এবার পুজোর পরিক্রমা জমুক সেরা বনেদি বাড়ির দালানে

Kolkata Bonedi BariI Durga Puja Parikrama 2023: আড়ম্বরপূর্ণ নানাবিধ প্যান্ডেলের ভিড়ে পুজোর গন্ধ ভ্যানিশ! কিন্তু কলকাতার বুকেই রয়েছে এমন অনেক সাবেক পুজো, যার ইতিহাস থেকে ঐতিহ্য, মুগ্ধ করবে এক লহমায়।

Sohini Das
৩ মিনিট
এবার পুজোর পরিক্রমা জমুক সেরা বনেদি বাড়ির দালানে

চারদিকে তাকালেই থিম পুজোর ধুম। নানা ভাবনা, নানা আয়োজন দেখতে মোটেও মন্দ লাগে না। কিন্তু আড়ম্বরপূর্ণ নানাবিধ প্যান্ডেলের ভিড়ে পুজোর গন্ধ ভ্যানিশ! কিন্তু কলকাতার বুকেই রয়েছে এমন অনেক সাবেক পুজো, যার ইতিহাস থেকে ঐতিহ্য, মুগ্ধ করবে এক লহমায়। শহুরে প্যান্ডেল, থিম পুজো তো সবাই দেখবঅ, কিন্তু তার মধ্য়েই যদি দেখে ফেলা যায় শহরের সেরা সাবেক পরিবারের প্রতিমাগুলি, এবারের পুজো জমে যাবেই। কোথায় গেলে দেখা মিলবে সেরা সাবেক পুজোর। কলকাতার সেরা বনেদি বাড়ির পুজো কোনগুলি, রইল সুলুক সন্ধান।

বনেদি পরিবারের পুজোর মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছেই। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনরা এসে পুরনো বাড়িতে জড়ো হন এ সময়টায়। সারা বছরের বিবাদ, মনোমালিন্য দূরে সরিয়ে এ এক অনন্ত আনন্দের সময় যেন। বাড়ির ছেলেমেয়েরাই হাত লাগান প্রতিমা সাজানোর কাজে। বাড়ির কর্তারা তখন বাজার সরকার। গৃহিনীদের হাতে বিস্তর কাজ। এত বড় পুজোর আয়োজন বলে কথা। আর সময় পেলেই জমে ওঠে আড্ডা আর খাওয়াদাওয়া। সাবেক বাড়ির পুজো মানেই চেনা সেই দৃশ্য চোখে বসে রয়েছে আমাদের। সত্যি বলতে সাবেক বাড়ির পুজোয় কিন্তু এসব হয়েই থাকে। আর তেমনই সাবেক পুজোর সাক্ষী হতে চাইলে প্রথমেই তালিকায় থাকবে কোন কোন পুজো? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

সাবর্ণ রায় চৌধুরী বাড়ির পুজো

কলকাতার প্রাচীনতম বাড়ির পুজোগুলের মধ্যে একটি এই সাবর্ণ রায় চৌধুরী বাড়ির পুজো। জানা যায়, ৬১০ সালে স্ত্রী ভগবতী দেবীর ইচ্ছেয় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার এখানে প্রথম আটচালার দুর্গা প্রতিমার পুজো শুরু করেন। এখানে প্রতিমার বৈশিষ্ট্য বলতে আপনি দেখতে পাবেন লাল রঙের বা হালকা সোনালী রঙের মাতৃ প্রতিমা, এখানে দশমহাবিদ্যা থেকে মা দুর্গার ভিন্ন রূপের পুজো করা হয়ে থাকে। এখানে মহিষাসুরের গায়ের রং সবুজ। পুজোর শুরুটা কিন্তু হয়েছিল বড়িশার জমিদার বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপ। ক্রমে সেই পুজো শাখাপ্রশাখা ছড়াতে শুরু করে। সাবর্দের মোট আটটি পুজো শুরু হয়। তার মধ্যে শুধু বড়িশাতেই হয় ছটি পুজো। সেগুলি হল আটচালা বাড়ি পুজো ,বড় বাড়ি পুজো, বেনাকি বাড়ি পুজো, মেজো বাড়ি পুজো ,কালীকিঙ্কর ভবন পুজো এবং মাঝের বাড়ি পুজো। পাশাপাশি বিরাটিতে বিরতি বাড়ি পুজো ও অষ্টম পুজোটি হয় নিমতাতে নিমতা পাঠানপুর বাড়ি। সবকটিরই বেশ নামডাক। এই পরিবারের দূর্গা পুজো যেরকম রীতি মেনে সম্পন্ন হয় তাতে যোগিনী এবং উপদেবতারাও মহাসপ্তমী ও মহাষ্টমী তে পূজিত হন। শাক্ত, শৈবএবং বৈষ্ণব এই তিন ধারার প্রভাবই সাবর্ণ বাড়ির পুজোয় দেখা যায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কলকাতার পুজোর ভিড় থেকে মুক্তি? মন ভালো করবে জয়নগরের বনেদি বাড়ির এই পুজোগুলি

