ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ, মোটা মাইনে ছেড়ে আঠা তৈরি! ফেভিকলের নেপথ্যে রয়েছেন এই মানুষ

Fevicol Success Story: আমেরিকা, থাইল্যান্ড, দুবাই, মিশর ও বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পিডিলাইট সংস্থা। সিঙ্গাপুরে একটি গবেষণা কেন্দ্রও তৈরি করেছে এই সংস্থা।

Ravhali Biswas
৩ মিনিট
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ, মোটা মাইনে ছেড়ে আঠা তৈরি! ফেভিকলের নেপথ্যে রয়েছেন এই মানুষ

বাজারে বা দোকানে যখন আঠা কিনতে যাই আমরা অনেকেই মনে মনে যে আঠাই চাই না কেন, বলে ফেলি, "একটা ফেভিকল দিন তো।" বেশিরভাগ ভারতীয়ই দোকানে গেলে আঠার বদলে, ফেভিকল দিন– এই কথাই বলে আসছে। আঠা আর ফেভিকল এদেশে সমার্থক। ফেভিকল আঠার ব্যাপারে জানেন না এমন মানুষ ভারতীয় উপমহাদেশ তো বটেই, এশিয়া মহাদেশেও নেই বললেই চলে। ফেভিকল ব্র্যান্ডকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি বলবন্ত পারেখ। সারা বিশ্ব আজও তাঁকে স্মরণ করে ‘ফেভিকল ম্যান’ হিসেবে। বলবন্ত পারেখ আর ফেভিকল যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনের মাঝে অনীহা ও অনিচ্ছা নিয়ে যে খুব বেশি দূর এগোনো যায় না, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন বলবন্ত পারেখ। মোটা বেতনের আইনজীবীর চাকরি ছেড়ে শুরু করেন পিয়নের কাজ। সেই পিয়ন থেকে হাজার কোটি টাকার কোম্পানির মালিক তিনি, দেশের ‘ফেভিকল ম্যান’। কিন্তু কোনও যাত্রাই যেমন একবারে সাফল্য পায় না এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অনেক কষ্ট, সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আজ বিশ্ব বাজারে ফেভিকল নিজের বাজার তৈরি করেছে।

বলবন্ত পারেখের জীবন

গুজরাতের ভাবনগর জেলার মাহুবা গ্রামে ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জৈন পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন এলাকার স্বনামধন্য আইনজীবী। বলবন্তের বাবা চেয়েছিলেন তাঁর দাদুর মতো বলবন্তও আইনি পেশা বেছে নিয়েই এগিয়ে যাবেন। কিন্তু সে পথে চলা শুরু হলেও মাঝপথেই থেমে যান। বাবার কথায় আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে মুম্বইয়ের একটি সরকারি কলেজে ভর্তি হলেও পড়াশোনা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন ভারত ছাড়ো আন্দোলনে। দ্বিতীয়বারের জন্য পড়াশোনা শেষ করতে গুজরাত থেকে মুম্বই ফিরলেও আইনের ডিগ্রি তাঁর নামের আগে জোড়েননি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাথায় যন্ত্রণা! মলমের এক মালিশেই চাঙ্গা ব্যথা, ১০০ বছরেও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে অম্রুতাঞ্জনের

Amrutanjan Balm : মাথা ব্যথার ওষুধ - অম্রুতাঞ্জন

পড়াশোনা-ব্যবসা থেকে পিডিলাইট সংস্থা তৈরি

কিন্তু আইনি পড়াশোনা শেষ করলেও আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছে তার ছিল না। গান্ধীজির মতো সত্য ও অহিংসায় বিশ্বাসী ছিলেন। আইনজীবীর পেশাকে মনে করতেন মিথ্যের ব্যবসা। সেই কারণে আইনজীবীর কালো কোট ছেড়ে একটি প্রিন্টিং প্রেসে কাজ জোগাড় করেন। পড়াশোনা চলাকালীনই তার বিয়ে হয়। এর উপর সংসারের বোঝা টানাও ছিল রীতিমতো কষ্টকর। শোনা যায়, বিয়ের কয়েক বছর অবধি তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে বন্ধুর গুদামে থাকতেন। দারিদ্র্যের জেরে কখনও প্রিন্টিং প্রেস কখনও বা কাঠের কারখানাতেও চাপরাশি হিসেবে কাজ করেছেন বলবন্ত। যদিও খুব বেশি দিন কোনও কাজই করতে পারেননি। অনেক চাকরি ধরেছেন ও ছেড়েছেন। মাঝে একবার জার্মানি যাওয়ার সুযোগ হলে সেখানে গিয়ে তিনি ব্যবসা সম্পর্কে বেশ কিছু পাঠ শিখে আসেন।

