ইউনিট টেস্ট আর শুকতারা! পাড়াগাঁয়ের টিউশনই ছিল না-জানা গল্পের ক্লাস

Village Tuition Classes: বুড়ো সাইকেল, কাগজের ডাঁই, চশমা, কলম, চায়ের কাপ পড়ে রইল যে। আপনি কেমন হাসতে হাসতে চলে গেলেন। মাস্টারমশাই মারা গেলেন।

Jagannathdeb Mondal
৩ মিনিট
ইউনিট টেস্ট আর শুকতারা! পাড়াগাঁয়ের টিউশনই ছিল না-জানা গল্পের ক্লাস

চন্দ্রিমা হাজরা আমার ছোটবেলার দিদিমণি। অক্ষর চেনানো, উলের আসনে বসে হাতের লেখা সব শিখিয়েছিলেন ধৈর্য ধরে। চন্দ্রিমা নামটি বড় হয়ে জেনেছি, আমি সবসময় ডাকতাম চণ্ডী মা নামে। চণ্ডী মা দিদিমণি। দিদিমণিকে ডাকতে গিয়ে অজান্তে কেমন 'মা' শব্দটি উচ্চারণ করে ফেলতাম। দিদিমণির পড়ানো সেই নীলচে নীলচে কুয়াশাঘেরা কবরখানার পাশের ছোট্ট ইস্কুলবাড়ির পুঁচকে দিনগুলি থেকেই যোগীন্দ্রনাথ সরকারের 'হাসিখুসি' বইখানা আমার সঙ্গী ছিল, বন্ধু ছিল। তারপর প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর পরই বইটি হারিয়ে যায়। দিদিমণির দেওয়া উপহার ছিল।

ইস্কুলে ক্লাসের পরে আমরা দিদিমণির বাড়িতে গিয়ে দেখতাম, সারি সারি বই রাখা। প্রতি বই যত্ন করে সাজিয়ে রাখা। পড়া হলে হেলাফেলা করে নয়, কত নিপুণ যত্নে যেখানকার বই সেখানেই সাজিয়ে রাখতেন। এখনও ওই ছবিটা চোখে ভাসে, মাথার চুলগুলো বিকেলের হাওয়ায় উড়ছে, দিদিমণি বিকেলের আলোর নিচে বসে বই পড়ছেন। মলাট করছেন বাঁশপাতা কাগজে।

অনেকদিন পর অঘ্রাণ মাসের দুপুরে প্রাইমারি ইস্কুল, হাইস্কুল, কলেজ ফুরানো আমাকে হাসিখুশি বই উপহার দিল কাটোয়া কোর্টের পুরনো বই বিক্রি করা সেই জেঠু। লালচে লালচে পাতা, ঝুরো ঝুরো হয়ে গেছে। বহু পুরনো সংস্করণ। পাতায় পাতায় ছবি। বইটির জন্য একটি পয়সাও নিল না জেঠু। এমনি বিনিপয়সায় কত পুরনো পুরনো বই যে সে আমায় দিয়েছে! বইখানা কোলে নিতেই চোখে জল এল।দিদিমণির কথা মনে এল। কত ভালোবেসে একদিন 'হাসিখুশি' বই দিয়েছিল।

এক মুহূর্তে দিদিমণি আর এই বই বিক্রেতা জেঠু এক হয়ে গেল। জীবনের অধিকাংশই কাটল এদের বইয়ের সঙ্গে। বাড়ি ফিরে বইটিতে হাত বোলাচ্ছি যেন পুরনো বন্ধুর গায়ে হাত রাখছি। মা'কে পড়ে শোনাচ্ছি একটু। বাবা নিজে পড়ছে একটু। কতদিন পর যেন ছোটবেলার অতিথি এসেছে, হাত পা ধুয়ে আমাদের মাঝে গোল হয়ে চাটাইয়ে বসে কত কত ভুলে যাওয়া গল্প করছে...

