মৃত্যুর পরে ফিরে আসা, বর্ধমানের রাজার গল্পের সঙ্গে হুবহু মিল আছে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর

Rupa Mitra
৪ মিনিট
মৃত্যুর পরে ফিরে আসা, বর্ধমানের রাজার গল্পের সঙ্গে হুবহু মিল আছে ভাওয়াল সন্ন্যাসীর

বর্ধমানের রাজপরিবারের তিনশো বছরের রাজত্বকালের ইতিহাসের সঙ্গে অনেক উত্থান-পতন, বংশমর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টা, রাজ্যশাসন, দান-ধ্যান-মহিমা এবং সেইসঙ্গে হিংসা, ষড়যন্ত্র, পরকীয়া– নানারকম কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। তিনশো বছর ধরে প্রায় কুড়ি জন রাজা বা জমিদার সতেরো-আঠারো পুরুষ ধরে রাজত্ব করে গিয়েছেন।

বর্ধমানের রাজপরিবারের যতজন রাজা রাজত্ব করে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য চরিত্র অবশ্যই মহারাজা তেজচাঁদ। তাঁর চরিত্রে একাধারে ভাল-মন্দ দু’টি দিকই বিদ্যমান ছিল। খামখেয়ালি, উচ্ছৃঙ্খল, বিলাসী, যৌবন মদমত্ত রাজা বলা যায় তাঁকে– আবার অন্যদিকে তিনি ছিলেন প্রজাবৎসলও বটে। তাঁর সম্পর্কে অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। অনেকের মতে, তিনি সাপে কামড়ানোর ওষুধ জানতেন। কিন্তু শ্রীপ্রণয়চাঁদের মতে, পারিবারিক ইতিহাসে নাকি এর সপক্ষে কোনও প্রমাণ নেই। যাই হোক, বিষয়টি তর্কসাপেক্ষ।

মহারাজা তেজচাঁদের ৮ জন মহিষী ছিলেন। রাজপরিবারে তাঁদের কী ভূমিকা ছিল– স্বাভাবিকভাবে মনে হতেই পারে। জানা যায়, তেজচাঁদের সঙ্গে তাঁর প্রথমা, দ্বিতীয়া এবং তৃতীয়া পত্নীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল একই দিনে। এখানেই শেষ নয়, জানা যায়, চতুর্থ বিবাহ সম্পন্ন হয় প্রথম তিনটি বিবাহের এক সপ্তাহের মধ্যেই। এই বিবাহের প্রেক্ষাপটও অত্যন্ত চমকপ্রদ। বর্ধমানের রাজপরিবারে এই ঘটনা অস্বাভাবিক, কারণ রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী বিবাহ হত পাত্র ও পাত্রীর করকুষ্ঠির মিল দেখে। মহারাজা তেজচাঁদের এই তিন রানির সঙ্গে বিবাহকার্য সম্পন্ন হওয়ার আগে আরও এক জায়গায় করকুষ্ঠির গণনাকার্য চলার সময়েই এই তিন বিবাহ একসঙ্গে সমাধা হয়।ওদিকে করকুষ্ঠিতে যোটক মিল হওয়ার ফলে পাত্রীর পিতা বর্ধমান রওনা হয়ে যান। এরপর তিনি রাজবাড়িতে এসে জানতে পারেন, আগের দিন তিনজন কন্যার সঙ্গে রাজার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। রাগে-দুঃখে অপমানিত বোধ হওয়া পাত্রীর পিতা আদালতে মহারাজের নামে মামলা করেন। সুতরাং, বাধ্য হয়েই এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি চতুর্থ বিবাহ সম্পন্ন করেন।

এরপর পঞ্চম পত্নী হিসেবে পাণিগ্রহণ করেন পরাণচাঁদ কাপুরের ভগিনী কমলকুমারীকে। কমলকুমারী ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। শোনা যায়, তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়েই মহারাজা এই বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য,পাঁচ-পাঁচটি রানির কোনও সন্তানাদি হল না। বংশ লোপ পাওয়ার ভয়ে মহারাজা ষষ্ঠ বার বিবাহ করলেন নানকী দেবীকে। একমাত্র এই নানকী দেবীই মহারাজাকে বংশরক্ষার জন্য একটি পুত্রসন্তানের মুখ দেখালেন। ১৭৯১সালের ২৪ অক্টোবর নানকী দেবীর গর্ভে জন্মাল প্রতাপচাঁদ।

