হয় ডান নয় বাম! জার্মানির তরুণদের ভোট কেন এই দুই দিকেই বিভক্ত?
Germany Election Result 2025: তরুণ ভোটারদের বেশিরভাগই সমর্থন করেছে বামপন্থী 'ডাই লিঙ্কে' পার্টিকে এবং দ্বিতীয় স্থানে কট্টর দক্ষিণপন্থী অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) বা অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি দল।
পূর্ব অনুমান অনুসারেই জার্মানির সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলে, মধ্য-দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল খ্রিস্টান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবার ক্ষমতা দখলের পথে। ২০০৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত অ্যাঞ্জেলা মার্কেল জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যা সিডিইউ-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য সময়কাল ছিল। চার বছরের ব্যবধানে রবিবারের নির্বাচনে আবার ক্ষমতা দখলের পথে সিডিইউ। নির্বাচনের ফলাফলে এগিয়ে থাকলেও জার্মান তরুণ ভোটারদের মন জয় করতে পারেনি সিডিইউ। জার্মানির সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগামীদিনের লড়াই কট্টর দক্ষিণপন্থী আর বামপন্থীদের মধ্যেই। কারণ জার্মানির তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা রাজনৈতিক মেরুর এই দুই প্রান্তে ঝুঁকেছে এবং এই তরুণ ভোটারদের বেশিরভাগই সমর্থন করেছে বামপন্থী 'ডাই লিঙ্কে' পার্টিকে এবং দ্বিতীয় স্থানে কট্টর দক্ষিণপন্থী অল্টারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) বা অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি দল।
যদিও জার্মানির খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন ২৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে সামগ্রিকভাবে বিজয়ী হয়েছে এবং বিদায়ী চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (এসপিডি) দলকে পরাজিত করেছে, তরুণ জার্মানদের মধ্যে সিডিইউ নেতা, ৬৯ বছর বয়সি ফ্রিডরিখ মের্জ, খুব কম সমর্থন পেয়েছেন। এএফডি ২০ শতাংশ ভোট পেয়ে সামগ্রিকভাবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনও দক্ষিণপন্থী দলের জন্য সর্বোচ্চ ফল। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ডাই লিঙ্কে সামগ্রিকভাবে ৮.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা পূর্ববর্তী সমীক্ষার তুলনায় বেশি এবং এক চমকপ্রদ সাফল্য। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল রেকর্ড-ব্রেকিং! ৮৩.৫ শতাংশ, যা ১৯৯০ সালে জার্মান পুনঃএকত্রীকরণের পর সর্বোচ্চ। ডাই লিঙ্কে তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে – যা সব দলের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২১ সালের নির্বাচনের তুলনায় এটি ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি বলে জানিয়েছে জার্মান নির্বাচন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনফ্রা টেস্ট ডিম্যাপ, যারা এআরডি পাবলিক ব্রডকাস্টারের জন্য এক্সিট পোল পরিচালনা করেছিল। তুলনামূলকভাবে চরম দক্ষিণপন্থী এএফডি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিজয়ী, কারণ দলটি ২০২১ সালের ফলাফলের তুলনায় দ্বিগুণ ভোট পেয়েছে। অভিবাসন নীতি কঠোর করা, অর্থনীতি এবং রাশিয়াপন্থী অবস্থানের কারণে দলটি নতুন ভোটার আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তরুণ ভোটারদের মধ্যে ২১ শতাংশ এএফডি-কে সমর্থন করেছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। সিডিইউ এবং খ্রিস্টান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) জোট ৬৩০ আসনের মধ্যে ২০৮টি আসন পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। তবে তাদের বেশিরভাগ সমর্থকই ৪৫ বছর এবং তার বেশি বয়সের। অন্যদিকে, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ তাদের ভোট দিয়েছে।
আরও পড়ুন- চরম দক্ষিণপন্থী ‘নব্য নাৎসি’-দের হাতে চলে যাচ্ছে জার্মানির শাসন ক্ষমতা?
জার্মানির নতুন প্রজন্ম কী নিয়ে চিন্তিত?
