ভেজালের ভিড়ে হাপিস খাঁটি খেজুর গুড়! অবহেলা না কি প্রতিযোগিতার চাপ?

Nalen Gur: প্রতিযোগিতার বাজারে দাম কম রাখতেই কি ভেজাল মেশে গুড়ে?

Kankana Mukherjee
৪ মিনিট
ভেজালের ভিড়ে হাপিস খাঁটি খেজুর গুড়! অবহেলা না কি প্রতিযোগিতার চাপ?

প্রকৃতিতে এখন উত্তুরে হিমেল বাতাস। চারদিকে ছুঁয়েছে শীতের আমেজ। বাংলায় শীত অবশ্য একা আসে না কোনোদিনই, সঙ্গে করে নিয়ে আসে নানান অনুষঙ্গকে। শীতের মরসুম মানেই বাঙালি বাড়িতে সাজো সাজো রব। বিয়ে, ঘুরতে যাওয়া নিদেনপক্ষে পিকনিক, বছরের এ কটা দিন যেন চেটেপুটে উপভোগ করাটাই দস্তুর। আর এসবের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে চলতে থাকে পেটপুজো। শীতের খাবার নিয়ে আলোচনা শুরু হলে, একটা লম্বা ইস্তেহার হবে নিশ্চিত। যদিও সে ইস্তেহারের শুরুতেই জায়গা করে নেবে নলেন গুড়। শীতকালের জন্য বাঙালির সারা বছর হাপিত্যেশ করে থাকার একটা বড় কারণ এই নলেন গুড়। সোনালি রঙের পাতলা গুড়, আহা তার যা স্বাদ, তেমনি সুমধুর গন্ধ! মন হারাতে বাধ্য। মন হারাক ক্ষতি নেই, তবে জ্ঞান হারালে মুশকিল। তাই জেনে নেওয়া দরকার যা কিনছি তা খাঁটি গুড় তো?

রাস্তার একপাশে পরপর সাজানো কয়েকখানা ঝুড়ি। আর তার মধ্যে খবরের কাগজের মোড়কে ঠাসা পাটালি। তা থেকে আসছে মন মাতানো গন্ধ। পথচলতি মানুষের চোখ না পড়ে উপায় কি! কাছে গেলেই অবাক হতে হয়। কোনওটার গায়ে লেখা ৮০ টাকা প্রতি কেজি, কোনওটা ১০০, কোনওটা আবার ২০০ টাকা কেজি। বাজারে আলু অথবা চাল কিনতে গিয়ে হামেশাই এমন বিভিন্ন দামের একই জিনিস নজরে পড়ে ঠিকই, কিন্তু পাটালির ক্ষেত্রে এমন হওয়ার তো কথা নয়। তবে রহস্যটা কী?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নলেনের স্বাদ নোনতা! শেষ পাতে গুড়ের বদলে কেমিক্যাল খাবে বাঙালি?

Nalen Gur: বাঙালি পোস্তর বদলে হিং খাচ্ছে, খাঁটি ঘি নাকি মেলে না বহুদিন, গুড়ের বদলেও কি কেমিক্যাল খেতে হবে?

পঞ্চাশ কেজি খেজুর রসে মাত্র পাঁচ কেজি গুড় হয়। তার দাম কম করে হাজার টাকা হওয়া উচিত। অর্থাৎ কেজি প্রতি দু’শো টাকা। কিন্তু অতো দাম হাঁকলে কিনতে চান না অনেকেই। তাই প্রতিযোগিতার বাজারে দাম কম রাখতেই হয়। ব্যাস, তখনই তাতে ভেজাল মেশে। আর কারচুপির দরজাটা যখন একবার খুলে যায় তাকে আর বাধ দেয় কার সাধ্যি!

আজ বলে নয়, কবি তো কবেই বলে গিয়েছেন, “ভেজাল ভেজাল ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায় / ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিস মিলবে নাকো চেষ্টায়...”। অর্থাৎ এমন একটা সময়ের মধ্যে দিনে দিনে ঢুকে পড়েছি আমরা যেখানে লাভের ফিকির খুঁজতে গিয়ে পা আটকে গিয়েছে অচিরেই। বেরোবার পথ একপ্রকার ভুলতে বসেছি। এ এক অদ্ভুত নেশা। ব্যবসায়ীরা খানিক অর্থ লাভের আশায় অথবা ক্রেতারা খানিক সাশ্রয়ের আশায় ক্রমাগত শান দিচ্ছি ভেজাল অস্ত্রেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খেজুর গাছে ঝুলে আছে ফাঁকা হাঁড়ি, কোথায় গেলেন বাংলার শিউলিরা?

