এই বিভক্ত দেশের ধমনীর আসল ছন্দ বুঝতেন জাকির হুসেন

Zakir Hussain Death: নিজেকে আজীবন 'ছাত্র' বলতেই ভালোবাসতেন শিল্পী। বলতেন, "সঙ্গীত এক অসীম সমুদ্র, আমি তো কেবল এক নম্র নাবিক।”

Madhurima Dutta
৩ মিনিট
এই বিভক্ত দেশের ধমনীর আসল ছন্দ বুঝতেন জাকির হুসেন

একটি নিশ্চিত মৃত্যুর আগে, বহু অনিশ্চিত মৃত্যু ভিড় করে আসে। সেসব গুজব, ভুয়ো সংবাদ, সত্যের অপলাপের জমায়েত কাটিয়ে শেষতম সত্য আসে, মৃত্যুর মতোই শীতল। শীতের ছন্দ কাটে। আকাশকে আরও খানিক নিঃসঙ্গ করে একটি উজ্জ্বল তারাখসা দেখে বিশ্ব। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম সেরা কিংবদন্তী ওস্তাদ জাকির হুসেন চলে যান হঠাৎ করে। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকোতে অল্প কিছুদিনের অসুস্থতার পরেই পৃথিবীর সমস্ত তবলাদের নিঃসঙ্গ করে চলে গেলেন জাকির। আসলে নেহাতই পণ্ডিত, ওস্তাদ, কিংবদন্তী, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকপাল— এসব বিশেষণে জাকির হুসেনকে ধরা যায় না। তাঁকে ধরে রাখার মতো আকাশ পরিময়ই নয়। শান্তি এবং মানবতার লক্ষ্যে তবলা যেখানে নেহাত বাদ্যযন্ত্র হয়েই থাকে না, হয়ে ওঠে ভালোবাসার পয়গাম, সেই পথের স্রষ্টা জাকির হুসেন।

সেই স্রষ্টা চলে গেলেন। বয়স ৭৩। জাকির হুসেন রেখে গেলেন তাঁর স্ত্রী আন্তোনিয়া মিনেকোলা এবং তাঁদের কন্যা - আনিসা কুরেশি এবং ইসাবেলা কুরেশিকে। ইডিওপ্যাথিক পালমোনারি ফাইব্রোসিস থেকে তৈরি হওয়া নানা জটিলতার ধকল সামলাতে পারেনি দেহ। দেহ চলে গিয়েছে, রয়ে গিয়েছে এক শক্তি। যে শক্তিতে বাঁধা পড়ে থাকবেন সেই সমস্ত মানুষ, যারা হতো রাগসঙ্গীতের মাহাত্ম্য বোঝেনও না। যারা হয়তো, গানের সঙ্গতে তবলা ছাড়া বিশেষ কোনওদিন শোনেনওনি এই যন্ত্র। তারা জানবেন, এই ইদানীং বিভক্ত ভারতে একজন জাকির হুসেন ছিলেন, যিনি ভারতের ধমনীর ছন্দ বুঝতেন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সুখে দুঃখে ছিলেন টলিপাড়ার ‘আপনজন', শমিত ভঞ্জকে মনে রাখেনি বাঙালি

Shamit Bhanja : তপন সিনহার হাত ধরে হয়ে শমিত ভঞ্জ উঠলেন টলিপাড়ার ‘আপনজন’

ছয় দশকের কর্মজীবনে, হুসেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ইংরেজ গিটারিস্ট জন ম্যাকলাফলিন, বেহালাবাদক এল শঙ্কর এবং পারকাশনবাদক টিএইচ 'ভিক্কু' বিনয়ক্রমের সঙ্গে তাঁর ১৯৭৩ সালের কাজটিই ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং জ্যাজকে নিয়ে এসেছিল এক পংক্তিতে। এমন অভাবনীয় ফিউশন এর আগে পৃথিবী দেখেছে হাতেগোনাই।

১৯৫১ সালের ৯ মার্চ জন্ম জাকির হুসেনের। পিতা আরেক কিংবদন্তি তবলা ওস্তাদ আল্লা রাখা। সাত বছর বয়স থেকে তবলায় হাতেখড়ি। দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মজীবনে পণ্ডিত রবি শঙ্কর, আলি আকবর খান এবং শিবকুমার শর্মা সহ ভারতের প্রায় সমস্ত কিংবদন্তীদের সঙ্গেই কাজ করেছিলেন জাকির হুসেন। ইয়ো-ইয়ো মা, চার্লস লয়েড, বেলা ফ্লেক, এডগার মেয়ার, মিকি হার্ট এবং জর্জ হ্যারিসনের মতো পশ্চিমি সঙ্গীতজ্ঞদের সঙ্গে জাকির হুসেনের যুগান্তকারী কাজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে নিয়ে যায় আরও। ক্রমেই বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক দূত হয়ে ওঠেন জাকির হুসেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনে চারখানা গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেছিলেন তিনি। এই বছরের গোড়াতেই ৬৬তম পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনটি গ্র্যামি জেতেন তিনি। ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রী, ২০০২ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০২৩ সালে পদ্মবিভূষণ পেয়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, ন্যাশনাল হেরিটেজ ফেলোশিপ তো আছেই।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে, জাকির হুসেন তবলার ভূমিকাকেই বদলে দিয়েছিলেন। আমজনতার কাছে গানের সঙ্গতে হারমোনিয়াম আর তবলার জুটির বিকল্প নেই। গান থাকলে তবেই তবলা। জাকির হুসেনের তবলা এক নিজস্ব চরিত্র। আঙুলের তালে যে পৃথিবী দুলে উঠতে পারে, গভীরতর আবেগকে যে উথলে দিতে পারে তবলা, প্রমাণ করেছিলেন জাকির হুসেনই। অথচ নিজেকে আজীবন 'ছাত্র' বলতেই ভালোবাসতেন শিল্পী। বলতেন, "সঙ্গীত এক অসীম সমুদ্র, আমি তো কেবল এক নম্র নাবিক।” রাগসঙ্গীত 'না-বোঝা' মানুষের দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে রাখেনি শিল্পীকে। ওস্তাদকে দূর থেকে শুনে কত উথালপাথাল স্তব্ধ হয়ে গেছে কতজনের!

সান ফ্রান্সিসকোর আলি আকবর কলেজ অফ মিউজিক-এ পড়িয়েছেন জাকির হুসেন। বিশ্বব্যাপী কর্মশালা করে নিজের কাজ, নিজের সমুদ্রসমান জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। জাকির হুসেন নেই, তবু তাঁর ছন্দ বেঁচে আছে। ছন্দের সৌন্দর্যকে, ঐতিহ্যের শক্তি এবং সঙ্গীতের সীমাহীন সম্ভাবনাকে জীবন দিয়ে উদযাপন করে গেলেন জাকির হুসেন। শিল্প কোনও সীমানা জানে না। এই ঘৃণাকাতর ভারতবর্ষে এমন দামাল ছন্দই তো বেঁধে রেখেছিল, বেঁধে রাখবেও নিবিড়ে। সেই অজস্র হিংসা, দ্বেষের মধ্যে জেগে উঠে একদিন এক আলোর শিশু হাততালি দেবেই। হয়তো সেদিন, শেষমেশ তবলা বাজানো ছেড়ে পায়রা পুষতেও পারেন জাকির হুসেন। হয়তো, একদিন...

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।