ঋণে ডুবে থাকা টাটা গোষ্ঠীকে বাঁচিয়েছিল এটি! ভারতের অজানা ইতিহাসের শরিক জুবিলি ডায়মন্ড

History of Jubilee Diamond Tata : কিন্তু জানলে অবাক হবেন, ভারতের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বিশেষ হিরেটি।

Aritra Som
৪ মিনিট
ঋণে ডুবে থাকা টাটা গোষ্ঠীকে বাঁচিয়েছিল এটি! ভারতের অজানা ইতিহাসের শরিক জুবিলি ডায়মন্ড

বলিউড হোক বা হলিউড, হিরে চুরির বিভিন্ন কাহিনি উঠে এসেছে সিনেমার পর্দায়। শুধু চুরিই বা কেন, পৃথিবীর ইতিহাসের নানা অধ্যায় ঘুরলেই উঠে আসবে বিভিন্ন সব হিরের কাহিনি। একেকটার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে রহস্য, কোনওটা আবার ওই দেশের ইতিহাসের অংশীদার। যেমন ভারতের কথাই ধরুন। প্রাচীন সময় ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল, এই দেশের রাস্তায় রাস্তায় নাকি এমন অজস্র হিরে, জহরত, সোনাদানা ছড়ানো থাকে। সেই মণিমুক্তোখচিত কাহিনি এখন অতীত। অবশ্য ভারতের হিরের কথা বললেই সবার আগে নাম চলে আসে কোহিনূরের কথা। তার ঔজ্জ্বল্য, কে তার মালিক, এই নিয়ে চায়ের আড্ডা গরম হয়েছে নানা সময়। যাই হোক না কেন, এই দেশের ধনদৌলতের কথা কোহিনূরে এসেই শেষ হবে, এমনটাই দস্তুর।

তবে আজ যে হিরের কথা বলব, সে কোহিনূরের থেকে একেবারে আলাদা। হিসেব করে দেখলে, তার থেকেও বেশি মূল্যবান! বলা হয়, এটি নাকি বিশ্বের বৃহৎ হিরেগুলির তালিকায় এটি ছয় নম্বরে। হ্যাঁ, কথা হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত জুবিলি ডায়মন্ডকে নিয়ে। ২৪৫.৩৫ ক্যারেটের এই হিরের দিকে তাকালেই চোখে ধাঁধাঁ লেগে যাবে। যেখানে কোহিনূর মাত্র ১০৫.৬ ক্যারেটের। কিন্তু ইতিহাস তাকে বিখ্যাত করেছে। অজানাই থেকে গিয়েছে জুবিলি ডায়মন্ডের কাহিনি। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, ভারতের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই বিশেষ হিরেটি। আজকের ভারতের এমন রূপের পেছনে এর অবদান অস্বীকার করতে পারেন না কোনও ঐতিহাসিকই। কেন? সেই গল্পের সঙ্গে মিশে আছে ভারতের শিল্প বিপ্লব, এবং ঐতিহ্যশালী টাটা গোষ্ঠী।

যাত্রার শুরুটা

উনবিংশ শতকের আগে অবধি গোটা বিশ্বের কাছে ভারত আর ব্রাজিল ছিল হিরের যোগানদার। এই দুটি দেশের খনি থেকেই উঠে আসত একের পর এক মূল্যবান রত্নখণ্ড। সমস্ত ছবিটা বদলে গেল ১৮৬০-র দশকে, যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় হিরের খনি আবিষ্কৃত হল। তারপর থেকে রত্ন আর হিরের ইতিহাসে এক আলাদা উচ্চতায় চলে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা। সেখানকারই জাগেরসফন্টেনের খনি থেকে ১৮৯৫ সালে পাওয়া গিয়েছিল এই জুবিলি ডায়মন্ড। যার চমক আর আকার তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। পালিশ করার আগে এটি ছিল প্রায় ৬৫০ ক্যারেটের। প্রথমে অবশ্য এর নাম ‘জুবিলি’ ছিল না। জাগেরসফন্টেন খনি অঞ্চলের অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটের প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিস উইলিয়াম রেইটসের সম্মানে এর নাম দেওয়া হয় ‘রেইটস ডায়মন্ড’।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোনও পুরুষই সামলাতে পারেননি কোহিনূর! কোন মন্ত্রে 'অভিশপ্ত' হিরের নতুন মালিক হচ্ছেন ক্যামিলা!

