নাটকের চরিত্রের ফাঁসির বিরোধিতায় রাস্তায় মানুষ! কেন আজও পড়তেই হয় হুমায়ূন আহমেদ

Humayun Ahmed: রাস্তায় মিছিল নামল, “বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে,” স্লোগানও শোনা যেতে লাগল। আর এভাবেই হয়তো শিল্প মানুষকে সিমপ্যাথি থেকে এমপ্যাথির দিকে এগিয়ে দেয় কয়েক ধাপ।

Sanchari Bhowmik
৩ মিনিট
নাটকের চরিত্রের ফাঁসির বিরোধিতায় রাস্তায় মানুষ! কেন আজও পড়তেই হয় হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ। জীবন পথের পথিক, জীবন রসিক। দীর্ঘদিন ধরে কলমের জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের। তাঁর ৭৪তম জন্মদিন পেরিয়ে এল বাঙালি পাঠক। মনের চোখ দিয়ে হুমায়ুন দেখেছেন জীবনকে। তাই লিখতে পেরেছেন, “দুনিয়াতে খুব অল্প কিছু মানুষ আছে, যারা আসলেই আলাদা। সারা জীবনেও তারা কারও আপন হতে পারে না; তাদের কেউই বুঝে না। তাদের সব থেকেও আসলে শূন্যতা ছাড়া তাদের কিছুই থাকে না। তারা একা আসে, একা ঘুরে, একাই থাকে, একাই চলে যায়!” জীবনের কঠিন সত্য, মানুষের মনের নানা রঙকে এভাবেই তো ফুটিয়ে তুলেছেন হুমায়ুন নিজের ক্যানভাসে। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলায় কুতুবপুরে পীরবংশে জন্ম হুমায়ূন আহমেদের। সবাই অবশ্য ডাকত কাজল নামেই। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা, আর মা আয়েশা ফয়েজ গৃহিণী। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে কাজলই সবার বড়। তাঁর অন্য দুই ভাইও আগামীতে বরেণ্য ও প্রতিভাবান হয়ে জয় করেছেন মানুষের মন। কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল তাঁর ছোট ভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবিব বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন হুমায়ুন। তাঁর বিখ্যাত ‘হিমু’ সমগ্রের কথা জানেন না এমন মানুষ দুই বঙ্গেই কম! কথা সাহিত্যে- ‘নন্দিত নরকে’, ‘লীলাবতী', 'কবি', 'শঙ্খনীল কারাগার', 'গৌরীপুর জংশন', 'নৃপতি', 'বহুব্রীহি', 'এইসব দিনরাত্রি', 'দারুচিনি দ্বীপ', 'শুভ্র', 'নক্ষত্রের রাত', 'কোথাও কেউ নেই', 'আগুনের পরশমণি', 'শ্রাবণ মেঘের দিন', 'জোছনা ও জননীর গল্প', এমন বহু মনোমুগ্ধকর উপন্যাস উপহার দিয়েছেন তিনি। তাঁর বইয়ের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে তিনশো। 'নন্দিত নরকে' উপন্যাস দিয়েই তাঁর অভিষেক ঘটে, সাড়া ফেলেন পাঠক মহলে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মৃত ছেলের শোক নিয়েই বাটামাছের বিকিকিনি! গ্রামের হাটে-বাজারে নানা রঙের গল্প

Rural Bengal: বাজারহাটে ঘুরে, পথে পথে বেরিয়ে একটু মানুষের কথা শুনলে, পাশে চুপ করে বসলেই আমরা বাঁচিয়ে ফেলতে পারব এইসব সত্যি বেঁচে থাকার কথনবিশ্ব।

এসব লেখনী জারিত চেতনা শুধু দুই মলাটে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এসে মিলে গেছে সেলুলয়েডের পর্দায়। নিজের উপন্যাসেরই নাট্যরূপ দেন হুমায়ূন আহমেদ। 'এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’- বাংলাদেশের টেলিভিশনের জগতে মাইলস্টোন বলা যায়, সেই জনপ্রিয়তা হয়তো আজও বর্তমান। এই সব নাটকের নাকি একটা পর্বও বাদ দেওয়া যায় না। একই রকমের চরিত্র, একই হেঁয়ালিপনায় ডোবা, নির্লিপ্ত সংলাপ—অল্প কথা কিন্তু ছুরির ফলার মতো।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
দুঁদে গোয়েন্দা না বিচারপতি! অভিজিতের নতুন স্ট্র‍্যাটেজি হার মানাবে ফেলুদাকে

