Film Review: নিম্নবর্ণের অধিকার সোচ্চারে আদায় করার ছবি 'কান্তারা'

Film Review: জল-জমি-জঙ্গল কার? এই প্রশ্নকে অন্য চোখে দেখে 'কান্তারা'।

Sourab Biswas
৩ মিনিট
Film Review: নিম্নবর্ণের অধিকার সোচ্চারে আদায় করার ছবি 'কান্তারা'

বিগত কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র বলিউডকে প্রায় ধরাশায়ী করে রেখেছে। আঞ্চলিক কনটেন্টও কতটা সর্বজনীন হতে পারে, তা আরেকবার মালুম হলো ঋষভ শেট্টি পরিচালিত ছবি ‘কান্তারা’ দেখতে গিয়ে। রবিবার ছুটির দুপুর; আইনক্স হাউজফুল। একটি রিজিওনাল ছবি দেখার জন্য এত মানুষের ভিড় দেখেই বোঝা যায় যে, শেষ ১৩-১৪ বছরে দক্ষিণী ছবি নিজেদের কোন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই ছবিটি ইতিমধ্যে IMDB সাইটে সর্বোচ্চ রেটিংপ্রাপ্ত ভারতীয় সিনেমা- ৯.৩ রেটিং ১০-এর মধ্যে। যদিও এই রেটি‌ং ছবির গুণমানের নির্ধারক একেবারেই নয়, তাও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ এই ছবি নিয়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মূলধারার ছবির সব মালমশলায় ঠাসা- প্রেম-রোমান্স, অ্যাকশন, রিভেঞ্জ সব মজুত। কিন্তু সঙ্গেই উঠে আসছে জাতি-বৈষম্যর রাজনীতি, সামন্ততান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ এক জমির মালিক, অরণ্যের অধিকার ঘিরে স্টেট ও স্থানীয় আদিবাসীদের উত্তেজনা। এখানেই বাকি প্রদেশে নির্মিত ছবিগুলোকে একপাশে ছিটকে দিচ্ছে 'কান্তারা'। দক্ষিণ ভারতের মানুষজন কতটা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম বোধ করে, এই ছবিগুলো তার প্রমাণ। একের পর এক দক্ষিণী ছবি প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছে।

কন্নড় ছবি ‘কান্তারা’ নিখুঁত নয়। অনেক জায়গায় সমস্যাজনক। নায়িকার কোমরে চিমটি কেটে প্রেমের দৃশ্য থেকে অনবরত অ্যাকশন ও দ্রুতি এই ছবির পরতে পরতে! কিন্তু এরপরেও তা আড়াই ঘণ্টা চেয়ারে বসিয়ে রাখে। এই সিনেমার কেন্দ্রবিন্দু কর্নাটকের একটি কাল্পনিক গ্রামের লোককথা, সেই আখ‍্যান ঘিরেই সিনেমা আবর্তিত হয়। কাহিনি তিনটে সময়কাল ঘিরে এগিয়ে চলে। তুখোড় সম্পাদনার ম্যাজিকে অতি দ্রুত লয়ে গল্প তরতর করে এগোয়।

সংস্কৃতে 'কান্তারা' অর্থ হলো অরণ্য। প্রায় দেড়শো বছর আগে এক রাজা সেখানকার আদিবাসীদের নিজের মনের শান্তির জন্য অনেকটা জমি দান করেন। এরপর অনেকটা বছর কেটে যাওয়ার পর সেই জমি নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। জল-জমি-জঙ্গল কার? অরণ্যের অধিকার সরকারের না সেখানকার আদিবাসীদের?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আজও সেরা ছবির তালিকায় 'পথের পাঁচালী', 'শোলে'! কতটা ক্ষতি হচ্ছে ভারতীয় সিনেমার

FIPRESCI List: আশ্চর্যের বিষয় এই যে, কেবল এই দশটি ছবিই বেশি ভোট পেয়েছে। মানে, দশ নম্বর তালিকায় থাকা 'শোলে'-কে টপকাতে পারেনি অন্যান্য অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ছবিও!

