'ইন্ডিয়ায় সহজে মাছ মেলে না', তাই ওপার থেকে এল হাঁড়িভর্তি সরষে-ইলিশ

Partition Stories: দুঃখমুহ্যমান এরা সবাই শুধু মাছের ঝুল খাচ্ছে না ভাত দিয়ে মেখে, একটু একটু করে মাছের সঙ্গে খাচ্ছে তীব্র শোক আর তীব্রতর ব্যথা, স্মৃতি।

Jagannathdeb Mondal
৩ মিনিট
'ইন্ডিয়ায় সহজে মাছ মেলে না', তাই ওপার থেকে এল হাঁড়িভর্তি সরষে-ইলিশ

বরিশালের মুলাদি মাউলতলার ভিটে ছাড়ার সময় বড় মাটির হাঁড়িতে ইলিশ মাছের ঝুল রান্না করে আনা হয়েছিল। সেই চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলা বাস্তুভিটের কথা মনে পড়ে খুব। দাদুরা শুনেছিল, ইন্ডিয়ায় এমন সহজে জল, এমন সহজে মাছ মেলে না, তাই এই ব্যবস্থা।

ভোররাত থাকতেই উঠে বারান্দায় লম্ফ জ্বালিয়ে রাখা।কাঁঠালকাঠের জিনিস, পাথরের থালা, পিতলের ঘট নিয়ে জলভরা চোখে নৌকায় ওঠা। গোয়ালের গোরুগুলির দড়ি ছেড়ে দেওয়া। আকাশ ফরসা হচ্ছে, কুপি জ্বলছেই, আশপাশের লোক ভাববে আলো আছে যখন বাড়িতে লোক আছে, বেলা বাড়লে বোঝা যাবে ব্যাপারখানা। শূন্য বাড়ি, ফাঁকা ঘরদোর, দড়িছেঁড়া গোরু দৌড়চ্ছে কলাবাগানের দিকে।

শেষবারের জন্য দিদিমা উঠোন লেপে গড় করছেন তুলসীতলা। বাড়ির পোষা বিড়াল কিছু বুঝতে পেরেছে।ও খালি ছোট থাবা নিয়ে পায়ের কাছে মিউমিউ করে ঘুরছে। ও টের পেয়ে গিয়েছে কিছু। ওর নাম ছিল- হরগৌরী।

কয়েকমাস আগেও বালিকা কাননবালা বাবা ধুলোর পিছন পিছন গরুছাগলের হাটের পাশে বসে থেকে বাঁশের জিনিস বিক্রি করেছে। দেখেছে, কীভাবে কঞ্চির কাবাড়ি ঝুড়ি হয়ে যায় হাতের পরিশ্রমে। পাটের দড়ি দিয়ে গড়া চটের বস্তায় সে পয়সা গুনে রেখেছে। আটার রুটি কিনে খেয়ে দু'হাতে চুমুক দিয়ে খেয়েছে নদীর জল। সুপারির ব্যাপারিদের মুখে শুনেছে- "বটগাছের হিকড়ের কাসে যে গুদামঘর দেহা যায় ওর নিচের পানি লাল হইয়া গেসিল মাইনষের রক্তে... রায়ট... "

ঝিঁ ঝিঁ ডাকা রাতে উঠোনের ফুলফলবাগানের দিকে চাইলে ডর লাগে। পাঁচজন মেয়ে দুই ছেলে-বাবার কোল ঘেঁষে শুয়ে আছে। জোনাকি জ্বলছে। শিশুবালা বলে,

'আইছ্যা, ইন্ডিয়ায় নদী আসে?'

কোনও উত্তর নেই।

'বাবা, আমরা চইল্যা যামু?'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃত ছেলের শোক নিয়েই বাটামাছের বিকিকিনি! গ্রামের হাটে-বাজারে নানা রঙের গল্প

Rural Bengal: বাজারহাটে ঘুরে, পথে পথে বেরিয়ে একটু মানুষের কথা শুনলে, পাশে চুপ করে বসলেই আমরা বাঁচিয়ে ফেলতে পারব এইসব সত্যি বেঁচে থাকার কথনবিশ্ব।

পিতা এবার ধীরে ধীরে বললেন একটি শব্দ, হ।

'আমাগো ঘুম আসতিসে না বাবা, আপনে একখানা পরানকথা কন... '

বাবার গলার স্বর এবারে হুঁকো টানার শব্দের মতো হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সেকথা বলা শুরু করে। সে এই গল্প শুনেছিল তার বাবার কাছে। গল্পটি এইরকম,

পরাণ মণ্ডল নামে একজন চুনের বেসাতি করত ঘুরে ঘুরে। বহু নদীনালা জঙ্গলের দেশ পার হতো। বড় বড় চুলদাড়ি। সকাল-সন্ধে আকাশের দিকে চেয়ে থাকত।একদিন এক জঙ্গলে মোটা গাছের গুঁড়িতে সে বসেছে তামুক খাবে বলে। প্রাচীন গাছের গুঁড়ি শ্যাওলা জমে হলুদ। যেই না চকমকি ঠুকেছে, ওমনি গুঁড়ি নড়ে উঠেছে। গুঁড়ি আসলে ছিল বুড়ো ময়াল সাপ। এই ঘটনায় তার মন উদাস লাগে। সে নদী পার হতে গিয়ে খেয়া পায় না। তখন কাঁধের গামছা আড়াই হাত করে জলে বিছিয়ে তার ওপর বসে নদী পার হয়। সেই হাতে বোনা ঘামে ভেজা রংজ্বলা গামছা নদী পারাপার করে দিয়েছিল পরাণ মণ্ডলকে...