ইংরেজরা কোহিনূরকে কাচের টুকরো মনে করে। তাই পরের বছর রানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী রাজা প্রিন্স অ্যালবার্ট কোহিনূর কাটিং এবং পালিশ করান। এর ফলে ১৮৬ ক্যারেটের কোহিনূরের ওজন কমে হয় ১০৫.৬ ক্যারাট

এরইমধ্যে চলে এল ১৮৯৭ সাল। ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের ৬০ বছর অর্থাৎ প্ল্যাটিনাম জুবিলির উদযাপন শুরু হল। ঠিক হল, এই রেইটস ডায়মন্ডটি রানিকে উপহার দেওয়া হবে। সেইমতো করা হল নতুন নামকরণ – ‘জুবিলি ডায়মন্ড’। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেই হিরে রানির কাছে পৌঁছল না। সেই জায়গায় তৎকালীন পর্তুগালের রাজা প্রথম কার্লোস তাঁর স্ত্রীর জন্য এই হিরে কিনে নিলেন। অবশ্য নামটি একটি থেকে গেল, জুবিলি ডায়মন্ড।

রাজার ঘর থেকে টাটার প্রাসাদে

সাল ১৯০০। নতুন একটা শতাব্দী, নতুন কিছু স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের হাত ধরেই শুরু হল পথচলা। ওই বছরই প্যারিসে আয়োজিত হল বিরাট প্রদর্শনী। আর সেখানেই জায়গা পেল জুবিলি ডায়মন্ড। তার রূপের আলোয় রীতিমতো বিমোহিত হয়ে যান সবাই। গোটা বিশ্ব থেকে নামী মানুষেরা এই প্রদর্শনীতে এসেছিলেন। সেখানে হাজির ছিলেন আরও একজন, স্যার দোরাবজি টাটা। ভারতের টাটা গোষ্ঠীর জয়যাত্রা তখন একটু একটু করে শুরু হয়েছে। সেই সময়ই প্যারিসের সেই প্রদর্শনী থেকে জুবিলি ডায়মন্ডটি কিনে নেন দোরাবজি টাটা। উপহার দিলেন নিজের জীবনসঙ্গিনী, প্রিয় মানুষটিকে। তিনি লেডি মেহেরবাই টাটা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোহিনুরের দ্বিগুণ বড় হিরে ছিল তাঁর দখলে! আম্বানি-আদানির বৈভব ম্লান করে দেবে এই ইতিহাস

তিনি যে শুধু অর্থবান বলেই পরিচিত ছিলেন, তা কিন্তু নয়। বহু জনকল্যাণমূলক কাজেও তিনি ছিলেন সর্বাগ্রে। তাঁর শাসনকালেই হায়দরাবাদে বিদ্যুৎ-ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হয়।

অদ্ভুতভাবে, এরপরই একটু একটু করে নিজেদের সাম্রাজ্য আরও বড় করতে শুরু করল টাটা। ভারতে তখন কেবল তাদেরই স্বপ্ন, দেশ একটু একটু করে বিশ্বের মানচিত্রে জায়গা নিচ্ছে। ১৯০৩ সালে মুম্বইতে খুলে গেল দ্য তাজমহল হোটেল, ঠিক চারবছর পর ১৯০৭ সালে তৈরি হল টাটা স্টিল বা টিসকো (TISCO)। ১৯১০ সালে তৈরি হল টাটা পাওয়ার। একটু একটু করে দেশের শিল্পের মানচিত্রটা মজবুত হচ্ছিল তাদের হাত ধরে। আর যার শরিক ছিলেন স্যার দোরাবজি ও লেডি মেহেরবাই টাটা।