এই প্রতাপচাঁদকে ঘিরেই বর্ধমানের রাজপরিবারে ঘটেছিল ঐতিহাসিক মামলা-মোকদ্দমা। গৌতম ভদ্রর ‘জাল রাজার কথা: বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ’ বইতে এর উল্লেখ পাওয়া যাবে। কমলকুমারী এবং তাঁর দাদা পরাণচাঁদ কাপুরের প্রবল লোভ ছিল মহারাজের সম্পত্তির ওপর। খুব অল্প বয়সে প্রতাপচাঁদ মাতৃহারা হন;নানকী দেবী গত হওয়ার পর মহারাজার একমাত্র উত্তরাধিকারী প্রতাপচাঁদ অল্প বয়সেই (১৮১৩ সালে) রাজ্পাট দেখাশোনা শুরু করলেন। কারণ তেজচাঁদ তখন বৃদ্ধ হয়েছেন। এদিকে সম্পত্তি দেখাশোনার ভার নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পর থেকেই প্রতাপচাঁদের সঙ্গে ক্রমশ কমলকুমারী দেবী এবং পরাণচাঁদের বিরোধিতা জমে উঠতে থাকে।প্রতাপচাঁদ খুব ছোট বয়স থেকেই সাধুসন্ন্যাসীদের সঙ্গ পছন্দ করতেন। রাজত্ব চালানো তাঁর ভাল লাগত না। জমা-খরচের হিসাবে তার মন বসত না। একবার বাড়ি থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যান।তবুও প্রায় আট বছর তিনি জমিদারির দেখাশোনা করেন। তিনি বারবার বলতেন, তাঁকে কোনও এক সন্ন্যাসী নিদান দিয়েছেন যে, ১৪-বছর অজ্ঞাতবাসে থাকতে হবে। যাই হোক, এইভাবেই আট বছর চলার পর হঠাৎ একদিন (সালটা ছিল ১৮২১) তিনি তাঁর তৈরি হামামে (স্নানঘর) স্নানে ঢুকলেন। কিন্তু অনেক সময় পার হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি হামাম থেকে বের হলেন না। যখন বেরলেন, তখন তাঁর চোখ রক্তবর্ণ, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ায় মহারাজা প্রতাপচাঁদ কালনায় গঙ্গাতীরে হাওয়া বদলের জন্য এলেন। সঙ্গে প্রতাপের দুই স্ত্রী আনন্দকুমারী ও প্যারীকুমারী। হঠাৎ একদিন রাত্রে প্রতাপচাঁদ সেই অজানা জ্বরে মারা গেলেন। সেদিন ছিল ঝড়জলের রাত। তুমুল ঝড়বৃষ্টিতে শ্মশানযাত্রীরা মৃতদেহ ফেলে চলে যায় এবং ঝড়বৃষ্টি কমলে এসে দেখে মৃতদেহ নেই। লোকমুখে প্রচারিত হয় যে, প্রতাপচাঁদ সাঁতার কেটে নৌকায় উঠে পালিয়ে গিয়েছেন।

শুধু বৃদ্ধ মহারাজা তেজচাঁদ বললেন, প্রতাপচাঁদ ফিরে আসবে, সে বেঁচে আছে।

এর মধ্যে ১৮৩২ সালে মহারাজা তেজচাঁদ দেহ রাখলেন। এরপর ঠিক ১৪ বছর বাদে, ১৮৩৫ সালে, একজন সন্ন্যাসীকে দেখা গেল বর্ধমানের গোলাপবাগের গাছতলায়। একমুখ দাড়ি, পরনে গেরুয়া বসন। তাঁকে ঘিরে ভিড় জমতে থাকল। সকলেই বলতে লাগল, ইনি 'ছোটকুমার'।

ক্রমে ক্রমে সেই কথা রাজবাড়িতে পৌঁছে গেল। এরপর আর এক ইতিহাস। এ যেন ঠিক ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কাহিনি। হুবহু একইরকম ঘটনা।

যাই হোক সন্ন্যাসী নিজেও দাবি করেন, তিনি ছোটকুমার। অনেক প্রমাণও দেন। কিন্তু কমলকুমারী এবং পরানচাঁদ কাপুর আদালতের দ্বারস্থ হলেন এবং তার ফলে সন্ন্যাসী গ্রেফতার হলেন। একসময় বঙ্গরাজনীতি তাঁকে নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল। তাঁর নামে ফৌজদারি মামলা হয়েছিল। সেইসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঠাকুরদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এই সন্ন্যাসীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। এই মামলা চলেছিল দীর্ঘদিন।

প্রতাপচাঁদ মারা যান ১৮২১ সালে এবং তাঁর স্মৃতি-রক্ষার্থে ১৮৪৯ সালে প্রতাপেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। 'জাল' সন্ন্যাসী মামলা যদিও বিতর্কিত বিষয়, তবু মনে প্রশ্ন জাগে, প্রতাপচাঁদ মারা যাওয়ার প্রায় ২৮ বছর বাদে এই স্মৃতি মন্দির বানানো হল কেন? তিনি মৃত– এটা জনমানসে সুদৃঢ় করার জন্য? ওই সন্ন্যাসী আসলে কে? শেষ পর্যন্ত তাঁর কী হল? এইসব প্রশ্ন রহস্যে ঘেরা।

যাই হোক, প্রতাপেশ্বর মন্দিরটি অদ্ভুত সুন্দর। টেরাকোটার কারুকার্যমণ্ডিত। মন্দিরের অন্দরে প্রতাপেশ্বর শিবলিঙ্গটি অসাধারণ। মন্দিরের সামনে একটি কামান রাখা আছে। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এই মন্দির।

[তথ্যসূত্র: হিমাংশু দত্ত ও সৌমেন জানা]

লিখেছেন
Rupa Mitra
Rupa Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।