২

একটু বড় হয়ে যার কাছে টিউশনি পড়েছি তিনি খসখসে সস্তা কাপড়জামা পরতেন, সাইকেল থেকে নেমে বাজারের থলে বারান্দায় রেখে,পাকশালায় রান্না চড়িয়ে আমাদের পড়াতেন। আন্তরিকতায় টলটল করতেন। কতবার পড়াতে পড়াতে মুড়ি, নিমকি, নাড়ুর বাটি এগিয়ে দিয়েছেন সস্নেহে।

বড় জামগাছ ছাওয়া শ্যাওলাধরা বাড়িটায় কেটে গেছে কত কত বছর। দলবেঁধে পড়তে যেতাম।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কামসূত্রেও যা নেই! পাড়াগাঁয়ের লুকোচুরি যেভাবে শেখায় শিরশিরে যৌনতার সহজপাঠ

Sexuality: বয়ঃসন্ধির শরীরে শিরশিরে ব্যথা নিয়ে এ ওকে স্পর্শ করে দেখছে, বুঝতে চাইছে আদিম রহস্যগুলি।

বিয়ে-থা করেননি। বইয়ের সঙ্গে ঘর-বসতি, সংসার।

সারা বাড়ি ছোট ছোট ফুলগাছে ভরা। টবে নয়, মাটির ভাঁড়ে, বাতিল পাত্রে। আর একটা নোনাধরা প্রাচীন পাতকুয়ো জবাগাছের ধারে।

মোটা ফ্রেমের চশমা, রোগা সাইকেলে হলুদ থলে ঝুলিয়ে মাস্টার চলেছে ভোরের ইষ্টিশনে কাগজ আনতে। বিজয়াভোরে কানের কাছে রেডিও এনে খবর শুনছেন। হাতে ঘড়ি বাঁধা একটু ঝুঁকে শব্দছক করছেন। বৃষ্টিতে সাদা দুপুরবেলা আমাদের পড়াচ্ছেন- পতিত হেরিয়া কাঁদে।

- স্যার, আমাকে দুটো শুকতারা দিন। পুজোসংখ্যা না হলেও হবে। কালকেই ফেরত দিয়ে যাব।

- নাইনে উঠবি, পরশু থেকে ইউনিট টেস্ট, এমন করলে চলবে?

- ও কিছু হবে না স্যার, সব হয়ে যাবে, বস্তায় বাঁধা পুরনো শুকতারা আমি দু'খানা নিলাম...

কবেকার জলে ডোবা কথা এইসব। সেলাইমেশিন চলে কিরকির। মাধ্যমিক হল উচ্চমাধ্যমিক হল কলেজ হল। দেখাসাক্ষাৎ কম হয়, একেবারে হয় না তা নয়। সকালের বাজারে ভোরের ইস্টিশনে কাগজ আনতে গিয়ে দেখা হয়ে যায়। কথা হয় অল্পস্বল্প। দেখা হলেই মাস্টারমশাই বলবে, কী পড়ছিস এখন?

বাবা, মানুষ দেখে বেড়াবি, আমি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়ছি, অসম্ভব ভাল।

একদিন মাস্টারমশাই জানতেও পারবে না, কত কত সংসারী ছাত্রছাত্রীরাও জানতে পারবে না এ খবর। বুড়ো সাইকেল, কাগজের ডাঁই, চশমা, কলম, চায়ের কাপ পড়ে রইল যে। আপনি কেমন হাসতে হাসতে চলে গেলেন। মাস্টারমশাই মারা গেলেন।

আমি চুপ করে দেখছি ঝিঙেফুলের ফুটে ওঠা সাঁঝে। এমন নিঝুম শান্ত ছিলেন আপনি।

শুধু বইকে ভালোবেসে বেঁচে থাকা মানুষজনের সংখ্যা দ্রুত বিলীয়মান।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।