দেশ জুড়ে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক নির্যাতন কীভাবে থামাতে পারে সরকার?

Migrant Labours : কর্মসংস্থানের অভাব। কিছু ক্ষেত্রে আবার, প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও কাজের সুযোগ না থাকায় শ্রমিকেরা আবারও বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে, পাট শিল্প নিয়ে কেন্দ্রের উদাসীনতা প্রশ্নের মুখোমুখি, জুট কর্পোরেশন কার্যত বন্ধ।

Asif Faruk
৩ মিনিট
দেশ জুড়ে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক নির্যাতন কীভাবে থামাতে পারে সরকার?

বাংলার গ্রামাঞ্চল থেকে প্রতি বছর হাজার-হাজার শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কৃষি ও স্থানীয় পর্যায়ে কাজের অভাব, দারিদ্র্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন তাদের বাধ্য করে পরিবার ছেড়ে অজানা শহরে পাড়ি দিতে। অথচ এটাই সত্য— শ্রম, পুঁজি এবং পণ্যের মতো মানুষের চলাচলকেও আটকে রাখা যায় না; অর্থনীতির চাহিদা-যোগানের সহজ সূত্রেই তা ঘটে। এই শ্রমিকরা ইটভাটায়, দোকানে, ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। রাজমিস্ত্রি বা সহকারীর কাজে দেশের নানা প্রান্তে দিনরাত পরিশ্রম করেন। কিন্তু রোজগারের নিশ্চয়তার পরিবর্তে তাদের ভাগ্যে নেমে এসেছে ভয়, হেনস্থা ও অনিশ্চয়তা।

ভাষার অপরাধে নির্যাতন

সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে, বাংলা ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হেনস্থার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শুধু বাংলা বলার অপরাধেই তাদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নামে পুলিশ টার্গেট করছে বাঙালি শ্রমিকদের; মাঝরাতে তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হচ্ছে, অনির্দিষ্টকালের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হচ্ছে— ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোর্টে তোলার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। জল, খাবার, ওষুধ— কিছুই দেওয়া হচ্ছে না; অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁরা দিন-রাত কাটাচ্ছে।

পুলিশ ও বিএসএফের বিচারক সাজার প্রবণতা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশ জুড়ে ‘বাঙালি খেদাও’, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ক্ষেত্রেই কি প্রযোজ্য?

Citizenship under suspicion : লক্ষ্য করা উচিত, বাঙালি ছাত্রদের, বাঙালি ডাক্তারদের, বাঙালি ইঞ্জিনিয়ারদের, বাঙালি শিক্ষকদের ওপর কিংবা অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে সংযুক্ত বাঙালিদের ওপর  কিন্তু এই আক্রমণ ঘটছে না।

বিজেপি-শাসিত রাজ্যের পুলিশ নাগরিকত্ব যাচাই না করেই শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি’ ঘোষণা করছে। অনেককে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, এবং বিএসএফ তাঁদের মারধর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ-ঘটনা মানবাধিকার লঙ্ঘনেরই উদাহরণ। শিশুদেরও এর থেকে রেহাই নেই। পরিবারের সদস্যরা জানতেই পারছেন না প্রিয়জন কোথায়, বেঁচে আছে কি না। আটক শ্রমিকদের অনেকের কাছেই ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড আছে। তবুও তাঁরা অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন। অনেকে আতঙ্কে গ্রামে ফিরে আসছেন— কিন্তু সেখানেও কাজ নেই, আছে ঋণের বোঝা ও অভাব। স্কুলছুট হচ্ছে সন্তান, রোগীর ওষুধ বন্ধ, পরিবার ভেঙে পড়ছে।

ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক

সরকারের নীরবতা ও ব্যর্থতা

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দেশজুড়ে বাঙালি খেদাও অভিযান! কী বলছে বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল?

