গাজন থেকে বেসমা পুজো, গ্রাম থেকে শহরে – বৈশাখ যে ভাবে আসে

ধীরে ধীরে বহুতল ঢেকে ফেলছে শহরের আকাশ। পাশের মাটি সেখানে একান্ত বিবর্ণ। অথবা মাটি নেই। কংক্রিট আর অ্যাসফল্টের জোড়াতালিতে এগিয়ে গিয়েছে সভ্যতা। যদিও এগোন-পিছনোর গল্পটা সমস্যার, তাতে কী! এমন একটা হিসেব নিকেশ খুব একটা আটকে থাকে না কোথাও। বহু বয়ান সরে যাচ্ছে, হয়ে পড়ছে অপ্রাসঙ্গিক। স্বাভাবিক। মানুষের জীবনের প্রয়োজন যাচ্ছে পালটে। জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারণা পাল্টাচ্ছে। হু হু করে বেড়ে চলেছে জনসংখ্যা। কিন্তু কোথায়? এই যাবতীয় ওলটপালটের কেন্দ্রে রয়েছে শহর। যদিও এই অবিরাম ছোটাছুটির ফাঁকে মানবতা টুক করে কোনও এক বেঞ্চে বসে পড়ে, আর একা এগিয়ে যায় মানুষ, কিন্তু এই গতি থেকে মুক্তি নেই তার। পুঁজির জগতে যত চঞ্চল হবে পুঁজি, লাগ ভেল্কি লাগের ঠেলায় আরো দ্রুত ছুটবে মানুষ। অথচ এই শহরের বৃত্তের বাইরেই একটি মফস্‌সলের বৃত্ত। তাতে দোলাচল, শহরের হাওয়ায় ভাসছে বটে মানুষ, তবে রাজি নয় অতটা বদলে যেতেও। নিজের বিদ্যে চর্চার গুমর তার রয়েছে। দীর্ঘদিনের অবকাশের ইতিহাস মফস্‌সলকে কর্ষণের সুযোগ দিয়েছে অনেক বেশি। নাই হল আক্ষরিক চাষবাস, কৃষ্টির দিকটা তারা ঝালিয়ে নিয়েছে। ফলে একদিকে শহরের বৃত্তের মধ্যে তাদের অবিরত যাতায়াত, অপরদিকে শহরের ঝড় থেকে নিজেদের আলাদা করতে তারা মরিয়া। একরকম এর বাইরেই রয়েছে গ্রামের বৃত্তটি, যার প্রেক্ষাপট অনেক বড় এবং ধীর। গ্রাম থেকে শহরে চলে আসার ঘটনা এখনও জারি। কিন্তু তারপরেও যাঁরা এই বৃত্তে রয়ে গিয়েছেন, যাঁরা এই বৃত্তের একক, কৃষ্টির কিছু আদান প্রদান স্বাভাবিক ভাবে হলেও তাদের গতি বড় ধীর। মূলত শহর মফস্‌সলের সংস্কৃতি নিয়ে তাদের খুব একটা যায় আসে না। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, কিন্তু তা বিশেষ মাত্র। তাই গ্রামের সাধারণ জীবনযাত্রায় এখনও রয়ে গিয়েছে এমন অনেক রীতিনীতি অনুষ্ঠান, যার প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়েছে বাকি দুটি বৃত্তে। গ্রামের বহুস্তরীয় জটিল জীবনযাত্রার স্থিতিস্থাপকতা আপাতভাবে বেশি, কারণ পরিবর্তন সেখানে অতি ধীর।