Nalen Gur: এককালে গ্রামবাংলা জুড়ে দেখা যেত গুড় সংগ্রাহক শিউলিদের। তবে এখন তাঁদের অবস্থা কেমন?

নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে কখন যে হেঁশেলেও জাঁকিয়ে বসেছে ভেজাল, তা আর আলাদা করে লক্ষ্য করিনি কেউই। পাটালিও তাই দেদার বিকোচ্ছে ভেজাল রূপেই। আর বাঙালি ভাবছে, যাক টাকা তো বাঁচল, এই ঢের! কিন্তু এ দায় কার? এই যে একটা গোটা প্রজন্ম অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে তা নিয়ে সরকারের বক্তব্যই বা কি? নাকি “এমনটা তো হয়েই থাকে!” বলে দায় ঝেড়ে ফেলাটাই অন্যতম কাজ? গুড় ব্যবসায়ীদের কথায় জানা যায়, এ ব্যবসার খরচ ঢের। প্রথমে লিজে নিতে হয় খেজুর গাছ। তারপর সেই রস ফোটাতে শ্রমিকের বেতন আছে। আছে প্রচুর জ্বালানি খরচও। আবার গুড় তৈরি করে তা বাজারে পাঠানোর খরচও কিছু কম নয়। ফলে লাভ খুঁজতে ভেজালকেই একমাত্র পথ করে নিতে হয় তাদের। তবে সরকারি হস্তক্ষেপ এবং অনুদান থাকলে যে পরিস্থিতি অনেকটাই বদলাতে পারে এমনটাও মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানা যায়, খাঁটি গুড়ে পাটালি হয় না। তাতে অন্তত একটু হলেও খাবার সোডা মেশাতেই হয়। তবে সহজ উপায় হল চিনি মেশানো। বাজারে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় মিহি চিনি। পঞ্চাশ কেজি খেজুর রসে ছ’কেজি পর্যন্ত চিনি মেশানো হয়। তাতে ১১-১২ কেজি গুড় মেলে। সেই গুড় আশি অথবা একশো কুড়ি টাকা দরে বিক্রি করে বিক্রেতারা। কিন্তু এতে হয় অন্য বিপদ, চিনির ঠেলায় গুড়ের গন্ধ তলানিতে, তাই ডাক পড়ে কৃত্রিম এসেন্সের। ব্যাস এখানেই ঘটে যায় বিপত্তি। মেশানো হয় নলেন গুড়ের সুবাসিত গন্ধ-সমৃদ্ধ প্রোপিলিং গ্লাইকল নামে কৃত্রিম রাসায়নিক। এছাড়াও ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে না পড়া পর্যন্ত নলেন গুড় বাজারে আসে না। অথচ দোকানে সারা বছরই মিলছে পাটালি। চাহিদাও থাকছে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে ভেজাল গুড়ের কারবার। বাজার ছেয়ে গিয়েছে হাইড্রোজ, ফটকিরি, ক্যালশিয়াম-বাই-কার্বনেট ইত্যাদি সহযোগে তৈরি পাটালিতে।

এই পরিস্থিতিতে কীভাবে আসল নলেন গুড় চিনবেন জেনে নিন…

গন্ধ শুঁকে নয়, পাটালি চিনতে হবে হাতে নিয়ে পরখ করেই। খেঁজুর গুড়ের পাটালি কিছুদিন বাড়িতে রেখে দিলে তার গায়ে যদি সাদা সাদা দাগ দেখা যায়, বুঝতে হবে নিশ্চিত চিনি মেশানো রয়েছে। কেউ কেউ অবশ্য খেজুর গুড়ের পাটালি মুখে দিয়ে আসল নকলের ফারাক সহজেই ধরতে পারেন। আর যারা পারেন না, তারা আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে দেখে নিতে পারেন। গুঁড়ো হয়ে গেলেই বুঝবেন জিনিস খাঁটি। এছাড়াও কেনার আগে একটু ভেঙে মুখে দিয়েও পরখ করা যায়। স্বাদ নোনতা হলে বুঝতে হবে এতে ফটকিরি মেশানো আছে। তৎক্ষণাৎ বাতিল সে পাটালি। আর সবশেষে যে কথাটা না বললেই নয় তা হল, নভেম্বর মাসের শেষ থেকে মার্চ মাসের গোড়া পর্যন্ত ভালো নলেন গুড় বাজারে আসে। তাই এই সময়ের আগে বা পরে গুড় বা পাটালি না কেনাই ভালো।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।