ধনে পাতার স্বাদ অপছন্দ? মানুষের জিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?

শিশুকাল থেকেই যদি কোনও গন্ধ বা স্বাদের সঙ্গে মানুষের পরিচিতি ঘটে, তবে অনেক সময় মস্তিষ্ক সে-গন্ধকে ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করতে শিখে নেয়। একে বলে ‘ফ্লেভার কন্ডিশনিং’। 

inscript
৩ মিনিট
ধনে পাতার স্বাদ অপছন্দ? মানুষের জিনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?

রান্নাঘরের এক পরিচিত দৃশ্য, যিনি রান্না করছেন তিনি গরম গরম মাংসের ঝোল রান্নার পর, তার ওপরে কিছু ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলেন। আর, বেশ মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই, পাশে দাঁড়িয়ে একজন বলে ভ্রু কুঁচকে উঠল, ‘ইস! ধনেপাতা?’ শুরু হল পারিবারিক খাদ্য-বিতর্ক! এ-কথা ঠিক যে অনেকেই ধনে পাতা পছন্দ করেন না, তার স্বাদ বা গন্ধের কারণে। ধনেপাতা পছন্দ না করার এই বিষয়টা শুধুই রুচির ব্যাপার নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের শরীরের ডিএনএর গভীরতর সম্পর্ক।

সম্প্রতি একটজ আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ধনেপাতার স্বাদে বিরক্ত হন বা পছন্দ করেন না, এ আসলে তাঁদের স্বভাবরুচির সমস্যা নয়, বরং বিশেষ এক জিনের গঠন সেইসব মানুষদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যে ধনেপাতার ঘ্রাণ তাদের কাছে ভালো লাগে না। গবেষণাটি জানাচ্ছে, মানুষের নাসিকায় উপস্থিত একটি রিসেপ্টর জিন OR6A2, এই ঘটনার মূল খলনায়ক। এই জিন এমন একটি ঘ্রাণগ্রাহী রিসেপ্টর তৈরি করে যা ‘অ্যালডিহাইড’ নামক কিছু রাসায়নিক যৌগের প্রতি অতি সংবেদনশীল। আর, ধনেপাতায় যে অ্যালডিহাইড থাকে, তা অনেকটা সাবান বা ডিটারজেন্টের গন্ধের মতো। ফলে, যাঁদের শরীরে OR6A2 জিন রয়েছে, তাঁদের নাক ধনেপাতার গন্ধকে খাদ্য নয়, বরং প্রসাধন দ্রব্যের মতো চিহ্নিত করে। ফলে, তাঁরা ধনে পাতা খেতে চান না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আহত ঘাস কীভাবে বিপদ থেকে বাঁচায় অন্যান্য গাছেদের?

Grass Protects other Plants: গবেষণা অনুযায়ী, আমাদের দেহের কোনও অংশে কেটে গেলে যেমন রক্ত ঝরতে থাকে, ঘাসের পাতাও ক্ষতিগ্রস্ত হলে ‘লাইনোলেনিক অ্যাসিড’ ও ‘লিনোলিয়েক অ্যাসিড’ নির্গত হয়।

ধনে পাতা গাছ

ধনে পাতা খাওয়ার ক্ষেত্রে, কারা ঘৃণা বেশি করেন? আর কেন? গবেষণায় উঠে এসেছে, ইউরোপীয় এবং পূর্ব এশিয়ার বংশোদ্ভূত মানুষদের মধ্যে এই সাবান-সংবেদনশীল জিন বেশি পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, এবং লাতিন আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই জিনের বিকল্প সংস্করণ দেখা যায়, যা আবার ধনেপাতার স্বাদকে সহজে সহ্য করতে সাহায্য করে নেয়। এই কারণেই হয়তো ভারতীয়, মেক্সিকান, বা থাই রান্নায় ধনেপাতার এত ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। কারণ, এই অঞ্চলের মানুষের জিন ধনেপাতার প্রতি সহনশীল। তাই যখন কেউ গরম-গরম মাংসের ঝোলে ধনে পাতা দিলে খেতে চান না, তখন তা নিছক রুচির কারণে নয়, এর পেছনে সেই ব্যক্তির জিনের বৈশিষ্ট্যের গুরুত্বও লুকিয়ে আছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রূপান্তরকামী হয় গাছও! প্রতি ঋতুতে কীভাবে লিঙ্গ বদলায় আখরোট গাছ?

Walnut Tree: যে নিয়মে মহিলা এবং পুরুষ আখরোট গাছগুলিকে তাদের ৫০:৫০ অনুপাতে ভারসাম্য বজায় রাখে তা অনেকটা প্রাণীর যৌন ক্রোমোজোমের কাজ করার মতোই।

গবেষকদের মতে, যাঁরা ধনেপাতার গন্ধে অতিসংবেদনশীল, তাঁদের ডিএনএ-র যে অংশ এই অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে, তা ঘ্রাণশক্তির অবনমন অর্থাৎ ঘ্রাণ হারানোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত—এবং এটা আলঝেইমারস রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলির একটি। তার মানে এই নয় যে, ধনেপাতা অপছন্দ মানেই স্মৃতিভ্রংশ আসন্ন। তবে গবেষকরা মনে করছেন যে ঘ্রাণ ও স্বাদের জিনগুলি মস্তিষ্কের সুস্থতার আগাম সংকেত দিতে পারে।

