রাস্তা কারুর বাবার নয়

Arka Chatterjee
৩ মিনিট
রাস্তা কারুর বাবার নয়

এক ক্লাস ভর্তি ছেলেপিলে, দুপুর ১:৪০, সবে মাত্র টিফিন টা শেষ হয়েছে। সদ্য আজ এসএসসি দিয়ে ( অনেক দিন আগের ঘটনা,এসএসসি শুনে ঘাবড়ে যাবেন না ) নতুন বাংলার স্যার ইতিহাসের ক্লাস নিতে এসেছেন,হাতে বীর বিক্রমে ধরা অ্যাটেনডেন্স বুক,চক ও বেত। বেত বোধহয় উনি নিতে চাননি ওনাকে জোর করে ধরিয়ে দেওয়া হয়ছে ( পুরোনো স্যার-রা তো অবগত টিফিন পরবর্তী অসুস্থতায়)।কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি SSC পরীক্ষা গুলো তখন হতো,এখনকার মত নয়। যাই হোক তিনি আবার ইতিহাস পড়াবেন আজ; কারণ বয়স্ক বিশুবাবু আজ আসেননি।

দেয়ালে রং করা ব্ল্যাক বোর্ড, ডানদিকের ওপরে ক্লাস মনিটর বড় বড় করে তারিখ লিখে দিয়েছে,আর আছে কিছু নাম যেগুলো দস্যিপনা করেছে ।

স্যার আরম্ভ করলেন -"G.T.Road কে বানিয়েছিল জানো?"

উত্তর এলো, "শের শাহ সুরি "

এই পর্যন্ত বাঙালি বেশ পরিচিত,আমি তো আরো বেশি কারণ আমার মামার বাড়ি যেতে হলে গঙ্গা টপকে, G. T.Road কে ডান দিক থেকে আর বাম দিক থেকে দেখে ওটাকেও টপকে যেতে হয়।

দাদুর হাত ধরে রাস্তা পেরোতে পেরোতে অনেক আগেই সেই গল্প শুনেছি , কিন্তু.....

ওই সেই কিন্তু......

কিছু অতিরিক্ত ইতিহাসের পুনরুদ্ধার, কিছু অজানা কথা আমরা জানতে পারিনা, সময়ের অভাবে বা জানার সদিচ্ছার স্বল্পতায়।

বলাহয় মানে সবাই জানে যে 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড ' বানিয়ে ছিলেন "শের শাহ সুরি "।কিন্তু এর ইতিহাসটা-র মানে বেশ খানিক টা পুরোনো, যেমন ধরা যাক " চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য ".....না না.... তারও আগে,

হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় যে যে ধরনের মোহর বা বিনিময় প্রথায় যে যে জিনিস ব্যাবহৃত হতো সেই গুলো গোটা রাস্তা মানে বর্তমান 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড'- এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় সেই সব জিনিসের অস্তিত্ব মেলে।

ভারতবর্ষের বিখ্যাত মহাকাব্য-তেও এমন একটি রাস্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় যেটার সাথে বর্তমান 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড'- এর অনেক মিল আছে।

পুরাতন ভারত , বাংলাদেশ, চীন, আফগানিস্থান ও মধ্যপ্রাচ্য-এর মধ্যে যোগাযোগ ছিল। কুশল বিনিময়, বস্তু আদান প্রদান ও শিল্প আদানপ্রদানের খুব গুরুত্ব পূর্ণ অংশ।

বিভিন্ন সময় কাল এর তত্ত্ব অনুযায়ী এই রাস্তার অবস্থান লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে ভারত এর তক্ষশীলা, পাটুলিপুত্র, হস্তিনাপুর হয়ে বর্তমান পাকিস্থানের মধ্য দিয়ে মধ্য প্রাচ্য পর্যন্ত অবস্থান করে। এর পুরোটাই ছিল কাঁচা পায়ে হাঁটা পথ, মূলত ঘোড়া আমদানি, রেশম আমদানির জন্য ব্যাবহার হতো এই পথ। প্রায় ৩৫০০ বছর আগে, পরবর্তী কালে এই রাস্তার মাহাত্ম্য দেখে মৌর্য বংশের রাজা প্রতাপশালী "চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য,প্রথম এই রাস্তার প্রায় ২০০০ কিলোমিটার পাথর সহকারে পাকা করেন।সেই সময় এই রাস্তার নাম ছিল, "উত্তরাপথ "