সিডিইউ সবচেয়ে বড় দল হলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায়, সরকার গঠনের জন্য দলটিকে একটি কোয়ালিশন গঠন করতে হবে। সরকার গঠনের জন্য ৩১৬ জন সাংসদ প্রয়োজন। বিদায়ী শাসক দল এসপিডি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছে। দলটির নেতা ও চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস তাঁর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছেন। তবে, মের্জ কোয়ালিশন গঠনের চেষ্টা করলে এসপিডি সরকারে থাকতে পারে। এসপিডি ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা ২০২১ সালের ১৫ শতাংশ থেকে কমেছে। ডাই লিঙ্কে এবং এএফডি, ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় হলেও, তরুণদের উদ্বেগকে সফলভাবে কাজে লাগিয়েছে। ২০২৪ সালে শেল এনার্জি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানির ১২ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের ৮১ শতাংশই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। ৬৭ শতাংশ দারিদ্র্য নিয়ে এবং ৬৪ শতাংশ পরিবেশ দূষণ নিয়ে চিন্তিত। ২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণায় ২,০০০ জন তরুণের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের ৪১ শতাংশই উদ্বিগ্ন বাড়তে থাকা অভিবাসন নিয়ে। এছাড়াও, এএফডি-র জনপ্রিয়তা আবাসন সংকট, অর্থনীতি ও দারিদ্র্যের কারণে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এএফডি তরুণ পুরুষ ভোটারদের আকর্ষণ করেছে কারণ দলটির অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডা এখন অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। চার বছর আগের তুলনায় তরুণ ভোটাররা এএফডি-এর এজেন্ডা নিয়ে এখন কম ভীত। তরুণদের মধ্যে এএফডি-এর সমর্থন মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি। যদিও তরুণ পুরুষরা এখনও বয়স্ক পুরুষদের তুলনায় বামপন্থী দলগুলোকেই বেশি ভোট দেয়, তারা তরুণ মহিলাআদের তুলনায় অনেক বেশি হারে এএফডি-কে সমর্থন করে। ২৫ বছরের কম বয়সি পুরুষদের এক-চতুর্থাংশ এএফডি-কে ভোট দিয়েছে, যেখানে সমবয়সি মহিলাদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৪ শতাংশ। এই পার্থক্যের কারণ স্পষ্ট নয়, তবে অভিবাসন ও লিঙ্গ সমতার বিষয়ে বিরোধপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান বিভাজন সৃষ্টি করছে।
বামপন্থী ডাই লিঙ্কে কেন জনপ্রিয়?
সাম্যবাদী রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী ডাই লিঙ্কে একটি 'অভিবাসন সমাজ' গঠনের পক্ষে, যেখানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে এবং কাউকে নির্বাসিত করা হবে না। দলটির ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, "আমরা এমন একটি সমাজের জন্য লড়াই করছি যেখানে কোনও শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হবে না, যেখানে প্রত্যেক মহিলা ও পুরুষ শান্তি, মর্যাদা এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবে। এটি অর্জনের জন্য আমাদের ভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা দরকার – গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র।" ডাই লিঙ্কে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের সক্রিয় উপস্থিতি, বিশেষ করে টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে। দলের নতুন প্রধান নেতা হেইডি রাইখিনেকের সিডিইউ নেতা মের্জ-এর বিরুদ্ধে দেওয়া ভাষণ ভাইরাল হয়েছে। সার্বিকভাবে দলটি পূর্ববর্তী সমীক্ষার তুলনায় ভালো করেছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে, যা চার বছর আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। জার্মানির তরুণদের মধ্যে বামপন্থীরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইওরোপসহ গোটা বিশ্বে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান লক্ষ্যণীয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন সংকট, জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মতো একাধিক কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। ইওরোপে দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থানের পেছনে অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট একটি প্রধান কারণ।
অভিবাসন চিত্র
২০১৫ সালের পর থেকে সিরিয়া ও অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইওরোপে প্রবেশ করে। ইওরোপিয়ান বর্ডার অ্যান্ড কোস্ট গার্ড এজেন্সি 'ফ্রন্টিয়ার'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইওরোপিয় ইউনিয়নে ১৩ লক্ষেরও বেশি অবৈধ অভিবাসী প্রবেশ করে। এই ঘটনা অনেক ইওরোপিয় দেশের জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও সংস্কৃতিগত উদ্বেগ সৃষ্টি করে। দক্ষিণপন্থী দলগুলো এই উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসন বিরোধী অবস্থান নেয় এবং জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানিতে অল্টারনেটিভ ফর ডয়েশল্যান্ড (এএফডি) এবং ফ্রান্সে মেরিন লে পেন-এর ন্যাশনাল ৱ্যালি দল অভিবাসন বিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। হাঙ্গেরিতে ফিদেজ দলের নেতা ভিক্টর ওরবানের নেতৃত্বে দক্ষিণপন্থী শক্তি ক্ষমতায় রয়েছে, যিনি অভিবাসনের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছেন। ২০১৫ সালের অভিবাসী সংকটের সময় তিনি সীমান্তে বেড়া তৈরি করেন এবং বলেন, “আমরা হাঙ্গেরির খ্রিস্টান সংস্কৃতি রক্ষা করতে চাই।” এই জাতীয়তাবাদী এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হাঙ্গেরির জনগণের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। সুইডেনে সুইডেন ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা জিমি অকেসন বলেছেন, “সুইডেনকে আবার নিরাপদ করতে হলে অভিবাসন বন্ধ করতে হবে।” ইতালিতে লেগা (পূর্বে লেগা নর্দ) দলের উত্থান ভূমধ্যসাগর দিয়ে আগত অভিবাসীদের সংকটের সঙ্গে জড়িত। অর্থনৈতিক মন্দা এবং দক্ষিণ ইতালির দারিদ্র্যের মধ্যে অভিবাসীদের আগমন স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। লেগার নেতা মাত্তেও সালভিনি বলেছেন, “ইতালি অভিবাসীদের জন্য ইওরোপের শরণার্থী শিবির হতে পারে না।” এই বক্তব্য ইতালিয় জনগণের মধ্যে জাতীয় গর্ব এবং অভিবাসনবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে।
আরও পড়ুন-ট্রাম্পের পরিবারই ‘অনুপ্রবেশকারী’! কেন অভিবাসীদের নিয়ে কড়া আমেরিকা?