অরণ‍্যের বাসিন্দারা 'কাম্বালা' নামে এক উৎসব করে। সেই উৎসবের অন্তর্গত কোলা তাদের এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। এই গল্পের নায়ক শিবা-র পরিবারে দেবতা ভর করে ১৯৭০ সালের এক কোলা উৎসবে। রাজার এক বংশধর নিজেদের জমি ফেরত চেয়ে মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনার ২০ বছর পর ফরেস্ট অফিসার মুরলির সঙ্গে শিবার বিরোধ বাধে জমির অধিকার নিয়ে। তারপর নানা মোড় ঘুরে ফিরে পাওয়া অরণ‍্যের অধিকার, আখ‍্যানের মূল সুর এটিই।

গল্প সেই চেনা খাত বেয়েই এগিয়ে চলে- অন্যায়ের বিরুদ্ধে অধিকারের জয়! কিন্তু এই সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা অনবদ্য। পরিচালক ঋষভ শেট্টি একই সঙ্গে এখানে ছবির পরিচালক, লেখক ও নায়ক। প্রত্যেকটা বিষয় বেশ দক্ষতার সঙ্গে উতরেছে। মুগ্ধ করে ছবির আবহসংগীত। প্রত্যেকটা দৃশ্যে অসম্ভব যত্নের ছাপ ছবিজুড়ে। সিনেম‍্যাটোগ্রাফার অরভিন্দ কাশ্যপের কাজ দুর্দান্ত। ফ্রেমে ক্যামেরার জাদুস্পর্শে মায়াবী দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন। জঙ্গলের মধ্যে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর নির্মাণ খুবই উচ্চমানের। ঋষভ শেট্টি যেভাবে নিজেকে চরিত্রের ছাঁচে ঢেলে পুরো ছবিজুড়ে দাদাগিরি করে গেলেন, তা বিস্মিত করে। একটা দৃশ্যের উল্লেখ করতেই হবে- যেখানে নায়ক শিবা জানতে পারে আসল কলকাঠি নাড়ছে সেখানকার বর্তমান রাজার বংশধর। সোজা তার বাড়িতে প্রবেশ করে খাবার টেবিলে মুখোমুখি বসে খাওয়ার দৃশ্য রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করে। আসলে এতদিন নিম্নজাতি বলে কখনও সেই উচ্চবর্ণের মানুষের বাড়িতে সে পা পর্যন্ত রাখেনি। তাই এই দৃশ্য জাতি-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সটান থাপ্পড়ের মতো পর্দায় প্রতিফলিত হয়।

যুক্তি বিসর্জন দিয়ে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করার মাঝেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই ছবি নিয়ে উত্তেজনার কী আছে! সাউথে প্রত্যেক তিন মাসে এমন এক-একটা ছবি তৈরি হচ্ছে। ঠিক সেই সময় সাক্ষী থাকতে হবে এক অসাধারণ সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতার- শেষের পনেরো মিনিট। ঋষভ শেট্টির অভিনয় এক অসামন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করায়। হলে বসে দেখার সময় শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ক্লাইম‍্যাক্স এই ছবিটিকে অন্য এক উচ্চতায় তুলে নিয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা বাড়িতে ল্যাপটপে বসে পাওয়া অসম্ভব। বড়পর্দায় ছবি দেখার কোনও বিকল্প যে নেই, তা 'কান্তারা’ হলে দেখেই মালুম হয়।

দক্ষিণী ছবি প্রমাণ করে যে, সেখানকার মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে কতটা ওয়াকিবহাল। সেখানকার মানুষজন নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ যত্নে আগলে রেখেছে। আরও একটি বিষয় এক্ষেত্রে উল্লেখ্য অবশ্যই। অরণ‍্যের সঙ্গে জড়িত পৌরাণিক ভাবনার এমন চলচ্চিত্রায়ন ভারতে আর হয়েছে কি? রিজার্ভ ফরেস্ট, বা‌ সংরক্ষিত অরণ‍্যের রাজনীতির সঙ্গে মানুষের বসতির সংঘাত, আবার মিলন, এ যেন এক পরম্পরার ইতিহাসকে তুলে ধরছে লহমায়।

ছবি: কান্তারা

পরিচালক: ঋষভ শেট্টি

ক্যামেরা: অরভিন্দ কশ্যপ

অভিনয়: ঋষভ শেট্টি, সপ্তমী, কিশোর, অচ্ছুত কুমার, মানাসি সুধীর, প্রমোদ শেট্টি

লিখেছেন
Sourab Biswas
Sourab Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।