সহজেই লোনের প্রলোভন! এই অ্যাপগুলি হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুফাঁদ
এই অ্যাপগুলি আপনার জীবনে ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরতে পারে। তাই সাবধান থাকা খুব জরুরি।

মাস শুরু হতেই চিন্তা, এখানে এত ইএমআই কাটবে, সংসারে এত খরচ হবে! এই করতে গিয়ে মাসের মাঝেই আয়ের টাকা শেষ। কিন্তু বাকি মাস চলবে কীভাবে? এই সমস্যা থেকে বাঁচতে আজকাল অনেকেই ফোনের বিভিন্ন অ্যাপ থেকে টাকা ধার নিয়ে থাকেন। কিন্তু আপনি নিজেও জানেন না, এই অ্যাপগুলি আপনার জীবনে ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরতে পারে। তাই সাবধান থাকা খুব জরুরি। আর্লি স্যালারি, ওয়ান ক্যাশ, মানি ট্যাপ, নিরো ইত্যাদি অ্যাপগুলি আপনার সমস্যার সহজ উত্তর হলেও ফলাফল মারাত্মক।
প্লে স্টোর থেকে এই অ্যাপগুলি ডাউনলোড করার সঙ্গে সঙ্গে আপনার ফোনের অ্যাকসেস চেয়ে নেয় তারা। ফলে ফোনের ছবি, সেভ করা মোবাইল নম্বর সবই তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসে। এরপর আধার ও প্যান নম্বর, বাড়ির ঠিকানা এবং লোনের পরিমাণ জেনে আপনার অ্যাকাউন্টে মুহূর্তের মধ্যে ক্রেডিট হয়ে যায় সেই টাকা। কিন্তু এই ইনস্ট্যান্ট লোন অ্যাপের সঙ্গে আপনার অজান্তেই অনেক অজানা ফাইল ফোনে এসে পড়ে।
চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল হায়দরাবাদের এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। কারণ? তিনি এই লোন অ্যাপ থেকে ১২ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন, যার মধ্যে ৪০০০ টাকা তিনি শোধও করে দেন। কিন্তু বাকি টাকা মেটানোর জন্য কোম্পানিগুলির তরফে তাঁর বন্ধুবান্ধব পরিবারকে ফোন করে অপমান ও হেনস্থা করা হয়। একবার ভেবে দেখুন, আপনার আত্মীয়-পরিজনের কাছে হঠাৎ আপনার অজান্তেই ফোন যাচ্ছে আপনার নেওয়া ঋণ শোধের জন্য। ফলস্বরূপ অপমানে যুবকটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
ইনস্ট্যান্ট লোন অ্যাপের কারণে এই প্রথম কোনও মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তেমন নয়। এর আগেও অতিমারী চলাকালীন একাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছিল। যার নেপথ্যে ছিল এই লোনদানকারী অ্যাপ। কিছু ক্ষেত্রে আবার এই অ্যাপের গ্রাহকরা সম্পূর্ণ টাকা শোধ করার পরেও হয়রানির শিকার হন। এমনকী ফোনের গ্যালারিতে থাকা ছবিকে বিকৃত করে অনেক মানুষকে বিপদে ফেলেছে এই কোম্পানিগুলি। তাই ইনস্ট্যান্ট লোন অ্যাপ ব্যবহার করার আগে যে বিষয়গুলি মাথায় রাখা অত্যন্ত জরুরি:
১. চড়া সুদের হার
লোন অ্যাপগুলির প্রত্যেকটির সুদের হার অন্যদের থেকে আলাদা। প্রতি মাসের হিসেবে ওই নির্দিষ্ট হারে সুদ গণনা করা হয়। এমনকী, যদি আপনি কিছু সপ্তাহের জন্য টাকা ধার নেন, সেক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহের বিচারে সুদের পরিমাণ ঠিক করা হয়। আর এই সুদের হার ব্যাঙ্কের তুলনায় বহু গুণ বেশি। লোন অ্যাপগুলির সুদের হার ১২-৩৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে।
তাহলে ধরুন, কোনও ব্যক্তি যদি ৫০০০ টাকা ১২% সুদের হারে ধার নেন, তাহলে তাঁকে ৫৬০০ টাকা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু যদি সুদের হার ৩৬% হয়, তবে সময়ের মধ্যে তিনি ৬৮০০ টাকা ফেরত দেবেন।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আর অপেক্ষা করবেন না, চটপট কিছুটা পুঁজি জোগাড় করে নিয়ে নেমে পড়ুন পেপার ব্যাগ তৈরির ব্যবসায় এবং কয়েক মাসের মধ্যেই হয়ে যান লাখপতি।
