অনুপর্ণাকে নিয়ে কেন চুপ মেইনস্ট্রিম মিডিয়া?

Film Director Anuparna Roy: তিনি শহরের মুখ নন, প্রান্তিক পুরুলিয়ার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। কলকাতাকেন্দ্রিক খবরের ভিড়ে বরাবরই চাপা পড়ে যায় অনুপর্ণাদের কথা।

Sangita Ghorai
৪ মিনিট
অনুপর্ণাকে নিয়ে কেন চুপ মেইনস্ট্রিম মিডিয়া?

বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়েছেন পুরুলিয়ার মেয়ে অনুপর্ণা রায়। ৮২তম ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিচালকের পুরস্কার এবং সাত মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন পেয়েছেন তাঁর পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘সংস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ (Songs of Forgotten Trees)-এর জন্য। আর তারপর থেকেই সমালোচিত হচ্ছেন তিনি। ইতালিতে ভেনিসের মঞ্চে তাঁর মন্তব্যকে ঘিরে বিতর্কের ঝড় বইছে সামাজিক মাধ্যমে।

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘অরিজন্তি’ বিভাগে প্রথম ভারতীয় হিসেবে সেরা পরিচালকের খেতাব জিতে নিজের বক্তব্য রাখার সময় অনুপর্ণা ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রতি তাঁর সংহতি জানান। তিনি বলেন, “প্রতিটি শিশুরই শান্তি এবং স্বাধীনতা প্রাপ্য এবং প্যালেস্টাইন কোনো ব্যতিক্রম নয়। এই মুহূর্তে প্যালেস্টাইনের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। আমার দেশ হয়তো অখুশি হবে (আমার কথায়), কিন্তু সেটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।”

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনুপর্ণা রায়

মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয় অনুপর্ণার এই বক্তব্য। এবং বিশ্বমঞ্চে ঘরের মেয়ের সম্মান অর্জনের প্রশংসার পরিবর্তে তাঁর বক্তব্য নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয় সমাজ মাধ্যম। নানা আক্রমণ ধেয়ে আসে অনুপর্ণার দিকে। কুরুচিকর মন্তব্য থেকে তাঁর ছবি বিকৃত করে পোস্ট, সবই চলে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে প্রান্তিক সমাজ থেকে উঠে আসা একজন মহিলা তাঁর বক্তব্য রাখবে তাও প্যালেস্টাইনের পক্ষে, এ তো মানা যায় না। তাই বিচারালয় খুলে বসে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর একাংশ।

বলি সুন্দরীদের ক্লিভেজ নিয়ে বা ‘উপস’ মোমেন্ট নিয়ে সংবাদ শিরোনাম করে মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত থাকা গোদি মিডিয়াকেও নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় অনুপর্ণার সাফল্যে। সত্যটা হলো, অনুপর্ণা যে এত বড় মঞ্চে যাচ্ছেন তেমন খবরও ‘বাজারি’ মিডিয়ার কাছে ছিল না। তাছাড়া তথাকথিত জাতীয়তাবাদীদের ভাষায় বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কথা বলেননি। তাঁর কথায় কোনো শিখিয়ে দেওয়া বুলি ছিল না বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান জানিয়ে যেতেই এই বিশ্বমঞ্চকে ব্যবহার করেছেন অনুপর্ণা। ঠিক যেমনটা একদা করেছিলেন জঁ-লুক গদার। তাই তথাকথিত প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম অনুপর্ণার সাফল্যকে দেশের সাফল্য বলে জয়গাঁথা লিখবে না সেটা স্বাভাবিক।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রাষ্ট্রপুঞ্জে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট ভারত-সহ ১৪২টি দেশের! বাস্তব কি বদলাবে?

India votes in favour of Palestine: তবে সমালোচকরা বলছেন, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেড়শোর বেশি প্রস্তাব গৃহীত হলেও ইজরায়েলের নীতি বা গাজার প্রতি আচরণে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি।

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনুপর্ণা রায়

সমাজমাধ্যমে যারা রে রে করে উঠেছে, তারা হয়তো জানেও না অনুপর্ণার ছবির বিষয়বস্তু কী? জানার আগ্রহও নেই। মিডিয়ারই তো দায়িত্ব ছিল অনুপর্ণার বিশ্বজয়ের খবর গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু গোদি মিডিয়া তা করেনি। কারণ তিনি শহরের মুখ নন, প্রান্তিক পুরুলিয়ার প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। কলকাতাকেন্দ্রিক খবরের ভিড়ে বরাবরই চাপা পড়ে যায় অনুপর্ণাদের কথা। মিডিয়া সাধারণত যারা বৃত্তের কেন্দ্রে রয়েছে, আলোর কেন্দ্রে রয়েছে তাকে নিয়েই প্রচার করে।

এই যে মিডিয়ার পক্ষপাত, একচোখামি তার কেন্দ্রে পুরুষতন্ত্রেরই বীজ রয়েছে। মিডিয়ার এই নিয়মের ক্ষেত্রে বাদ যান না কারাবন্দিরাও। এক্ষেত্রে ভেবে দেখা যেতে পারে গুলফিশা ফাতিমার কথা। ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা মামলায় শার্জিল ইমাম, উমর খালিদদের পাশাপাশি তিনিও গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু গোদি মিডিয়ায় যতটা উমর-শর্জিলদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, গুলফিশাকে নিয়ে লেখা হয়নি।

গুলফিশা ফাতিমা

এমবিএ পাশ ফাতিমা সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন এবং মহিলাদের সংগঠন ‘পিঞ্জরা টোড়’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২০ সালের ৯ এপ্রিল তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে দাঙ্গার ষড়যন্ত্র ও উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে এবং ইউএপিএ (UAPA) আইনে মামলা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি তিহার জেলে বন্দি, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। উমরের হয়ে গলা ফাটানোর লোক যত রয়েছেন, তত লোক সমাজমাধ্যমে গুলফিশার কথা বলেন না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
অনুষ্কা কী পরবেন! কে ঠিক করবেন?