একটু একটু করে এই দম্পতির নাম গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। ছড়িয়ে পড়ল টাটা গোষ্ঠীর চমৎকারের বর্ণনা। পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন, দুজনে সংগ্রহ করেছেন বহু মূল্যবান জিনিস। সেখানে ছিল ঐতিহ্যশালী অনেক সামগ্রীও। সঙ্গে ছিল জুবিলি ডায়মন্ড। যা আগলে রাখতেন লেডি মেহেরবাই। তিনি নিজেও সেই সময় নারীদের নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছিলেন। বোম্বে প্রেসিডেন্সি উওমেন কাউন্সিল এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর উওমেনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মেহেরবাই টাটাকে সম্মানিত করেছিলেন খোদ ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ।

টাটাদের হঠাৎ পতন ও ত্রাতা জুবিলি ডায়মন্ড

কিন্তু সময় সবার একরকম যায় না। মেঘের আড়ালে যেমন সূর্য হাসে, তেমনই ঝলমলে দিনেও চলে আসতে পারে নিকষ কালো মেঘ। ঠিক সেই জিনিসটাই হল দোরাবজি টাটার সঙ্গে। ১৯২৪ সাল। সেই সময় থেকে গোটা ভারতে জনপ্রিয় হতে শুরু করল জাপান থেকে আসা লোহা। গোটা বাজার ছেয়ে গেল এতে। তুলনায় সস্তা এই জাপানি লোহাই কিনতে শুরু করলেন সবাই। মাঝসমুদ্রে ডুবতে শুরু করল টাটা সাম্রাজ্য। টাটা স্টিলের অবস্থা তখন তথৈবচ। কী করবেন, কীভাবে সংস্থাকে বাঁচাবেন, এটাই রাতদিন ভাবতে লাগলেন স্যার দোরাবজি টাটা। মাথার ওপর প্রায় দুই কোটি টাকার দেনা! আজকের দিনে যার পরিমাণ চিন্তারও বাইরে। অবস্থা এমন হল যে, টাটা স্টিল কোম্পানিটি বন্ধ করে দেওয়ার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।

সেই সময়ই এগিয়ে এলেন লেডি মেহেরবাই টাটা। হাতে ধরা মহা মূল্যবান জুবিলি ডায়মন্ড। খুব প্রিয় ছিল এটি। কিন্তু এখন সাম্রাজ্য বাঁচুক, দেশ বাঁচুক। ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় (এখন এসবিআই) এই জুবিলি হিরে সহ আরও বেশকিছু মূল্যবান গয়না বন্ধক রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। হাতে এল বিরাট অঙ্কের টাকা। একটু একটু করে ফের ঘুরে দাঁড়াল টাটা গোষ্ঠী। আজকের এই বিশাল সাম্রাজ্য দেখলে মনে হবে সেই দুঃসহ দিনের কথা!

১৯৩০-এর দশকে পরপর মারা যান লেডি মেহেরবাই টাটা ও স্যার দোরাবজি টাটা। দুজনেই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারপর এই জুবিলি ডায়মন্ড বিক্রি করে দেওয়া হয়। যে টাকা আসে, তা দিয়ে তৈরি করা হয় আরও একটি প্রতিষ্ঠান। আজ গোটা ভারত যাকে চেনে ‘টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতাল’ হিসেবে। আপাতত মৌয়াওয়াড কালেকশনের অধীনে রয়েছে জুবিলি ডায়মন্ড। কিন্তু তার ইতিহাস এখনও লেগে আছে প্রতিটা খাঁজে, ঠিকরে বেরনো প্রতিটা আলোয়।

লিখেছেন
Aritra Som
Aritra Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।