জামার তলায় চুরি করা রুশদি! বইমেলায় ক্রমেই ফিকে হচ্ছে বইপাগলরা

Kolkata Book Fair 2023: ক্ষমতা প্রকাশের তাগিদে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা বই প্রকাশ করেন। জানতে খুব ইচ্ছা করে, বছরের অন্যান্য সময় বইগুলির কী অবস্থা হয়।

Rajarshi Dhara
৩ মিনিট
জামার তলায় চুরি করা রুশদি! বইমেলায় ক্রমেই ফিকে হচ্ছে বইপাগলরা

একটা শহর, যে শহর ভীষণ রাগে যুদ্ধ করতে জানে, আবার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড করতেও জানে, সেই শহর মাঝে মাঝে মত্ত হয়ে ওঠে। এই মত্ততা আক্রোশের নয়, আনন্দের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বা নন্দন, আকাদেমিতে যখন শহরের লোকজন দিকশূন্য চিন্তা করতে করতে আর সিগারেটের কাউন্টারে প্যাসিভ চুমু খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন সে আসে। শহরে মেলা আসে! কংক্রিটের জঙ্গলে মেলা লাগে। কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলা। এই একটা মেলা এখনও, এই মেলা-খেলায় মেতে থাকা রাজ্যের সবক'টা মেলাকে বলে বলে দশ গোল দিতে পারে। এই শহরের এত মানুষ থাকা যেমন অবিশ্বাস্য, অর্ধেককেই যেমন ভূত বলে মনে করেন লীলা মজুমদার থেকে সৃজিত মুখোপাধ্যায় অনেকেই, তেমনই এই একটা শহরে এত বই থাকতে পারে কী করে তাও আস্ত বিস্ময়! বইমেলায় আর সেরকম টান নেই, বইমেলায় আর সেই ঐতিহ্য নেই, বইমেলায় নতুন কিছু নেই- এসব অভিযোগ মাথায় নিয়েই তবু সে অনড়। বইকে কেন্দ্র করে জমাট বাঁধা এক জন সমাবেশ যেন! বই কেনা, বই খুঁজে মরা, বই হারানো, বই চুরি, বইয়ের ভাঁজে জন্মানো প্রেম, প্রথম প্রতিবাদের গন্ধ- সবটুকুই সময় বদলে বদলে এখনও আছে। খুঁজতে হলে অলি-গলি ঢুকে পড়তে হবে মেলার। দেখতে হবে, বইকে ঘিরে কী বিপুল এক শিল্প গড়ে উঠেছে রাজ্যে। অনলাইনের দাপটের মাঝেও সে কী ভাস্বর! এই শহর বইপাগলদের নিজস্ব আস্তানা, এই শহর সারা রাজ্যের বইপ্রেমীদের তীর্থ!

যে রাজ্যে চাকরি চুরি হয় প্রতিদিন নিয়ম করে, যে রাজ্যের শিক্ষা দফতরের ৯০ শতাংশই সেন্ট্রাল (বা প্রেসিডেন্সি) জেলে মশা মারতে ব্যস্ত, সেই বাংলায় এখনও বইমেলায় (যা বৃহৎ অর্থে দেখতে গেলে শিক্ষা সম্পর্কিতই মেলা) মানুষ অষ্টমীর একডালিয়ার মতোই ভিড় করে, এ সম্ভবত বাংলা বলেই সম্ভব। তবে হ্যাঁ, পরিসংখ্যান বলছে রাজ্যে শিক্ষা চাকরি চুরি হলেও বইমেলার বই চুরির ট্র্যাডিশন কিন্তু গত বইমেলা থেকে একদম বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এও একটা পরিবর্তন বটে!