গল্পের ভিতর ঘুমিয়ে পড়ে পুত্রকন্যা। ভোরবেলা কিশোরী মাইয়াদের সুন্দর মুখে কালো কালি লেপে দেওয়া হয় লন্ঠন থেকে পাতায় কালি নিয়ে। যাতে কোনও রং না জেগে ওঠে, যাতে শয়তান হাত না বাড়ায় এই মাইয়্যাগো দিকে।

বড় বড় পাটগাছ। নদীর জলে ঢেউ। বড় লিচুগাছের তলায় থোপা থোপা অন্ধকার। ছাইগাদার পাশে মানঝোপ। ওখানে নদীর মাছ কোটা হতো। সব ছেড়ে চলে যাওয়া...

গোয়ালঘরে গরুদের সঙ্গে ঘুমিয়ে, খিদের পেটে মানুষের ভালবাসার দান ঘটিভরতি খেজুর রসে চুমুক দিয়ে পেট ভরানো। পথের লোকজন এরা সব। দিদিমা ময়নার গায়ে তুষের চাদর। সেটা ঘোমটার মতো মাথায় তুলে সে বলে, 'এই হগলডি মানুষ দয়াল পাঠাই দিসে আমাগো লইগ্যা...'

এরপর এক নাম না জানা গ্রামে আসতে গিয়ে জিনিসপত্রের অর্ধেক চুরি হয়ে গেল। হতভম্ব পরিবার বোবা হয়ে হাঁটছে। মাটির হাঁড়িটি পরিবারের একজনের মতো সঙ্গে রয়েছে।

অনেক কষ্টে এপারে এসে খিদের পেটে সস্তা ভাতের হোটলে সবাই বসেছে। চোখমুখে বদ হাওয়ার ঝাপটা লেগে লাল। সারা শরীর কেমন সুতোর মতো ঝুরঝুর! এরা সব সহ্য করেছে। অমঙ্গল পাখির ডানার ঝাপট।

হোটেলে খাবার দেওয়া হয়েছে, ভাত, ডাল,আলুভাজা, সজনে ডাঁটার তরকারি।

সজনে ডাঁটা দেখে অবাক হয়ে ভাবছে, 'এইডা আবার কীসের বেন্নুন!' না ছোঁওয়া ডাঁটা ডাঁই হয়ে থাকছে পাতে।

মাটির হাঁড়ি থেকে সরষেমেশানো তেলাকুচা পাতা আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে রাঁধা ইলিশ বের করা হলো। আহ! কী তার বাস! ওপারের জলের আশ্চর্য মাছ এপারের ডাঙায় বসে খাওয়া হচ্ছে। সরষের ঝাঁঝে নাকি অন্য কারণে, এদের সকলের চোখে জল।

মাটির হাঁড়িটা খাওয়া শেষে ধুয়ে রাখবে। জাম্বুরা বাগানের ওধারে বসতি করা হরি পালের গড়া হাড়ি।আর কোনও দিন তার সঙ্গে দেখা হবে না।

দূর থেকে আমি দেখতে পাচ্ছি, দুঃখমুহ্যমান এরা সবাই শুধু মাছের ঝুল খাচ্ছে না ভাত দিয়ে মেখে, একটু একটু করে মাছের সঙ্গে খাচ্ছে তীব্র শোক আর তীব্রতর ব্যথা, স্মৃতি। না হলে এরা যে বাঁচতে পারবে না।

এই গল্প বহুবার শুনে শুনে আমি স্পষ্টত সবটা চলচ্চিত্রমালার মতো দেখতে পাই। সেই গল্প বলার লোকগুলি, দেশভাগের স্মৃতি বুকেপিঠে আঁকড়ে নিয়ে যারা বেরিয়েছিল, তারা ধীরে ধীরে টুপটাপ করে মুছে যাচ্ছে, গল্পগুলোর মতোই। একদিন সবটা ঢেকে যাবে কুয়াশায়।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়েই গড়ে উঠেছিল ঢাকা কালীবাড়ি, দক্ষিণ কলকাতার মন্দিরের ইতিহাস

Dhaka Kalibari: দেশভাগের পর বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে নিজের শিকড়ের স্মৃতি ধরে রাখতে মন্দির গড়ে তুলেছিলেন ননীগোপাল চক্রবর্তী। দক্ষিণ কলকাতার প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোডের এই মন্দিরই আজ পরিচিত ঢাকা কালীবাড়ি নামে। মাটির প্রতিমা থেকে কষ্টিপাথরের বিগ্রহ, কালীপুজোর বিশেষ ভোগ—মন্দিরটির ইতিহাসে মিশে রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও দেশভাগের স্মৃতি। কী ভাবে?

বইয়ের জন্য হাঁটতে হয় কেন?

Walk for Books 2026: প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে বইমেলাকে মনে করে বইয়ের জন্য একবার হেঁটেছিল বাঙালি। তারপর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে আবার এই ৩১ অক্টোবর, ২০২৬-এ দেখা গেল সেই ছবি। হুড়দুড় করে ছেলেবুড়োমেয়েমদ্দ সব রাস্তায় নেমে এল—এ কী আজব খেলা রে ভাই!

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।