ভাবুন.... একবার ভাবুন আপনারা যে রাস্তায়, ৩ নম্বর বাস এ চেপে অফিস যান সেই রাস্তা প্রায় ৩০০০ বছরের পুরোনো।

যাইহোক এর পর পরবর্তী কালের বিখ্যাত সম্রাট এই রাস্তার উন্নতি তে যোগদান করেন, কারণ তিনি বুঝতেন যোগাযোগই একটি সাম্রাজ্যের উন্নতির একমাত্র পথ হতে পারে।

তিনি রাস্তার দুই ধারে গাছ বসানো আরম্ভ করেন ও বেশ কিছু দূর অন্তর অন্তর পানীয় জলের অভাব দূর করতে কুয়ো বা ইঁদারা স্থাপন করেন; পান্থনিবাস বা সরাইখানাও তৈরি করেন।ইসস্ তখন যদি গুগল ম্যাপ টা থাকতো, স্যাটেলাইট ভিউ তে গিয়ে দেখা যেত কোথায় কি মেনু (ক্ষমা করবেন দুটো লকডাউন,মোবাইল ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে জাস্ট ভুলিয়ে দিয়েছে, আমি তো কফি কোথায় খাবো সেটাও প্ল্যান করে নিয়েছিলাম )

-"বড্ডো ফাজলামি হচ্ছে তোদের পিটুনি না দিলে আমার শান্তি হবে না রে।এই..লাস্ট বেঞ্চের ৩ নম্বর উঠে দাঁড়া,উঠে দাঁড়া বলছি ...

বল কোন রাজার মূর্তিতে মুখের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না?"

-"বল বল?"

-"বুঝেছি হাতটা পাত" ( এই ব্যাপার টা বর্তমানে ঘটলে শিশু নির্যাতনের দায়ে পরের দিন জেল অবধারিত)

_"স্যার সম্রাট ' অশোক ' ।"

-"একদম ঠিক,সম্রাট অশোক। এতগুলো কাজ করেন তিনি, এই 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড' বা তৎকালীন " উত্তরাপথ "এর উন্নতির জন্য।"

এরপর থেকে যারা যারা ভারতে এসেছে এই রাস্তার গুরুত্ব বুঝে তাকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আপডেট ও আপগ্রেড করেছেন। তার মধ্যে 'শের শাহ সুরি' ও আছেন।

কিন্তু এত যে পড়ানো হলো সমস্যা কি বলতো,এইগুলো যদি কেউ পরীক্ষার খাতায় লিখে আসে সে পাবে গোল্লা।যদি কেউ বই এর লেখা কপি পেস্ট করে আসে, মানে 'শের শাহ সুরি' লিখে আসে,তাহলে সে পুরো নম্বর পাবে। তাই যা জেনেছো সেটা ভুলে যাও,আর শেষের উত্তর টা লিখে এসো দয়া করে।

শুধু এই বাংলার স্যার নন এইরম হাজার হাজার ইতিহাস-প্রেমী মানুষজন তাদের অনেক অনেক তথ্য, পড়াশোনা, রিসার্চ আমাদের গল্পের মতো বলে গেছেন আর আমরা শুনে গেছি, কোনোদিন লিখতে পারিনি,কারন নম্বর পাবোনা এই ভয়ে।

তাই ৩০০০ বছরের থেকেও বেশি সময় ধরে হেঁটে চলা পথ গুলো এভাবেই, মনে রাখে সময়ের সদুত্তর।কোনদিন প্রশ্ন করতে শিখতে হবে, জানতে হবে, উত্তর খুঁজতে।

তথ্য : https://en.wikipedia.org/wiki/Grand_Trunk_Road

https://en.wikipedia.org/wiki/Sher_Shah_Suri

https://www.dangerousroads.org/asia/india/119-grand-trunk-road-india.html#:~:text=The%20journey%20is%20an%20unforgettable,Bengal%20and%20Chittagong%20in%20Bangladesh.&text=Beyond%20this%20mountain%20pass%2C%20the,crosses%20into%20India%20at%20Wahgha.

লিখেছেন
Arka Chatterjee
Arka Chatterjee
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।