ইউরোপজুড়ে দক্ষিণপন্থীদের তীব্র উত্থান কেন?
দক্ষিণপন্থী উত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বৈষম্য আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং এর পরবর্তী সময়ে ইওরোপজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও বেকারত্ব বৃদ্ধি দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। অনেক ইওরোপিয় নাগরিক মনে করেন যে, ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণপন্থী দলগুলো এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বায়ন ও ইওরোপিয় ইউনিয়নের নীতির বিরোধিতা করে। ইওরোপের ৩০টি দেশের নাগরিকদের মনোভাব, বিশ্বাস এবং আচরণের তথ্য বিশ্লেষণ করে 'ইউরোপিয় সামাজিক সমীক্ষা'-র (European Social Survey) একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অঞ্চলে দক্ষিণপন্থী দলগুলোর সমর্থন বেশি। প্রতি বছর এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করে লিউভেন ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি (বেলজিয়াম) ও তুলনামূলক সামাজিক জরিপ কেন্দ্র (সিটি ইউনিভার্সিটি, লন্ডন)। সমীক্ষার পক্ষে উদাহরণস্বরূপ, ইতালিতে লেগা নোর্ড এবং গ্রিসে গোল্ডেন ডন দল অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ইওরোপিয় ইউনিয়নের (ইইউ) কেন্দ্রীভূত নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অসন্তোষও দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। অনেক ইউরোপিয় নাগরিক মনে করেন যে, ইইউ তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করছে। ব্রেক্সিট (ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগ) এই অসন্তোষের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দক্ষিণপন্থী দলগুলো ইইউ বিরোধী অবস্থান নিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে মেরিন লে পেন এবং নেদারল্যান্ডসে গীর্ট উইল্ডার্স-এর দল পার্টি ফর ফ্রিডম ইইউ বিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। বিশ্বায়ন ও বহুসংস্কৃতিবাদের ফলে অনেক ইওরোপিয় নাগরিক তাদের জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় হারানোর আশঙ্কা করছেন। দক্ষিণপন্থী দলগুলো এই আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার কথা বলে। উদাহরণস্বরূপ, হাঙ্গেরিতে ভিক্টর ওরবানের দল ফিডজ সাংস্কৃতিক ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার কথা বলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
দক্ষিণপন্থী উত্থানের আরও একটি কারণ হলো সন্ত্রাসবাদ ও নিরাপত্তাহীনতা। ইওরোপে সন্ত্রাসবাদী হামলা ও নিরাপত্তাহীনতা দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। অনেক ইওরোপিয় নাগরিক মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণপন্থী দলগুলো কঠোর অভিবাসন নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্সে চার্লি হেবডো হামলার পর মেরিন লে পেন-এর দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। দক্ষিণপন্থী দলগুলো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের বার্তা সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয় এবং ঐতিহ্যবাহী মিডিয়ার প্রভাব এড়িয়ে যায়। 'ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট'-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে রাজনৈতিক খবর পান এবং জ্ঞান আহরণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচার সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে সফল হয়। অনেক ইওরোপিয় নাগরিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনীতিবিদদের প্রতি অসন্তুষ্ট। তারা মনে করেন যে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের চাহিদা ও উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিচ্ছে না। দক্ষিণপন্থী দলগুলো এই অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের 'প্রতিষ্ঠানবিরোধী' হিসেবে উপস্থাপন করে। উদাহরণস্বরূপ, ইতালিতে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এবং স্পেনে ভক্স দল প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান নিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ভক্স দলের শীর্ষ নেতা সান্তিয়াগো আবাস্কাল বলেছেন, "আমরা ঐতিহ্য, পরিবার ও খ্রিস্টান মূল্যবোধ রক্ষা করব।" দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থান একটি জটিল ও বহুমাত্রিক ঘটনা। অভিবাসন, অর্থনৈতিক সংকট, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট, সন্ত্রাসবাদ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অসন্তোষ এই উত্থানের মূল কারণ। এই প্রবণতা ইওরোপ ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের রাজনৈতিক ভূগোলকে প্রভাবিত করছে। ক্রমেই জনগণের মধ্যে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করছে, যা ভবিষ্যতে ইওরোপিয় রাজনীতির গতিপথকে প্রভাবিত করবে।
তথ্যসূত্র:
বিবিসি নিউজ, কেন ইউরোপ দক্ষিণপন্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ২০২৪
দ্য গার্ডিয়ান, ইউরোপে জাতীয়তাবাদের উত্থান, ২০২৩
দ্য ইকোনমিস্ট, ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন, ২০২৪