নাই বা দমদম বিমানবন্দর থেকেও চেন্নাই যেতে পারেন | তারপর চেন্নাইয়ের সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে রাতের ট্রেনে মেট্টুপালায়াম | মেট্টুপালায়াম-এ নেমে গাড়ি বা টয় ট্রেনে করে সোজা কুন্নুর |

ছবি সৌজন্যে : লেখক | কুন্নুর উপত্যকার দৃশ্যপঞ্চাশ বছরেরও পুরোনো কুন্নুরের এই হাইফিল্ড চা কারখানাটি | এই চা কারখানাটিতে নীলগিরির পর্বতমালার সংলগ্ন চা বাগানের নতুন এবং সুন্দর চা পাতা ব্যবহার করে | চা ছাড়াও, সেখানে বিখ্যাত ইউক্যালিপটাস তেল | পাশাপাশি ওই কারখানার কর্মীরা বিভিন্ন ধরণের চকোলেটও বানিয়ে থাকেন | অনেকেই সেখান থেকে কেনাকাটি করে থাকেন | এখানে লাল এবং সবুজ চা-এর বৈচিত্রও খুঁজে পাবেন | তবে বর্ষার সময় এই জায়গাটি দেখার পরামর্শ দেওয়া হয় না |

লিখেছেন
Anasuya Sen
Anasuya Sen
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।