Abhijit Gangopadhyay: অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়-ইতিহাস, তাঁর বিচার-বুদ্ধির যাবতীয় তথ্যতালাশের সূচনা পর্বেই ফের উঠে এসেছে, তাঁর একটি রায় এবং পর্যবেক্ষণের সাম্প্রতিক ফলের কথাই।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে রাজাকারের পুনর্বাসনের হিড়িকে ‘তুই রাজাকার’ মুখে মুখে ফেরে। বহু কথা না বলে ছোট্ট দু’টি শব্দ নাটকে পাখির মুখ দিয়ে বলা হয়! নাটক অনেক বেশি টানে, পাঠও বাড়ে। লেখকের প্রতি ভালোবাসা বাড়ে পাঠকের। তাঁর নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ নিয়ে তোলপাড় হয়ে যায় বাংলাদেশ। নাটকের চরিত্র বাকের ভাই, তার ফাঁসি হবে। মুনা কাঁদছে। কিন্তু দেখা গেল কাঁদছে সব দর্শক। বাকের ভাই যতই মস্তান হোক, মিথ্যা কেসে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া যাবে না। রাস্তায় মিছিল নামল, “বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হলে, জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে,” স্লোগানও শোনা যেতে লাগল। আর এভাবেই হয়তো শিল্প মানুষকে সিমপ্যাথি থেকে এমপ্যাথির দিকে এগিয়ে দেয় কয়েক ধাপ। সেই উত্তাল দামাল সময়কে নিজের কলমের পাশাপাশি টিভির পর্দাতেও ফুটিয়ে তোলেন হুমায়ূন আহমেদ। এছাড়াও, তাঁর সৃষ্ট নাটক 'আগুনের পরশমণি', 'শ্যামল ছায়া', 'শ্রাবণ মেঘের দিন', 'দুই দুয়ারী', 'চন্দ্রকথা', 'নয় নম্বর বিপদ সংকেত' ও 'ঘেঁটুপুত্র কমলা' দর্শকমহলে যথেষ্ট প্রশংসা অর্জন করেছে।

হুমায়ূন আহমেদ প্রকৃতই এক শিল্পী, এক রসিক মানুষ। কেবল সেলুলয়েডের জন্য নাটক লেখা নয়, নাটকের জন্য তিনি লিখেছেন গানও, আবার তাতে সুরও দিয়েছেন- যা আজও জনপ্রিয়। ‘যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো’, ‘চাঁদনী পসরে কে’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খীরে’, ‘এক যে ছিল সোনার কন্যা’, ‘আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা বেড়া ভাঙা চালার ফাঁকে’, ‘চাঁদনী পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়’ গান মানুষ আজীবন রেখে দিয়েছেন ভালোবেসে, নিজের প্রাণে।

স্বাভাবিকভাবেই হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও তাঁর পাঠকদের কৌতূহল ছিল শীর্ষে। বিশেষত তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী শাওনকে নিয়ে। মেহের আফরোজ শাওন একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রী ও গায়িকা। ভালোবাসা বয়সের তোয়াক্কা করে না। ২০০৪ সালে সে কথা প্রমাণ করেন শাওন। ২০০৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বিয়ে করেন হ‌ুমায়ূন ও শাওন। তাঁদের রয়েছে দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত। কিন্তু খুব বেশিদিন শাওনের ঘর করা হয়না হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে। দীর্ঘ ১০ মাস ক্যান্সারে ভোগার পরে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় এই লেখক চিরনিদ্রায় শায়িত হন। শিল্পী চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। আর সেখানেই তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি করে বোঝা যায়। তাই প্রতিটা মুহূর্তেই পাঠক হৃদয়ে উদযাপিত হয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অস্তিত্ব।

লিখেছেন
Sanchari Bhowmik
Sanchari Bhowmik
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।