Anushka Shankar freedom of dress: কেউ বলল, ‘আপনার পিতা শ্রদ্ধেয় পণ্ডিত রবিশঙ্কর-কে এতটুকু শ্রদ্ধা করলে আপনি এসব জঘন্য জামাকাপড় পরা ছবি তুলে সকলকে দেখাতেন না।’

অনুপর্ণা পরিচালিত সিনেমায় ফুটে উঠেছে নারী স্বাধীনতার গল্পই। মেয়েদের লড়াই হলো তাঁর গল্পের মূল সুর। Songs of Forgotten Trees সিনেমায় পিতৃতান্ত্রিক সমাজে দুই নারী ও তাঁদের অন্তরঙ্গতা নিয়ে সমাজের সঙ্গে লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি। ২০২৩ সালে ‘রান টু দ্য রিভার’ (Run to the River) তৈরি করেছিলেন ব্রিটিশ বাংলার প্রেক্ষাপটে, সেটি ছিল অনুপর্ণা পরিচালিত প্রথম শর্ট ফিল্ম। যেখানে তিনি এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বাল্যবিবাহের গল্প তুলে ধরেছিলেন। তারপর পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি, আর তাতেই বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি।

অনুপর্ণা পরিচালিত Songs of Forgotten Trees-এ প্রধান চরিত্রে রয়েছেন দুই নারী— কলসেন্টারের কর্মী শ্বেতা (সুমি বাঘেল) ও যৌনকর্মী থুয়া (নাজ শেখ)। কোনো আড়ম্বর নেই, মেকআপ নেই সিনেমায়। মুম্বইয়ে ভগ্নপ্রায় যে ফ্ল্যাটে অনুপর্ণা বাস করেন, সেখানেই সিনেমাটির শুটিং হয়েছে। সিনেমার গল্প অনুযায়ী, দুই নারী একই ফ্ল্যাটে একইসঙ্গে বাস করতে করতে ধীরে ধীরে এক অপরের কাছে আসেন।

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনুপর্ণা রায়

মীরা নায়ার, জোয়া আখতার, কিরণ রাও, রীমা দাস, পায়ল কাপাডিয়ার মতো নারী পরিচালকরা অনুপর্ণা রায়ের অনুপ্রেরণা। তাঁর শৈশব কেটেছে পুরুলিয়ার নিতুড়িয়ায়। নিতুড়িয়া রানিপুর কলিয়ারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক দেওয়া, এরপর হুড়া ব্লকের নপাড়ায় মামাবাড়িতে থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। বাবা ব্রহ্মানন্দ রায়ের চাকরি বদলি হওয়ায় পশ্চিম বর্ধমানের কুলটিতে চলে আসা। সেখান থেকেই ইংরেজিতে স্নাতক করার পর নয়া দিল্লিতে মাস কমিউনিকেশন নিয়ে পড়তে যান অনুপর্ণা। পরে তথ্য প্রযুক্তি সংস্থাতে চাকরিও করেন। ২০২২ সালে চাকরি সূত্রে মুম্বইয়ে পাড়ি দেওয়া।

ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অনুপর্ণা রায়

কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বপ্ন পূরণ করতে চাকরি ছেড়ে দেন। সেদিন অনুপর্ণার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, পরিচালক-সম্পাদক পরেশ কামাদার, পরিচালক অনির্বাণ মাইতি এবং নীরজ সাহায়। অনুপর্ণার মা মনীষা রায় সংবাদমাধ্যমকে জানান, “সত্যজিৎ রায় মেয়ের অন্যতম আইকন।” বাবা যখন মেয়ের জন্য পাত্রের খোঁজ করছিলেন, তখন অনুরাগ কাশ্যপের ‘গ্যাংস অফ ওয়াসেপুর’ সিনেমাটি দেখে ছবি বানানোর স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। পরে সেই অনুরাগ কাশ্যপই তাঁর Songs of Forgotten Trees উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

আগামীতে অনুপর্ণা পুরুলিয়া-সহ ভারতের মহিলাদের অবস্থা নিয়ে কাজ করতে চান। ২০২৫-এও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেভাবে নিয়মিত নারীদের হাজার লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়, বঞ্চিত হতে হয় নিজের অধিকার থেকে, স্বাধীন জীবন যাপন থেকে, অনুপর্ণারা তাঁদের কাছে হুমকির হবে এটা স্বাভাবিক। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যতই নারীদের ডানা কাটতে উদ্যত হবে, অনুপর্ণার মত চরিত্ররা সামনের সারিতে উঠে এসে বলবেন, নারীরাও মানুষ, পুরুষের মতোই।

লিখেছেন
Sangita Ghorai
Sangita Ghorai
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।