আরও পড়ুন-বিরিয়ানি নয়, নববর্ষে বাঙালির পাতে ছিল মাংসের পোলাও

গতকাল চৈতি রাতের মেয়াদ ফুরলো। বাংলা হিন্দু পঞ্জিকার বছরও। এই সংক্রান্তির ধারণাটি হল, কালের আবর্তে অসীমের মাঝে সাঁতরে সূর্য একরাশি থেকে অপর রাশিতে গমন করে। মীন রাশিতে প্রবেশ করল সে। এই যে লাগাতার ছুটে চলা, এক ক্রান্তি বা কোণ থেকে অপর ক্রান্তিতে উত্তরণ, তাইই সূর্য সংক্রান্তি। পুরাণ মতে দক্ষের সাত মেয়ের বিয়ে হয়েছিল চন্দ্রের সঙ্গে। তারই একজন চিত্রা। সেই চিত্রা থেকেই নক্ষত্রের নাম, আবার সেই চিত্রা নক্ষত্র থেকে মাসের নাম হল চৈত্র। এরই শেষ চৈত্র সংক্রান্তি। তন্ময় (তন্ময় ভট্টাচার্য) ‘না যাইও যমের দুয়ার’ বইটিতে যেমন স্মৃতি থেকে তুলে এনেছে ভাই ছাতুর কথা, ঠিক তেমনই নানা অনুষ্ঠান, ব্রত, পালন ও আদান প্রদানের মাধ্যমে এই দিনটিকে উদযাপন করে থাকে গ্রাম। মেলা বসে। বেসমা-র নৈবিদ্য সাজানো হয়। এতদিনের ব্যবহার করা কাপড়, বাসন কোসন পরিষ্কার করা হয়। রান্না ঘরে ব্যবহৃত ‘নাকরী’ ফেলে দেওয়া হয়। এই ‘নাকরী’ হল খানিকটা খুন্তির মতো। ডালটাল, তরকারি এই নিয়ে নেড়েচেড়ে রান্না করা হয়। মূলত পাটকাঠি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি। ফেলে দেওয়া হয় পুরনো ঝাড়ু। নদী থেকে মাটি এনে তুলসীতলা লেপা হয়। একে বলে বিষ মাটি। বেসমা পুজো হয়, পাটকাঠির মাথায় আগুন ধরিয়ে পুঁতে দেওয়া হয় দরজার পাশে। লোকের বিশ্বাস, এই রাতে বৃষ্টি হবেই। এই অবশ্যম্ভাবী বৃষ্টির নাম বিষ ঝড়ি। এতে সাপখোপ বা বিষাক্ত পোকামাকড়ের উৎপাত কমে বলেই বিশ্বাস। বাড়িতে বাড়িতে এখনও সংক্রান্তির আগের দিনটিতে হয় নীল পুজো। নীলের উপোস।

এছাড়া রয়েছে গাজন। প্রায় সমগ্র বঙ্গেই চড়কের মেলা হয়। শিব, নীল, মনসা, ধর্মঠাকুর এতে মিলিমিশ খেয়ে গিয়েছে। মালদায় এর নাম গম্ভীরা ত জলপাইগুড়িতে গমীরা। চৈত্রের শেষ সপ্তাহ জুড়ে হয় শিবের গাজন। সংক্রান্তির চড়ক পূজায় গাজনের সমাপ্তি। গাজন একটু অন্যরকম উৎসব। এতে সন্ন্যাসী বা ভক্তেরা নানান ভাবে নিজের শরীরকে কষ্ট দিয়ে ইষ্ট দেবতাকে সন্তুষ্ট করবেন বলে বিশ্বাস করেন। ফলে শরীর ফোঁড়া হয়, দড়িতে ঝোলান হয়। শোভাযাত্রা যায় মন্দিরে। সন্ন্যাসীদের মধ্যেই দুজন সাজেন শিব ও গৌরী। বাকিরা তখন নন্দী, ভৃঙ্গী, ভূতপ্রেতদত্যিদানব। শুরু হয় নাচ। শিবের ছড়া মানুষের মুখে মুখে ফেরে, যা হয়তো তাঁদের শুনিয়ে গিয়েছেন তার পূর্বপুরুষেরা। লোকের মুখে ফেরা এইসব নানান বুনন এসে জমা হয় এক একটি উৎসব-প্রাঙ্গণে।

গাজনে কালী নাচ আবশ্যিক। হবেই। ধর্মের গাজনে নরমুণ্ড বা পচাগলা লাশ নিয়ে নাচ হয়। মড়াখেলাও হয়। তাকে বলে কালিকা পাতারি নাচ। আবার মনসার গাজনে শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করায় অংশ নেন সন্ন্যাসীনীরাও। পুরাণ মতে, শিবের উপাসক বাণ রাজা কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে নিজ শরীরের রক্ত দিয়ে নৃত্যগীত পরিবেশন করেছিলেন মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য। সেই ঐতিহ্যেই মেতে ওঠা গাজন উৎসবে। পতিত ব্রাহ্মণরাও এককালে গাজনের পুজো করতেন। তবে এর ওপর দাবি শৈবদেরই বেশি। ‘গাজন’ কথাটি গর্জন থেকে এসেছে বলে মনে করেন অনেকে। শিবের নামে থেকে থেকেই সন্ন্যাসীদের হুঙ্কার হয়তো এই নামকরণের কারণ। আবার এও সম্ভব, ‘গা’ বলতে বোঝায় গ্রাম, ‘জন’ অর্থে সাধারণ।

