বাড়ি বাড়ি ঘুরে পেন বিক্রি থেকে লিংক সাম্রাজ্য! পাঁচ টাকার পেনে দেশের মন দখল...

ঝড়জলের রাতে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ক্যাম্পাসে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন এক মহিলা। সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিল কলেজের ছাত্ররা। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ কাজে লাগিয়ে বাচ্চা প্রসব করিয়েছিলেন এক ছাত্র। মহিলা সম্পর্কে কলেজ প্রিন্সিপালের মেয়ে। চক্ষুশূল সেই ছাত্র এক লহমায় স্যারের কাছে রক্ষাকর্তা হয়ে উঠলেন। বদলে উপহার হিসেবে ছাত্রের হাতে সেদিন নিজের পেন তুলে দিয়েছিলেন। আমির খান অভিনীত ' থ্রি- ইডিয়টস' ছবির দৃশ্য সকল দর্শকের মনেই দাগ কেটেছিল। সত্যিই তো একজন ছাত্রের কাছে এর থেকে বড় পুরস্কার আর কি হতে পারে! বইখাতার পাশাপাশি একজন ছাত্রের জীবনে পেন বা কলমের তাৎপর্য কতখানি তা আলাদা করে বলা নিষ্প্রয়োজন। শুধু ছাত্র নয় দৈনন্দিন জীবনেও পেনের ব্যবহারই তাঁর গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। অথচ কয়েক দশক আগেও ভালো সস্তা-পেন ভারতের বাজারে অমিল ছিল। আমাদের আজকের গল্প এমনই এক পেন কোম্পানির যার নাম আজ দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়লেও যাত্রা শুর হয় কলকাতার বুকে। সংস্থার নাম  'লিংক পেনস অ্যান্ড পেপার লিমিটেড'। ইতিহাসের পাতায় ফিরে দেখা যাক পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই এই পেন সংস্থার যাত্রাপথের নকশা।

শুরুর কথা

ছয় দশক আগে কার্যত নিঃস্ব হয়ে রাজস্থান থেকে কলকাতায় পা রেখেছিলেন সুরজমল জালান। ১৯৩৮ সালে রাজস্থানের লছমন গারহিন শিখর জেলায় এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয় তাঁর। আর পাঁচটা শিশুর মতোই খুব সাধারণভাবে কেটেছিল সুরজমলের শৈশবকাল। বাবা অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁর বড় দুভাইয়ের কাঁধেই ছিল সংসারের দ্বায়িত্ব। ছয় ভাই বোনের মধ্যে সুরজমল ছিলেন পঞ্চম তাই ছোটবেলায় আদরেই বড় হয়ে উঠছিলেন তিনি। স্কুলের গণ্ডি পার করে বাড়ি থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে কলেজে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় মাঝ পথেই ছাড়তে হয় পড়াশোনা। ১৯ বছর বয়সে বাড়ির অমতেই কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন সুরজমল। কলকাতা এসে হ্যারিসন রোডের এক কার্পেট কোম্পানিতে ৬০ টাকা পারিশ্রমিকে কাজ শুরু করেন। ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে কর্মরত এক বন্ধুর সাথে থাকতেন তিনি। ফুটপাতে স্নান সেরে রাস্তার ধাঁরের হোটেলের খাবার খেয়ে দিন কাটছিল সুরজমলের। টাকা বাঁচানোর জন্য হেঁটেই যেতেন কাজে। কিছু সময় চিরুনি তৈরির কোম্পানি ও চালের মিলেও কাজ করেছেন তিনি। এক সময় ৫০০ টাকা মাসিক মাইনেতে চা কোম্পানির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদেও কাজ করেন সুরজমল। তবে বাবা-মায়ের অসুস্থতার কারণে রাজস্থানে ফিরতে হয় তাঁকে। সেখানে থাকাকালীন বাড়ি বাড়ি ঘুরে পেন বিক্রি করতেন তিনি। এই সময়ই তিনি বুঝতে পারেন দেশে অল্প দামের ভালো পেনের অভাব রয়েছে। তখনই ঠিক করে নেন পেনের ব্যবসা শুরু করবেন তিনি।

