ইলিশের পেটে বালি, পাল্টে যাচ্ছে স্বাদ! বাঙালির প্রিয় মাছ বয়ে আনছে দুঃসংবাদ

শিল্পাঞ্চলের দূষিত জল পরিশোধন করার কোনও চেষ্টাই করা হচ্ছে না। সেই বিষাক্ত জলের অগাধ বিচরণ মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ইলিশের গঠন এবং স্বাদের ওপর।

Satyaki Tat
৩ মিনিট
ইলিশের পেটে বালি, পাল্টে যাচ্ছে স্বাদ! বাঙালির প্রিয় মাছ বয়ে আনছে দুঃসংবাদ

বাঙালির মুখে হাসি ফুটছে আবার। একেই আকাশের মুখ দিনের বেশিরভাগ সময়ই এখন ভার, বর্ষার ভরা আমেজ মাঝেমধ্যেই টের পাওয়া যাচ্ছে। এর মাঝে ভোজনরসিক বাঙালি পেয়েছে এক দারুণ সুখবর। গ্রীষ্মের দুপুরে দাবদাহে জর্জরিত হওয়ার পর সন্ধের কালবৈশাখীর মতো স্বস্তি দিয়ে বাজারে এখন ইলিশের ছড়াছড়ি। বর্ষাকালে একটু ইলিশের স্বাদ না পেলে বাঙালির চলবে কী করে? তাই জোগান বেড়ে যাওয়ায় এবং তার ফলে বাজারের নিয়মে ইলিশের দাম কমায় চারদিকে বেশ খুশির বাতাবরণ। সব সংবাদমাধ্যম ফলাও করে খবরও করছে সেই বিষয়ে। কিন্তু ইলিশ-সংক্রান্ত সব খবর সামনে আসছে কি?

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের স্বাদে চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ার খবর হয়তো এখনও অনেকেরই অজানা। চর্চা হচ্ছে না, কীভাবে নদী দূষিত হচ্ছে এবং তার ফলস্বরূপ নদীর জলে কমছে ইলিশের খাদ্য। সামনে আসছে না ইলিশের পেটে অতিরিক্ত বালি এবং বর্জ্যপদার্থ পাওয়ার খবর।

সম্প্রতি বাংলাদেশের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় হওয়া গবেষণায় জানা গেছে, ইলিশের পেটে এখন প্রায় ৩৬ শতাংশ বালি এবং অন্যান্য নানা অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে। নদীতে দূষণের কারণে ইলিশের খাদ্য কমে যাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে তার খাদ্যাভ‍্যাস এবং তার জেরেই এমন বিপর্যয়। রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের ইলিশের খাদ্যের মধ্যে ৪২ শতাংশ শৈবাল, এবং তারপরেই আছে বালি এবং অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ইলিশের নামে আসলে কি বিষ খাচ্ছেন? কীভাবে বুঝবেন...

বিষাক্ত রাসায়নিক ফর্মালিন মৃতদেহ সংরক্ষণ করতে এবং মর্গে মৃতদেহের ক্ষয় রোধ করতে ব্যবহৃত হয়।'

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। বাড়ছে নদীদূষণ। বেপরোয়া বালি উত্তোলন ছাড়াও নদীর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন, সেই সঙ্গে জলে তৈলাক্ত ও বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ যত দিন যাচ্ছে, বাড়ছে। শিল্পাঞ্চলের দূষিত জল পরিশোধন করার কোনও চেষ্টাই করা হচ্ছে না। সেই বিষাক্ত জলের অগাধ বিচরণ মারাত্মক প্রভাব ফেলছে ইলিশের গঠন এবং স্বাদের ওপর।

অথচ ইলিশের উৎপাদন অনেক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০০৮-'০৯ অর্থবর্ষে ইলিশের উৎপাদন ছিল দুই লক্ষ আটানব্বই হাজার টন। ২০২০-'২১ অর্থবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লক্ষ পঁয়ষট্টি হাজার টনে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান খুশি করছে না বিশেষজ্ঞদের। বরং চিন্তার কারণ বাড়ছে, কারণ এই পরিসংখ্যান সামনে আনছে না প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশের সংখ্যা।

দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে অপরিণত ইলিশের সংখ্যা বেশ অনেকটাই। তার থেকেও বেশি চিন্তার হলো, এই অপরিনত ইলিশের ২৭ শতাংশের পেটে ডিম পাওয়া যাচ্ছে। এমনকী, মাত্র ১৭ সেন্টিমিটারের ইলিশের পেটেও দেখা যাচ্ছে ডিম। এই প্রবণতা আগামী দিনে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে আগামীদিনের ইলিশ উৎপাদনে।

এর কারণ হিসেবে নদীর দূষণ তো উঠে আসছেই। যা তাদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেছে, এবং তাপমাত্রাও প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। সেই সঙ্গে রয়েছে অসম্পূর্ণ পরিযান বা Migration। ইলিশের একটি মাইগ্রেশন সাইকেল আছে, তারা নদী থেকে সমুদ্রে যাবে এবং ফের তারা সমুদ্র থেকে নদীতে ফিরে আসবে। কিন্তু নদীর দূষণ, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত পলি এবং চড়া পড়ে যাওয়া সেই প্রক্রিয়াকে চূড়ান্তভাবে ব্যাহত করছে।

ইলিশের জীবনচক্র নিয়ে বলা হয়েছে, মাছটি নদীর মিঠে জলে জন্ম নেয়, নদীতে ছয় থেকে সাত মাস অবস্থান করে, তারপর বর্ষার শুরুতে নদীর জল যখন ঘোলাটে হয়ে যায়, তখন তারা সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করে। পরিণত হওয়ার পর যখন প্রজনন করার সময় আসে, তখন আবার নদীতে ফেরত আসে।

কিন্তু মানুষের যাবতীয় কার্যকলাপ এই সমস্ত প্রক্রিয়াকে ব্যহত করছে, বাকি সমস্ত প্রাণীর মতো ইলিশের অস্তিত্বকেও বিপন্ন করছে। বাঙালি কি নিজের স্বার্থেই একটু দূষণ কমানোর চেষ্টা করবে না?

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?