সেই শেখা থেকেই নতুন কোনও ব্যবসার বুদ্ধি ভাবতে থাকেন বলবন্ত। মাথায় একদিন এক ভাবনার উদয় হয়। তাঁর মনে পড়ে, তিনি যখন কাঠ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তখন সেখানকার শ্রমিকদের কাঠ জোড়া লাগানোর পেছনে অনেক পরিশ্রম করতে দেখতেন। আর কাঠ জোড়া লাগানোর জন্য তারা যে আঠা ব্যবহার করতেন, সেটা থেকে প্রচণ্ড মাত্রায় দুর্গন্ধ বের হতো। তিনি ভাবতে থাকেন এমন কোনও সুগন্ধি আঠা কি তৈরি করতে পারেন না, যা আগামী দিনে সবাই ব্যবহার করতে পারবেন? সেই সূত্র ধরেই ভাই সুনীল পারেখকে নিয়ে শুরু হয় পড়াশোনা।

অনেক চেষ্টার পরে বলবন্ত পারেখ সিন্থেটিক রাসায়নিক ব্যবহার করে আঠা তৈরির এক উপায় আবিষ্কার করেন। এরপরে তিনি তাঁর ভাই সুনীল পারেখের সঙ্গে ১৯৫৯ সালে ‘পিডিলাইট কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর বলবন্ত তাঁর দেশকে সুগন্ধি আঠা ‘ফেভিকল’ উপহার দেন। এরপর ধীরে ধীরে এমসিল, ফেভিকুইক, ফেভিক্রিল অ্যাক্রিলিক রং-সহ ২০০ টিরও বেশি জিনিস বাজারে আসে। পিডিলাইট সংস্থার ফেভিকল আঠার জোড়ের গল্প ধীরে ধীরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছে যায়। আমেরিকা, থাইল্যান্ড, দুবাই, মিশর ও বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পিডিলাইট সংস্থা। সিঙ্গাপুরে একটি গবেষণা কেন্দ্রও তৈরি করেছে এই সংস্থা।

শুধুমাত্র ব্যবসায়ী হিসেবে নয়। সমাজের বিভিন্ন দিকেও বহু অবদান রয়েছে বলবন্ত পারেখের। গুজরাতের মাহুবাতে আর্টস ও সায়েন্স কলেজের স্থাপনের জন্য তিনি সাহায্য করেছেন। ভাবনগর সায়েন্স সিটি প্রজেক্টের জন্য ২ কোটি টাকা দান করেছিলেন। স্কুল তো বটেই ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে গুজরাতের ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষা নিতে পারে তার জন্য ‘দর্শন ফাউন্ডেশন’ নামে একটি এনজিও গঠন করেন তিনি। ২০১১ সালের ২৮ অক্টোবরে এশিয়ার মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি টেক্সাসের দ্য ইনস্টিটিউট অব জেনেরাল সেমানটিক্সের ‘জে টালবত উইনচেল’ পুরস্কারে সম্মানিত হন। ২০১৩ সালে ৮৮ বছরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতের ‘ফেভিকল ম্যান’।

ভারতীয় বিজ্ঞাপনে নতুনত্ব ভাবনা এনে বরাবরই মন কড়েছে ফেভিকল। বহু ইতিহাস পেরিয়ে ফেভিকল একটি স্বনামধন্য ব্র্যান্ড। গত কয়েক দশক ধরে গ্রাহকদের সঙ্গে সুসম্পর্কেই সংযুক্ত রয়েছে এই কোম্পানি, এমনকী বলিউডে গান পর্যন্ত তৈরি হয়েছে ফেভিকল নিয়ে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে ফেভিকল। সামান্য আঠাকেও যে ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তোলা যায় সেই স্বপ্ন সফল করেছিলেন এই মানুষ, ভারতের ‘ফেভিকল ম্যান’ বলবন্ত পারেখ।

লিখেছেন
Ravhali Biswas
Ravhali Biswas
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।