আরও পড়ুন-‘মাই নেম ইজ গওহরজান’, চিৎকার করে বলতেন যে নিঃসঙ্গ অপরাজিতা…

লিংকের প্রতিষ্ঠা ও ব্যবসায়িক রমরমা

ঠিক যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। দু'বছর পরে কলকাতায় ফিরে বাগড়ি মার্কেটে পাইকারি পেনের ব্যবসা শুরু করেন সুরজমল। এর কিছুদিনের মধ্যেই পেন তৈরির কাজ শুর করেন তিনি। ততদিনে বিয়ে হয়ে গেছে সুরজমলের। পেনের ব্যবসা শুরু করার জন্য  সাহায্য পেয়েছিলেন শ্বশুর বাড়ির থেকে।১৯৭৬ সালে দশ হাজার টাকা হাতে নিয়ে কলকাতার মালাপাড়ায় একটি ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের ঘরে শুরু হয় পেন উৎপাদনের কাজ। বন্ধুর পরামর্শে কোম্পানির নাম দেন ' লিংক'। পেনে ব্যবহৃত ধাতবটিপ আমদানি করতেন সুইজারল্যান্ড থেকে এবং জার্মানি থেকে আসত কালি। প্রথম বল পেন তৈরি করতে শুরু করেছিলেন তাঁর সংস্থা। মূল্য ছিল মাত্র ২ টাকা। বর্তমান কোম্পানির কর্ণধার সুরজমলের ছেলে দীপক জালানের কথায়, ' পেনের ধাতবটিপ ও কালির ওপরেই নির্ভর করে তার গুণমান। ১৯৬০-৭০ এর সময় যে পেন ব্যবহার করা হত তাতে এই দুইয়েরই অভাব ছিল।আমার বাবা বাজার বুঝে তাই ভালো মানের কালি ও ধাতবটিপ ব্যবহার করার  চেস্টা করেন। আর তাতেই ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখে কোম্পানি'। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছিলেন দীপক।

পরবর্তী কালে ব্যবসায় লাভের গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। ১৯৯২ সালে জাপানের মিৎসুবিশি কোম্পানির থেকে ব্যবসায়িক সহযোগিতা পায় তাঁর সংস্থা। সেই বছরই দক্ষিণ কোরিয়াতে  ১২ লক্ষ টাকার পেন রপ্তানি করে এই সংস্থা। ১৯৯৫ সালের মধ্যে কোম্পানির বার্ষিক টার্নওভার দাঁড়ায় ২৫  কোটি টাকায়। সেই বছরই এই কোম্পানি মুম্বাই এবং কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জেরও তালিকাভুক্ত হয়। ২০০০-২০০১ অর্থবর্ষে টার্নওভার বেড়ে হয় ৫২ কোটি টাকা। ২০০৩ সালে মাত্র ৫ টাকায় বাজারে আসে লিংক ওসেন জেল। এর আগেও জেল পেন তৈরি করেছে এই সংস্থা কিন্তু এত অল্প দামে এই প্রথম। পরবর্তীকালে কালে বাজারে আরও অনেক নতুন পেন এলেও এর জনপ্রিয়তা ছাপাতে পারেনি কেউই। 

          

২০০৫ সালে লিংক গ্লিসার পেনও বাজার ধরতে পেরেছিল ভালো। আজও এই পেনগুলির রমরমা রয়েছে বাজারে। পরবর্তীকালে পেন্টনিক, ডেলি, মার্কলাইন এমন একাধিক পেন বাজারে নিয়ে এসেছে এই সংস্থা। ২০০৮ সালে কোম্পানি শাহরুখ খানকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরও করেন যা দেশের কোণায় কোণায় পৌঁছে লিংকের পেনকে। বছরের পর বছর ধরে  ভারতবাসীর মনে জায়গা করে নিয়েছে লিংক।তবে আজ আর শুধু পেন নয় খাতা, পেন্সিল, জ্যামিতি বক্স, মার্কারের মত স্টেশনারি দ্রব্যও তৈরি করে এই কোম্পানি। ২০২০ অর্থবর্ষে ৪০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে এই কোম্পানি।এই সংস্থা  বিদেশের ৪০ টি দেশে পেন রপ্তানি করেন ।  

                

 

তবে করোনা অতিমারি শুরু হলে খানিক ধাক্কা খায় ব্যবসা। কোম্পানির কর্ণধার দীপকের কথায়,' অতিমারিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায়  পেনের বিক্রি ৪০% পর্যন্ত কমে গিয়েছিল। তাঁর মধ্যে সমস্ত দোকান বাজারও বন্ধ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে। তখন আমরা ব্যবসার পদ্ধতি খানিক বদলে ফেলি। ওষুধের দোকান, ছোট পানের দোকান, মুদি দোকানগুলিকে টার্গেট করতে শুরু করি। তাঁদের কাছে গিয়ে আমাদের লোকরা অনুরোধ করেন তাঁদের দোকানে পেন রাখার জন্য।এভাবে ভারতের ৫০,০০০ দোকানের সাথে আমরা কাজ শুরু করি। এছাড়াও কোম্পানি ৩০০ লোককে নিয়োগ করে টেলি মার্কেটিং-এর জন্য'। বর্তমান কলকাতার সল্টলেকে অফিস রয়েছে এই সংস্থার।

শক্ত মাটিতে দাঁড়িয়েও দীপকের গলায় পরিবেশ সচেতনতার বার্তা মিলেছে। পাস্টিকের তৈরি একবার ব্যবহার যোগ্য পেনের বদলে তাই তাঁরা পুনর্ব্যবহারযোগ্য পেনের উৎপাদনে জোর দিতে চান।

More Articles

;