Bengali Migrant Workers: এর আগেও ১৯৬০-১৯৭০-এর দশকে আসামে 'বঙ্গাল খেদা আন্দোলন' দেখেছেন, তিনি তখন সদ্য যুবক। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি, বাংলা ভাষা শুনলেই মারা হত।

পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চের পক্ষ থেকে ২১ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হলেও কেন্দ্র কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। আমি নিজে আরটিআই (RTI) করে জানতে চেয়েছিলাম— ১. পরিযায়ী শ্রমিকদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেতে কী কী নথি লাগবে? ২. কতজন শ্রমিক বর্তমানে বিভিন্ন রাজ্যে আটক? বলা বাহুল্য, কোনও উত্তর আসেনি।

নির্যাতনের কয়েকটি দৃষ্টান্ত

দিল্লি পুলিশ ২০১৫ সালে ছিটমহলের নাগরিকত্বপ্রাপ্ত সামশুল হককে 'বাংলাদেশি' বলে আটক করে। মুর্শিদাবাদের সুজন সরকারকে উড়িষ্যায় 'বাংলা' বলার কারণে বেধড়ক মারধর করে পুলিশ, তারপর রক্তাক্ত অবস্থায় আটক করে। লালবাগের মিলন সেখ ও ইসমাইল সেখকে চেন্নাইয়ে মারধর করে হাত ভেঙে, মাথা ফাটিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, কোর্টে না তুলে দিনের পর দিন পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক রাখার ঘটনা বারবার ঘটছে। এক্ষেত্রে সমাধানের একটাই পথ, প্রতিটি রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হেল্পডেস্ক ও আইনি সহায়তা কেন্দ্র গঠন করতে হবে। এবং পরিচয়পত্র যাচাইয়ের নামে হয়রানি বন্ধের ক্ষেত্রে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে কড়া পদক্ষেপ গ্রহন করতে হবে। রাজ্য সরকারকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে একটি স্পষ্ট তালিকা প্রস্তুত করতে হবে যে, কারা-কারা ভিন রাজ্যে কাজ করতে গেছেন।

ভিন রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক

কর্মসংস্থানের অভাব। কিছু ক্ষেত্রে আবার, প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও কাজের সুযোগ না থাকায় শ্রমিকেরা আবারও বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে, পাট শিল্প নিয়ে কেন্দ্রের উদাসীনতা প্রশ্নের মুখোমুখি, জুট কর্পোরেশন কার্যত বন্ধ। দীর্ঘদিন ১০০ দিনের কাজ বন্ধ থাকায় সমস্যা আরও গভীর হয়েছে; হাইকোর্টের নির্দেশে কিছুটা স্বস্তি মিললেও তা যথেষ্ট নয়। তবুও ১ আগষ্ট থেকে কাজ শুরু হয়নি। প্রশিক্ষণের পর, স্থানীয় পর্যায়ে সরকারকে শ্রমিকদের 'কর্মস্থান' নিশ্চিত করতে হবে।

সচেতন সমাজ ও সরকারের যৌথ দায়িত্ব হল স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কর্মসংস্থান গড়ে তোলা। হস্তশিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগকে শক্তিশালী করে তোলা। কেন্দ্রের উচিত আন্তঃরাজ্য শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ করা। সচেতন নাগরিক সমাজকেও রুখে দাঁড়াতে হবে। যাঁরা ঘাম-রক্তে দেশ গড়ছেন, তাঁদের হেনস্থা সভ্যতার লজ্জা। ভাষা, ধর্ম বা রাজ্য নির্বিশেষে শ্রমিকদের মর্যাদা রক্ষা করতেই হবে— এটাই সভ্য-সমাজের পরিচয়।স্বাধীনতার ৭৮ বছর পর যুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটি শক্তিশালী সংবিধান থাকা সত্বেও বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকরা স্বাধীন দেশে পরাধীন ক্রীতদাসে পরিণত হচ্ছেন। ভাষার স্বাধীনতা হারিয়ে, মাতৃভাষা বলতেও আজ ভয় পাচ্ছেন তাঁরা। বাংলা ভাষা খুন হচ্ছে। এই লজ্জা দেশের লজ্জা— যা থামাতে হবে এখনই।

লিখেছেন
Asif Faruk
Asif Faruk
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘মহাকাব্য যদি কোথাও জন্মে থাকে, তবে তা ফুটপাতে’—কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্তের সঙ্গে 'আড্ডা'য় অত্রি ভট্টাচার্য

