রোশনাইয়ের আনন্দ নয়, মনখারাপের দীপাবলি মাটির প্রদীপের কারিগরদের

Kali Puja 2022: কেমন আছেন প্রদীপের কারিগররা?

Ramen Das
৩ মিনিট
রোশনাইয়ের আনন্দ নয়, মনখারাপের দীপাবলি মাটির প্রদীপের কারিগরদের

সন্ধ্যা হলেই প্রদীপের আলো ছড়াবে চারদিকে। প্রত্যেক মুহূর্তের অন্ধকার মুছে আলোর উৎসবে মাতবে রাজ্য। দেশ। বিশ্ব। কিন্তু যে কৃত্রিম আলো প্রথম জ্বালিয়েছিল! যে মাটির প্রদীপের আঁচড়ে জুড়িয়েছিল অন্ধকার। তার খবর কী? কেমন আছেন প্রদীপের কারিগররা? কালীপুজো আর হাল আমলের দীপাবলি উৎসবের আবহে আমরা সেই মাটির শিল্পের নেপথ্য নায়কদের খোঁজ নিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম প্রদীপ-গ্রামে।

যে প্রদীপ গাঁয়ের অবস্থান চালতাবেড়িয়ায়। বারাসত-বনগাঁগামী যশোর রোডের পাশেই রয়েছে এই গ্রাম। যেখানে প্রায় সকলেই জড়িয়ে মাটির শিল্পের সঙ্গে। প্রদীপের সঙ্গে। যা রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় প্রদীপের গ্রাম।

করোনা গিয়েছে। খানিকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে সবটা। কিন্তু আজও ভালো নেই ওঁরা। করোনার ভয়াল থাবায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা এখনও দিচ্ছে যন্ত্রণা। যার যাঁতাকলে এখনও ধুঁকছে একের পর পরিবার। তাই প্রদীপ আছে, শিল্প আছে, শিল্পী আছেন কিন্তু বিক্রি কই! এই প্রশ্নের আবহেই এখনও চিন্তায় ওঁরা।

ওই অঞ্চলের পালপাড়াজুড়ে প্রায় ৫০-এর বেশি পরিবারের বাস। ছোট থেকে বড় প্রায় সকলেই জড়িত মাটির কাজের সঙ্গে। পুজো আসার অনেক আগে থেকেই শুরু হয় কাজ। মাটি আনা, মাটি মাখা, বিভিন্ন মাপের, নকশার ছাঁচে ফেলে সেই মাটিতেই ফুটিয়ে তোলা নানা রূপ। তারপর তা শুকিয়ে নিয়ে কাঠের আগুনে পোড়ানো। এই পদ্ধতির পরেই নির্দিষ্ট মাটির জিনিসে রঙের প্রলেপ। তারও রয়েছে একাধিক ভাগ। প্রথমে সাদা। তারপর প্রদীপ বা মাটির অন্যান্য শিল্প অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রঙের প্রলেপ দেওয়া।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হেমন্তে ছিল আলো তৈরির পাঠশালা! কালীপুজোর প্রদীপ যেভাবে তৈরি হত হাতে হাতে

Kali Puja 2022: পুজোর কয়েকদিন আগে থেকে চলত সলতে পাকানো পর্ব, আলো তৈরির পাঠশালা।

কালীপুজো এলেই এই কাজ আগেও চলত রমরমিয়ে। দুর্গা পুজো দেখারও সময় থাকত না ওঁদের। কিন্তু এখন পরিবর্তন হয়েছে পরিস্থিতির। এক ধাক্কায় হাল খারাপ হয়েছে ব্যবসার। ধুঁকছে শিল্প। যেটুকু যা ছিল, সবটা প্রায় গ্রাস করে নিয়েছে বৈদ্যুতিন আলো, বহুল প্রচলিত চায়নার জিনিস! কেন এই অবস্থা, কেন এখনও অন্ধকারে প্রদীপের গ্রাম! কী বলছেন ওঁরা?

সমীর পাল। পালপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা। শিল্পী। ঠাকুরদার আমল থেকে এই কাজে জড়িত। এক সময় থাকতেন ওপার বাংলায়। এপারে এসে তিনিও ছোট থেকেই শুরু করলেন কাজ। সমীরের কথায়, "আজ থেকে ধরুন ৫ বছর আগে। লোকে প্রদীপের পিছনে ছুটতেন। এখন অবস্থা শেষ! এবারও হাল খুব একটা ভালো নেই। বয়স হয়েছে, কম কাজ করি। কিন্তু ভয় লাগে এই পরম্পরা এই শিল্প আমার ছোটরা আর রাখবে কি!'' সমীরের ভাই রাখাল পাল। তাঁর মতে, ''আগের বছরের হিসেবে এবার একটু বেড়েছে বিক্রি। তবে এত জিনিস নষ্ট হয় এখন, খারাপ লাগে।''

আর এক পরিবারে বাস প্রীতম পালের। যুবক প্রীতম ছোট থেকেই প্রদীপের কাজে যুক্ত। তিনি বলেন, ''ভালো লাগে কাজটা করতে। কিন্তু কী করব তাই ভাবি, আদৌ টিকবে তো!'' প্রীতমদের সঙ্গেই কাজ করেন লতারানি হালদার। তাঁর মতে, ''আমাদেরও দুর্দিন। কাজ নেই। বিক্রি তেমন নেই। একটা সময় তো সবাই মিলে এই কাজ করেই পেট চালিয়ে নিতাম।'' পালপাড়ার কাছে থাকেন দাস পরিবারের কয়েকজন। তাঁরাও জড়িত এই কাজেই। অপূর্ব দাস বললেন, ''বিক্রি কেমন বেড়েছে বলুন তো! ধরা যাক, আগে ৫০০ টাকার মাল বিক্রি করতাম। এখন বেড়ে ৭০০ হল। কিন্তু আদতে সেই অবস্থা একই।'' অপূর্বর কথায়, "এখন বিক্রি করতে হয় খোলা বাজারে। যা আগে এখানে হত না। করোনা বদলে দিয়েছে সব।"

পূর্ণিমা পাল। তিনিও বহুকাল যাবৎ এই কাজে জড়িত। তিনি বলছেন, "কম দামে মাল বিক্রি করে লাভ থাকে না একদম। শয়ে শয়ে প্রদীপ বানিয়ে অনেক সময় ক্ষতি রেখেই বিক্রি করে দিই। খরচ খানিকটা তোলার জন্য।''

চম্পা সেন একটি কারখানায় প্রদীপ বানান ওই অঞ্চলেই। তিনি বলছেন, ''প্রচুর মাটি আসত আগে, এখন কম আসে। আমাদেরও কাজ কমেছে। বুঝতে পারি আর বেশিদিন হয়তো থাকবেই না!"

আসলে ভালো নেই প্রদীপ গ্রাম। আলোর দ্বীপের স্বপ্ন বোনার মধ্যেই আজও লুকিয়ে রেখেছে অন্ধকার। যে সংকট আসছিল আগে থেকেই, সেই সংকটের করোনাকালে তীব্র গতিতে বেড়ে ওঠা, আরও খারাপ করেছে পরিস্থিতি। যা মেটেনি এখনও। শুধুই ভালো থাকার চেষ্টা চলছে নিরন্তর!

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।