বইমেলা ও বই চুরি নিয়ে এক অধ্যাপকের কাছে শোনা একটি গল্প মনে পড়ছে। তখনও বইমেলা ময়দানে হয়, কোনও একটি স্টলে আমাদের সেই অধ্যাপক (যিনি তখনও অধ্যাপক হননি) ও তাঁর এক বন্ধু ঢুকেছেন। স্যারের সেই বন্ধুর হাতে নাকি জাদু ছিল, সেই জাদু বইমেলাতেই দেখা যেত। এবার সেই বিশেষ স্টলে হাতের খেলা দেখিয়ে সেই বন্ধু সলমান রুশদির একটি বই জামার মধ্যে চালান করে দেন ও নির্বিকার মুখে স্টল থেকে বেরিয়ে আসেন। মেলার মাঠের অন্যপ্রান্তে এসে যখন তিনি বইটা জামার তলা থেকে বের করে দু' এক পাতা উল্টে দেখছেন, তখনই কাঁধে একটা হাত এসে পড়ল। সেদিন সম্ভবত বন্ধুর হাতের জাদু সম্পূর্ণ কাজ করেনি, স্টলের কোনও এক কর্মীর নজরে এসে যায় ব্যাপারটা। পরবর্তীতে স্যারের সেই বন্ধু রুশদির বইয়ের কিছুটা অংশ বাংলায় অনুবাদ করে পড়ে শুনিয়ে তবে ছাড়া পেয়েছিলেন। সৌভাগ্যের বা দুর্ভাগ্যের বিষয়, কলকাতা বইমেলায় এই ট্র্যাডিশন এখন আর নেই।

বইমেলায় প্রতিবছর এত বই লেখা হচ্ছে, ছাপা হচ্ছে, এবং তা বিক্রিও হচ্ছে! ভাবলে অবাক লাগে, এত লেখা আসে কোথা থেকে? আর সেই বইতে লাভই বা কত হয়? একটু গভীরে গিয়ে দেখলে যে চিত্রটি দেখা যাবে, বইমেলার বেশিরভাগ বই-ই লেখক নিজের পকেটের পয়সা খরচা করেই প্রকাশ করেন, অনেক বই থেকে কানাকড়িও লাভ হয় না। কিন্তু বইমেলায় বই প্রকাশের আবেগের কাছে লাভ-লোকসানের দাঁড়িপাল্লা ফুৎকারে উড়ে যায়। বইমেলা থেকে ফেরার পথে বাসে একবার এক অবাঙালি ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তিনিও বইমেলা থেকেই ফিরছেন। কথা বলে বোঝা গেল, এত বাংলা বই দেখে যারপরনাই বিরক্ত তিনি। এত বই ছাপিয়ে পয়সা নষ্ট করা নিয়েও বাঙালিদের একপ্রস্থ তুলোধোনা করলেন। নতুন বইয়ের গন্ধের মাদকতা সবাইকে ছোঁয় না স্বাভাবিকভাবেই। তবে যাঁদের ছোঁয় তাঁরাই জানেন, এ কোন ফাঁদ! তবে এমন অনেক বই বইমেলায় এমনও থাকে যা বইমেলার পরে ধুলোর চাদরে ঢেকেই থাকে। ক্ষমতা প্রকাশের তাগিদে রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা বই প্রকাশ করেন, তাঁদের কবিতা-অকবিতা নিয়ে বিস্তর তর্কও হয় ফি বছর। জানতে খুব ইচ্ছা করে, বছরের অন্যান্য সময় বইগুলির কী অবস্থা হয়। এই থরে থরে প্রকাশিত বই আসলে বইপ্রেমীদেরই বা কোথায় নিয়ে যায়? বইয়ের জন্য বাঁচতে ভালোবাসা মানুষের জীবনে এই গুচ্ছ গুচ্ছ পুস্তক কি আগের মতোই ঢেউ তোলে, এখনও?

যে মানুষটির বন্ধু সংখ্যা খুব সামান্য, বইমেলায় তাঁরাও দু' একজন চেনা মুখ ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবেনই মেলায়। দীর্ঘ দীর্ঘকাল দেখা না হওয়া বন্ধুদের পুনর্মিলন কেন্দ্র হয়ে ওঠে ধুলোবালির বইমেলা। প্রেমের আকর হয়ে ওঠে বইমেলার ধুলো, বই আর প্রেম মাখামাখি হয়ে কলকাতার সন্ধ্যাকে আরও মগ্ন করে তোলে। বাড়ি বদলে বদলে এক রাজধানীতে সে শীত বসন্তের চৌকাঠে একা ধ্রুবতারা। আকাদেমির উল্টোদিকের মাঠ, কলকাতা ময়দান, পার্ক সার্কাস, যুবভারতী, করুণাময়ী সেন্ট্রাল পার্ক, বাসা বদলে বদলে সে তবু নিজের শিকড় বদলায়না। ৪৬ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলায় মানুষ আসলে নিজেরই শিকড় খুঁজতে আসে, বইয়ের সঙ্গে নাড়ির টান খুঁজতে আসে। ফিকে হয়ে আসা নিজেকে খুঁজতে আসে।

লিখেছেন
Rajarshi Dhara
Rajarshi Dhara
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।