Traditional Durga Puja: জয়নগরের মিত্র পরিবার অন্যতম প্রাচীন পরিবারের একটি। দত্ত বাড়ির মতো এটিও লাল আর সাদা এই দুই অংশে বিভক্ত। এই পরিবারে প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয় ১১৪০ বঙ্গাব্দে, শ্রী মধুসূদন মিত্রের হাত ধরে।

ছাতুবাবু লাটুবাবু পরিবারের পুজো

উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে ছাতুবাবু লাটুবাবুর পুজো কিন্তু বেশ বিখ্যাত। ১৭৭০ সালে নিজের বসত বাড়িতে এই দুর্গা পুজোর প্রচলন করেন রাম দুলাল দে। পরবর্তী কালে তাঁর দুই সন্তান আশুতোষ দে এবং প্রমথ নাথ দে এই পুজোর হাল ধরেন। এই দুই ভাইই পরিচিত ছিলেন ছাতুবাবু ও লাটুবাবু নামে। তখন থেকেই এই পুজো ছাতুবাবু লাটুবাবু বাড়ির পুজো বলে বিখ্যাত। এখন অবশ্য সেই পুজোর দায়িত্ব সামলান ওই বাড়ির ট্রাস্টিরাই। এ বাড়ির প্রতিমায় দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী-সরস্বতী নয়, স্থান পায় দেবী দুর্গার দুই সখি জয়া ও বিজয়া। তাঁদের হাতের ভঙ্গি আশীর্বাদী। উত্তর কলকাতার সাবেক বাড়ির পুজোর মধ্যে বেশ বিখ্যাত এই পুজো।

শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো

শুধু উত্তর কলকাতা বলে নয়, গোটা রাজ্যের মধ্যেই অন্যতম পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী পুজো এটি। শোভাবাজার রাজবাড়ির দালানে বসে আড্ডা ছাড়া পুজো সম্পূর্ণ হয় না অনেকেরই। প্রচুর ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোকে ঘিরে। জানা যায়, ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ব্রিটিশের জয়কে উদযাপন করতেই এই দুর্গাপুজোর সূচনা। রাজা নবকৃষ্ণ দেব নির্মিত বড় রাজ বাড়িতেই সম্পন্ন হয়েছিল সেই প্রথম পুজো। প্রথম বার পুজোর সময় নাকি বিশেষ অতিথি হিসাবে লর্ড ক্লাইভ ও ওয়ারেন হেস্টিংস নিমন্ত্রিত ছিলেন। পরবর্তীকালে রামকৃষ্ণ দেব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,স্বামী বিবেকানন্দের মতো কত বিখ্যাত মানুষের পদধূলি পড়েছে এই বাড়িতে। শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো কিন্তু হয় বৈষ্ণব মতে। এই পরিবারের প্রতিমায় দেবীর বাহন হিসেবে সিংহ নয়, থাকে ঘোড়া।

ভবানীপুর মল্লিক বাড়ির পুজো

কলকাতার বিখ্যাত বনেদি বাড়ির পুজো হিসেবে কিন্তু জনপ্রিয় ভবানীপুরের মল্লিক বাড়ির পুজো। এককালে অবশ্য এ পুজো কলকাতায় হত না। জানা যায়,বাব হুসেন শাহের আমলে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। কলকাতায় পুজোর শুরু ১৯২৫ সালে। একচালার সাবেকি মাতৃপ্রতিমা, যা নির্মাণ শুরু হয়ে যায় জন্মাষ্মীর পর থেকেই। মল্লিকবাড়ির পুজোও হয় বৈষ্ণব মতে। ফলে এই পুজোতেও পশুবলির রীতি নেই। জনপ্রিয় অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক ও তাঁর মেয়ে কোয়েল মল্লিক এই পরিবারেরই সদস্য। কলকাতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য সাবেকি বাড়ির পুজোর মধ্য়ে কিন্তু নাম রয়েছে এই পুজোটিরও।

এছাড়াও কিন্তু রয়েছে কলকাতার বুকে আরও বেশ কয়েকটি বিখ্যাত সাবেক বাড়ির পুজো। এই পুজোর পরিক্রমা জমুক না হয় সেই সব ইতিহাস ছুঁয়েই। আর বাদবাকি মণ্ডপ, পাড়া আর থিম পুজো তো রয়েইছে। কোনওদিক যেন বাদ না পড়ে এ বছর পুজোয়।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।