তুলোর হৃদয় শুকনো ফুলের প্রেমদিবস কি বাঙালিয়ানা?

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
তুলোর হৃদয় শুকনো ফুলের প্রেমদিবস কি বাঙালিয়ানা?

গীতগোবিন্দের কথা মনে আছে তো? জয়দেব লিখছেন, ত্বমসি মম ভূষণং ত্বমসি মম জীবনং ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম; অর্থাৎ তুমিই আমার ভূষণ, তুমি আমার জীবন, এই জীবন সমুদ্রে তুমিই আমার রত্ন। তাই রত্নটি অর্থাৎ কিনা আসমুদ্র হিমাচলের প্রাচীনতম লাভারবয়টি নিজেও কিছু কম যান না। বাংলার কবিরা সুযোগ পেয়ে তাঁকে দিয়েও বলিয়ে নিয়েছেন অমোঘ প্রেমের কাব্য।

যব গোধূলি সময় বেলি

ধনি মন্দির বাহির ভেলি।

নবজলধর বিজুরি রেহা

দন্দ পসারি গেলি।।

মোটামুটি ভাবে এই ধরতাই থেকে যদি ‘বাংলা প্রেমের’ গল্প শুরু হয় তবে তার পর থেকে এই কৃষ্ণ এই রাধাই হাজার হাজার রুপে, হাজার হাজার বুলিতে যুগান্তের অবসানের পর ও গেয়ে চলেছেন প্রেমের গান। প্রাচীন কবি বিদ্যাপতি থেকে ঝাঁকড়া চুলো যাকে বলে সকলেরই তনু জরজর। মাঝে মাঝে মনে হয় রাধাকৃষ্ণ মোটিফে শুধুমাত্র প্রেমিক মনের রূপকল্পেরই সমাবেশ। যে সম্পর্কের ভার নেই, লালিত্য আছে অথবা যে ছেড়ে যাওয়ার গুরুভারে এক বেণী বেঁধে বিরহিণী হওয়া যায় সেই প্রাচীনতম নেশার এ সকলি অছিলা। সত্যি কথা বলতে, এই যুগল আদল খুঁজে একটা প্রেম পরিণয় বিবাহের ধুন্ধুমার লাগিয়ে দেওয়া বাঙালির সনাতন অভ্যাস। তা নইলে অত বড় যে শিব ঠাকুর তার বউ কিনা অপরের কাছে ঠাট্টার ছলে বলেন, ‘কোনও গুণ নাই তার কপালে আগুন’। যেন চিরকালীন বাঙালি বউ পড়শিনির কাছে স্বামী নিন্দার ছলে আদতে প্রশংসাই করতে বেরিয়েছেন।শুধু প্রেমের দৃশ্যায়ন দেখতে চাওয়ার ইচ্ছেয় বাংলার কবিরা প্রেমকে জাগতিক থেকে সাংসারিক করে সামগ্রিকের আলপনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার এই চির সনাতন রোম্যান্টিক আবহ থেকে বাংলার প্রেমের কবিতার দ্বিধা থরথর সাতটি কথার চূড়ে যে অমরাবতী ভর করেছিল হতচ্ছাড়া ক্যাডবেরি কোম্পানি তো সেই গল্প জানে না। জানে তো নাই, উপরন্তু গলা ফুলিয়ে তাঁরা তাদের গল্পই কেবল চকোলেটের সঙ্গে খাওয়াতে চায়। এদিকে আমরাও ভারী মজার মানুষ। সদাসর্বদাই যেন আমাদের পাচন গেলানো পিসিমা চাই। ওনার কথাতেই ওষুধ গিলি। যেমন ফুল কিনি আজকের দিনে। পশ্চিমই দুনিয়াই আমাদের সেই পাচন গেলানো পিসিমা। আমরা সোনামুখ করে তুলোর হৃদয় আর মরা ফুল কিনে দিনযাপন করি। ৯০ এর দশকে যখন ভারতে গ্লোবালাইজেশনের দোলা লাগল। ভারতীয় বাজার উন্মুক্ত হল বিদেশের কাছে। নিউ ইয়ারে কার্ড আর জন্মদিনে ক্যাডবেরির সেই শুরু। প্রেমের পণ্যায়নের প্রক্রিয়ায় এল উৎসব। ‘ভ্যালেন্টইন্স ডে’ মানেই হল ভালবাসার দিন। যে বাঙালি কবি রাতের চাঁদ দেখে প্রেমিকাকে চিঠি লিখত তার বদলে এল এসএমএস।

কিন্তু এই যে সংস্কৃতির মধ্যে জাঁকিয়ে বসল পশ্চিমী আচার, তার মধ্যে হৃদয়ের অস্তিত্ব ফিকে হতে হতে আজ বিপন্নপ্রায়। ক্যাপিটালিজমের নেশায় চে খোদাই হলেন কাপের গায়ে, টি শার্টের ওপর। এক প্রকাণ্ড অজগরের ছাগল গিলে ফেলার মত করে পশ্চিমের সংস্কৃতি গ্রাস করে নিল আমাদের সব। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতই ‘আমাদের সব দরকার। আমরা ঘরবাড়ি গড়বো’। কিন্তু ‘সভ্যতার স্থায়ী স্তম্ভ’ তুলে ধরতে গিয়ে ভালবাসা, আকুতি, হৃদয় সব কোথায় যেন রুপোলী মাছের মত হারিয়ে গেল।

তাই আমাদের কাছে ভ্যালেন্টাইন্স ডে-ই হল প্রেমের উদযাপনের দিন। যে বাঙালির জয়দেব- বিদ্যাপতি- শক্তি- উৎপলের প্রেমকাব্য পড়ে এককালে ভালবাসার মিনার গড়েছিল তারাই এখন কার্ড, শুকনো ফুল, আর টেডি-বেয়ারের মধ্যে ভালবাসাকে খুঁজে নেওয়ার দৌড়ে ধুঁকছে।

আশার কথা এই যে কোনও বিদেশি তত্ত্বই ভারতে এসে স্বধর্ম হারায়। বহুক্ষেত্রেই শিব গড়তে বাঁদর হলেও চমকে দেওয়ার মত ঘটনা আছে ভুরিভুরি। শতাব্দী পেরিয়ে ও তাই ঔৎসুক্য কমল না, দেখতে চায় বাঙালি, এ রঙ্গ কতদূর এগোয়। ভালবাসার বিনিময়ে প্রতিশ্রুতি নাকি ভালবাসা মানেই আর্চিস গ্যালারি, জিতছে কে? বাছাই পর্ব শেষ হল কী?

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।