শহরের এক বিরাট অংশ তার আদি শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন। তার কারণ, মাইগ্রেশন ব্যতীত শহরের পুষ্টি সম্ভব নয়। তবে এই যাযাবর আস্তানারও নিজস্ব রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি রয়েছে। সেই জীবনচক্রে এই গাজন-চড়ক জাতীয় রীতিনীতির প্রাসঙ্গিকতার আর কিছুই তেমন বাকি নেই। কাজেই গ্রামের বৃত্ত পেরিয়ে খাবারের খোঁজে শহরের বৃত্তে ঢুকে পড়তেই পারে হঠাৎ কোনও এক বহুরূপী, মফস্‌সলের মানুষের কাছে সে একটা সেতু, নষ্টালজিয়ায় পোঁছনোর মাধ্যম অবশ্যই, একটা যুগের, সমাজের প্রতিনিধি, যে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাস্তব ও কৃষ্টির মাঝামাঝি। কিন্তু শহরে প্রেক্ষাপটে সে এক ছিন্নমূল চরিত্রের বেশি কিছু না। শহরের প্রেক্ষাপটেই এমন একটা খোপ রয়েছে, যা মানুষকে তার অনুষঙ্গ থেকে সরিয়ে রাখতে ভালোবাসে। অথচ যে মুহূর্তে সে গ্রামে ফিরছে, সে একটি সম্পূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠছে। আর তা হবে নাইই বা কেন, কী প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে তার শহরের জীবনে উপার্জনটুকু ছাড়া? দোষ কাউকেই দেওয়া যায় না। একবার কল্পনা করার চেষ্টা করুন, কোনও এক টিপিক্যাল শহরের বুকে চড়ক হচ্ছে। বড়শিতে পিঠ গেঁথে বন বন করে ঘুরছে লোকেরা। জিভ ফোঁড়া হচ্ছে। রক্ত, নরমুণ্ড, পচাগলা লাশ। প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তখন গ্রামের এই অতি সাধারণ জিনিসগুলিই এমন ভয়াবহ ও বীভৎস হয়ে উঠবে, যে তাকে দৃষ্টিকটূ বলেও আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।

একজন সচেতন আধুনিক মানুষ নীল পুজোর মূল নীতিটির সঙ্গেই একাত্ম হতে পারবেন না আজ। একইভাবে শহরের পালিত পয়লা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রান্তি ছিন্নমূল কিছু অনুষ্ঠান আড়ম্বর সর্বস্ব হতে বাধ্য। বাংলা হিন্দু পঞ্জিকা শহরের জীবনের সঙ্গে কতটা জড়িত? কৃষিকাজ ঘিরে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি? পুরাণ বা গ্রামের লোকবিশ্বাস? সেই জন্যেই দেখনদারিটি চোখে লাগে। শুধু মাত্র শাড়ি আর পাঞ্জাবির মধ্যে তো নববর্ষ ধরে ফেলা যায় না। ঐতিহ্যের আধার জীয়ন্ত মানবস্রোত। সেই স্রোত নিজের পথ আপনি গড়ে নেয়। গ্রামের মূল স্রোতটি থেকে শহরের নাড়ি কেটে গিয়েছে কবেই! এখন তার স্বতন্ত্র খাত। এবং একথা আজ অনস্বীকার্য, শহরের মানুষের চিহ্ন-আবহ গ্রামের থেকে আলাদা। কাজেই শিল্প বাদে বাস্তব যাপনের ক্ষেত্রটিতে গ্রামীণ আচার আচরণের ব্যবহার আর জমে না। এমনকী মেনে নেওয়া ভালো, শিল্পেও এই গ্রামীণ আচার-আচরণকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করতে শহরের মানুষেরা শিখেছেন গ্রামের কাছেই। যদিও চিরকাল শহর ভেবে আসছে শহরের জটিলতা বেশি, আর গ্রাম খুব সহজ সরল একটা ব্যাপার, অথচ বাস্তবে গ্রামের জীবন এখনও যে পরিমাণ সংকেত ব্যবহার করে শহর তার কাছে শিশুমাত্র।

এই সব পুজো, রীতিনীতি, আচার আচরণ সবটাই সংকেতময় সেই চিহ্ন-আবহের অংশ।ওই যে বলেছিলেম, গ্রাম্য জীবন অনেক অনেক বেশি স্থিতিস্থাপক। যে বিস্তারের খোঁজ শহরের কাছে নেই। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে, তবে তা বিশেষ মাত্র।

More Articles

;