The Other Kolkata of krishnapriya Dasgupta: কলকাতার সেই অচেনা ফুটপাতের মানুষরা কীভাবে বেঁচে থাকেন? সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আজকালের প্রাক্তন সাংবাদিক কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত কী দেখেছেন? আর আজকের সংবাদমাধ্যম কেন বদলে গেল তাঁদের দেখার চোখে? তাঁর স্মৃতি, সাংবাদিকতা ও আজকের বদলে যাওয়া শহর নিয়েই তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় অত্রি ভট্টাচার্য।

১৯৭১ থেকে ২০১১: কলকাতার ফুটপাথে থাকা মানুষদের রোজনামচা কেমন ছিল?

Kolkata pavement dwellers survey: ১৯৭১ থেকে ২০১১—এই চার দশকে কলকাতার ফুটপাথবাসীর সংখ্যা ৫০ হাজার থেকে বেড়ে প্রায় ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। ফুটপাথবাসীদের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। কেউ থাকেন উড়ালপুলের নীচে, কেউ রেললাইনের পাশে, আবার কেউ পরিত্যক্ত পাইপের ভিতরে। শহরের অসংগঠিত অর্থনীতিতে ফুটপাথবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, কাজ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি নিয়ে অতীতে বেশ কিছু গবেষণা ও সমীক্ষাও হয়েছে।

শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকাতেই নয়, বাংলাতেও ছিল দাসপ্রথা

International Day for the Remembrance of the Slave Trade and its Abolition: ২৩ আগস্ট আন্তর্জাতিক দাসব্যবসা স্মরণ দিবস। হাইতির দাসবিদ্রোহের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে, বাংলার মাটি থেকে লক্ষাধিক মানুষকে বলপূর্বক নির্বাসিত করার ইতিহাস। চট্টগ্রাম, হুগলি, সুন্দরবন হয়ে আরব, আফ্রিকা, মরিশাসে পৌঁছেছেন বাংলার দাসেরা। শুধু ইতিহাসে নয়, আজও বাঙালির আন্তর্জাতিকতা চর্চায় দাসেদের উল্লেখ প্রাসঙ্গিক।

ঘাড়ধাক্কা খেয়ে ওপারে, বাংলাদেশে যেভাবে বেঁচে আছেন সাইদা ফকির

Saida Fakir Deportation: বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর কী ভাবে দিন কাটছে সাইদা ফকিরের? বাংলাদেশের কোথায় আছেন? কারা আশ্রয় দিল তাঁকে?

সোনালি সুইটির পর এবার সাইদা, 'ঘাড়ধাক্কা'র তালিকায় নতুন নাম যে প্রশ্ন তুলছে

Saida Fakir Case: সাইদা ফকিরকে বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্ত পার করে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে নাগরিকত্ব যাচাই ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবির ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। কাউকে দেশছাড়া করার আগে যথাযথ তদন্ত ও সাংবিধানিক সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেই বিতর্ক ফের উঠে এসেছে।

ফিরে দেখা: সোনালি-সুইটিদের নরক যাত্রা

Sonali Khatun, Sweety Bibi: দু'দশক দিল্লিতে থাকার পরও কেন সোনালি খাতুন ও সুইটি বিবিদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে সীমান্ত পেরিয়ে পাঠানো হলো? নাগরিকত্বের নথি থাকা সত্ত্বেও কেন জেল, পুশব্যাক ও অপমানের শিকার হতে হলো তাঁদের? সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও মানবাধিকার প্রশ্নকে আরও সামনে এনে দিল?

উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম, তবু ফল প্রকাশের দিন হোটেলে কাজে ব্যস্ত সাগর

Sagar Mondal: উচ্চমাধ্যমিকে রাজ্যে নবম। মোট ৪৮৮ নম্বর। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন বাড়িতে নয়, গুজরাটের আমেদাবাদের একটি হোটেলে কাজে ব্যস্ত ছিল পূর্ব বর্ধমানের সাগর মণ্ডল। পরিযায়ী শ্রমিকের ছেলে সাগরের স্বপ্ন আইএএস হওয়ার।