রান্না মাংসে ধনে পাতা

গবেষণায় এটাও উঠে এসেছে যে, নারী ও পুরুষদের মধ্যে এই জিনগুলির প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়। এই পার্থক্যের ফলে স্বাদ ও গন্ধের অভিজ্ঞতাও নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। সম্ভবত এই কারণেই পরিবারের এক সদস্য ধনেপাতা ছাড়া খেতে পারেন না, আরেকজন তা দেখলেই মুখ বেঁকান। আর এরই ফাঁক দিয়ে জীববিজ্ঞানের গোপন এই খেলা কখনও কখনও আমাদের রান্নাঘর পর্যন্ত গড়ায়।

এখানে এক অদ্ভুত বিষয়ের কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁদের মতে, যেসব মানুষের জিন ধনেপাতার গন্ধ অপছন্দ করে, তাঁদেরকেও ধনে পাতার স্বাদের দিকে ফেরানো সম্ভব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুকাল থেকেই যদি কোনও গন্ধ বা স্বাদের সঙ্গে মানুষের পরিচিতি ঘটে, তবে অনেক সময় মস্তিষ্ক সে-গন্ধকে ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করতে শিখে নেয়। একে বলে ‘ফ্লেভার কন্ডিশনিং’। জিনের বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, তাই যদি ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা বা ঠাকুরমার রান্নায় ধনেপাতা থাকে, তবে সেই স্মৃতি ও আবেগ হয়তো ধীরে-ধীরে মস্তিষ্কে ধনেপাতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে! শান্ত সবুজ ধনে পাতার স্বাদের তারতম্যের এমন বৈজ্ঞানিক কারণ সত্যিই অবাক করার মতো।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

সিভিল সার্ভিস ছেড়ে বাঘের টানে রণথম্ভোরে, ৩৫ একর জমিতে তৈরি করলেন বন

Ranthambore tiger conservation: তাঁরা কেবল চেয়েছিলেন সংরক্ষিত বনের বাইরে বাঘেদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলতে। তারপর কুড়ি বছর পর্যটন লজ থেকে যেটুকু আয় হতো, তার প্রায় সবটাই তাঁরা সঞ্চয় করতেন ভাদলাভে কৃষকদের কাছ থেকে এক এক করে জমি কেনার জন্য। প্রায় দুই দশক ধরে একটু একটু করে ৩৫ একরেরও বেশি জমি তাঁরা কিনে নেন, যার মোট খরচ ছিল সে সময়ের হিসাবে এক কোটি টাকারও বেশি।

জলবায়ু বদল শুধু প্রকৃতির বিপদ নয়, ভারতের অর্থনীতির ভিতও নড়বড়ে করে দিচ্ছে

climate change and economy: ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২১টি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি খতিয়ে দেখে একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে এক চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। দেখা যাচ্ছে, বার্ষিক গড় তাপমাত্রা যদি মাত্র ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসও বাড়ে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক উৎপাদন দক্ষতা কমে যায় প্রায় ৩.২২ শতাংশ।

নেপাল বিপর্যয়ের ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

Climate Justice for nepal: ২৬ অগাস্ট লাংটাং লিরুং-এর হিমবাহ ধসে নেপালের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়—নিহত ১,৩৪৪, নিখোঁজ ৪,৮৮৭। পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪-৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডে আছে মাত্র ৮২২ মিলিয়ন ডলার।নেপালের দাবি, চিন-ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক দায় আছে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক কাঠগড়ায়।

নেপালের হড়পা বান থেকে বেঁচে ফিরলেন যাঁরা, তাঁদের চোখে ২৬ অগাস্ট

Nepal flash floods 2026: ২৬ অগাস্ট, ২০২৬-এ নেপালের হড়পা বানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ এক কাপ চায়ের বিরতির জন্য, কেউ গাড়ির একটা রিভার্স গিয়ারের কারণে, কেউ ডালপালা ছড়ানো একটা আমগাছ আঁকড়ে ধরে, আবার কেউ কেবল ১৫ সেকেন্ডের দৌড়ে ছিনিয়ে এনেছেন নিজের শ্বাস। মৃত্যু খুব কাছ থেকে অনুভব করে ফেরা সেই মানুষগুলির অভিজ্ঞতায় রইল রাসুয়া আর নুয়াকোটের সেই সকালের কথা।

হিমালয়ের বরফ গলছে দ্বিগুণ হারে, নেপালের বিপর্যয়ের বিজ্ঞান কী বলছে?

Nepal Flood 2026: বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ৪৫০০ থেকে ৬০০০ মিটার উচ্চতার মধ্যে থাকা হিমবাহ অঞ্চলের অন্তত ৭৮ শতাংশ উচ্চতা-নির্ভর উষ্ণায়নের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাঁচ মাস পর সেই সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠল নেপালের উপত্যকায়।

ছয় দশকে কতটা সফল ভারত-নেপাল গান্ডাকচুক্তি?

Gandak dam history: নেপালের হিমবাহ থেকে পাথর ধসের পর জল নেমেছে ত্রিশূলী-কালীগণ্ডক হয়ে বিহারে। বাল্মীকিনগর বাঁধের ৩৬টি গেট খুলে প্রাণ বাঁচল বহু মানুষের। কিন্তু, ১৯৫৯ সালের গান্ডাক চুক্তি কি সত্যিই নেপাল ভারত দুই দেশের ‘সমন্বিত স্বার্থ’ রক্ষা করল? নেপালের তরাইয়ে জল মেলে না, ক্ষতিপূরণ মেলে না কৃষকদের। ৬০ বছরের পুরনো বাঁধ প্রকল্পকে নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

নেপালের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপন্ন মহিলারাই, ঝুঁকিতে ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন

Nepal Flash Floods: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানে প্রায় ১.৬ লক্ষ নারীর জীবন ঝুঁকিতে। বন্যার পর তাঁদের সামনে কী কী স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য ও জীবিকার সংকট তৈরি হয়েছে? রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, নারীদের সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ জরুরি?