২. প্রসেসিং ফি এবং জরিমানা
লোন অ্যাপগুলি মাত্রাতিরিক্ত প্রসেসিং ফি এবং জরিমানা নেওয়ার জন্যও কুখ্যাত। দেখা গেছে, কিছু অ্যাপ তাদের গ্রাহকদের ৬০০০ টাকা লোন দিয়ে ২০০০ টাকার ওপর প্রসেসিং ফি নিয়েছে। ফলে যে পরিমাণ টাকা আপনি ধার করলেন, তার থেকে অনেক বেশি শোধ করতে হবে আপনাকে। আবার সময়ের মধ্যে টাকা শোধ করতে না পারলেও প্রতিদিন বিশাল পরিমাণে জরিমানাও আদায় করা হয় লোন গ্রহণকারীর থেকে।
৩. আপনার ফোনের গ্যালারি এবং ফোন নম্বরের অ্যাকসেস
একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন এক্ষেত্রে। একজন ব্যক্তি, যিনি কখনওই এমন লোন অ্যাপের থেকে টাকা ধার করেননি, একবার তাঁর কাছে ফোন এসেছিল টাকা শোধ করার জন্য। পুলিশ তদন্ত করে জানতে পারেন, অভিযোগকারীর প্রতিবেশী লোন অ্যাপ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন এবং তাঁর ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট থেকেই এই নম্বর পেয়েছে লোন অ্যাপ কোম্পানিটি।
আরও একটা ঘটনায় দেখা গেছে, একজন মহিলাকে তাঁর ছবি বিকৃত করে হুমকি দেওয়া হয় লোন শোধের জন্য। কিন্তু আসলে তিনি নন, লোন নিয়েছিলেন তাঁর সহকর্মী।
এই ধরনের লোন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের ফোনের গ্যালারিতে থাকা ছবি এবং কনট্যাক্ট লিস্টের নম্বর কোম্পানিগুলি নানাভাবে হেনস্থার জন্য ব্যবহার করেন। এমনকী, ছবিগুলিকে অশ্লীলভাবে এডিট করে আপনার চেনাজানা মানুষদের কাছে ছড়িয়েও আপনাকে বদনাম পর্যন্ত করতে পারে।
৪. অবৈধ জুলুম
আপনি ধার করা অর্থ শোধ করার পরেও আপনাকে নানা ধরনের জুলুমের মুখোমুখি হতে হবে। তাই ভাববেন না যে, ঠিক সময় টাকা শোধ করতে পারলেই চিন্তা নেই। কিছু ক্ষেত্রে ধরা পড়েছে, লোন শোধ করার পরেও অ্যাপে তা দেখাচ্ছে না। কিংবা বড় আকারের অর্থ চেয়ে বসে অনেক সময় এই অ্যাপগুলি। এমনও দেখা গেছে যে, অ্যাপ ডাউনলোড করেও তিনি কোনও টাকা ধার নেননি। সেক্ষেত্রেও ব্যক্তি হেনস্থার স্বীকার হয়েছেন, কারণ তিনি অজান্তেই ডাউনলোডের সময় ফোনের অ্যাকসেস দিয়েছিলেন কোম্পানিকে।
৫. প্রলোভন
লোন অ্যাপগুলি আপনার ডেটা অন্যান্য আরও এমন লোন কোম্পানিকে বেচে দেয়। এই কোম্পানিগুলি আপনাকে ফোন করে আরও লোন নেওয়ার জন্য মিষ্টি কথায় ফাঁসিয়ে ফেলে। ফলে মানুষ কিছুতেই এই লোন বা ঋণের চক্রব্যুহ থেকে বেরতেই পারেন না।
কী করণীয় আপনার ?
লোনদানকারী কী উপায়ে গ্রাহকের থেকে টাকা আদায় করবেন, তার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই নিয়ম মানা হয় না। তাই হেনস্থার শিকার হলে অবশ্যই পুলিশের কাছে সাহায্যর জন্য যান। এছাড়া রিজার্ভ ব্যাঙ্কের 'সচেত' সাইটে গিয়েও অভিযোগ করতে পারেন।
তবে সবথেকে ভালো এই ধরনের অ্যাপগুলি এড়িয়ে চলা। যদি একান্তই উপায় না থাকে, তবে অ্যাপ ডাউনলোড করার আগে প্লে স্টোরে অ্যাপ সম্পর্কে অন্যদের মতামত জেনে নিন। দেখে নিন, যে ব্যাঙ্কের সঙ্গে অ্যাপটি যুক্ত, তা আরবিআইয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত কি না। সম্প্রতি আরবিআই ঘোষণা করেছে, ৬০০টি লোনদানকারী অ্যাপ ভারতে অবৈধভাবে ব্যবসা করছে এবং এর মধ্যে ২৭টি অ্যাপকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে তারা। তাই টাকা ধার নেওয়ার আগে যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে তবেই এগোন।
















