'সাবানের বিজ্ঞাপনে নগ্ন হতে পারো, আমার ছবিতে পারবে না!' নায়িকাকে বলেছিলেন গোদার

Jean-Luc Godard: জঁ লুক গোদারের জীবন কম নাটকীয় নয়।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
'সাবানের বিজ্ঞাপনে নগ্ন হতে পারো, আমার ছবিতে পারবে না!' নায়িকাকে বলেছিলেন গোদার

তিনি আধুনিক সিনেমার রাজপুত্র। ফরাসি নবতরঙ্গর নায়ক। ১৩ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন জঁ লুক গোদার। সুইজ্যারল্যান্ডে নিজের বাসভবনে অ্যাসিস্টেড সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গোদার। এ যেন এক অদ্ভুত সমাপতন! নিজের সিনেমা কেরিয়ারে গোদার চিরকাল ব্যাকরণ ভেঙেছেন। কলম ও ক্যামেরাকে মিলিয়ে দিয়েছেন নিজের ক্যারিশমায়। জীবনের প্রান্তবেলায় এসেও ব্যতিক্রম হিসেবে থেকে গেলেন গোদার। তাঁর মৃত্যু যেন তাঁরই নিজের পরিচালনা করা কোনও সিনেমার দৃশ্যের মতো আকস্মিক একটা জাম্প কাট।

গোদার ও আনা কারিনা

গোদারের সিনেমার মতোই নাটকীয় তাঁর জীবন। বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতে গিয়েই তাঁর আলাপ আনা কারিনার সঙ্গে। আলাপ হওয়ার পরে একদিন গোদার আনা কারিনাকে তাঁর সিনেমায় অভিনয় করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। গোদারের শর্ত ছিল, দৃশ্যের প্রয়োজনে নগ্ন হতে হবে আনা কারিনাকে। সেই শর্ত শুনে গোদারের প্রস্তাব নাকচ করে দেন আনা কারিনা। পরবর্তীকালে এক ইন্টারভিউতে আনা কারিনা বলছেন, জেদি গোদার সেদিন শ্লেষের সঙ্গেই আমাকে বলেছিলেন, 'সাবান কোম্পানির বিজ্ঞাপনে নগ্ন হতে পারবে, আর আমার ছবির ক্ষেত্রে পারবে না!'

জঁ লুক গোদার ও আনা কারিনা

এরপর সেই আনা কারিনা-ই হয়ে উঠবেন ফরাসি নবতরঙ্গর নতুন আবিষ্কার। আনা কারিনা পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'আমি যখন গোদারের সঙ্গে থাকতে শুরু করি, মাঝে মধ্যেই এমন হতো উনি সিগারেট কিনতে যাবেন বলে বেরোলেন, তারপর তিন সপ্তাহ হলো ফিরলেন না। এই তিন সপ্তাহে উনি হয়তো আমেরিকায় গিয়ে উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে দেখা করে এলেন বা বার্গম্যানের সঙ্গে দেখা করে এলেন।'

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সিনেমা বানাতে লাগে কেবল মহিলা এবং বন্দুক, কেন একথা বলেছিলেন জঁ লুক গোদার

Jean-Luc Goddard: কখনও আপস করেননি নিজের সিনেমা-দর্শনের সঙ্গে।

১৯৬৮-র ফ্রান্স

১৯৬৮ সালের মে মাসে ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল প্যারিস। শহরের চারদিকে দাঙ্গা, অশান্তি। ছাত্রদের দাবি, প্যারিসের ডানপন্থী সরকারের পতন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে হবে সমাজতন্ত্র। ছাত্রদের পাশে দাঁড়ালেন গোদার। মে মাসেই হওয়ার কথা কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। ওই অস্থির সময়ে ফেস্টিভ্যাল বাতিল করার দাবি তুললেন গোদার, ত্রুফো, ক্লদ শ্যব্রোল-সহ একাধিক পরিচালক। সেই বছর ফেস্টিভ্যাল শুরু হওয়ার কথা ১০ মে। প্রথম থেকেই গোদার এবং ত্রুফো অনড়। যে-কোনও মূল্যেই এই অশান্ত সময়ে বন্ধ করতেই হবে কান চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসব বন্ধ করার ডাক দিলেও তাতে মাথা নোয়ায়নি কান কর্তৃপক্ষ। সেইবার কান চলচ্চিত্র উৎসবে অন্যতম প্রধান অতিথি রোমান পোলানস্কি। ইতিমধ্যেই গোদার, ত্রুফো এবং ক্লদ লেলুচ- তিনজনে মিলে ফেস্টিভ্যালের মধ্য থেকেই ফেস্টিভ্যাল লন্ডভন্ড করার পরিকল্পনা করেছেন। এরকমই এক তর্কাতর্কির মাঝে মেজাজ হারিয়ে গোদার ফেস্টিভ্যালের মধ্যে দাঁড়িয়েই ঘোষণা করলেন, 'আমরা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলছি আর আপনারা এখানে সিনেমায় কোন শট কীভাবে তোলা হয়, তাই নিয়ে আলোচনা করছেন!'

কান চলচ্চিত্র উৎসবে জঁ লুক গোদার

কার্লোস সুয়েরা-র 'পিপারমিন্ট ফ্র‍্যাপ' ছবির স্ক্রিনিং চলাকালীন ফেস্টিভ্যাল বন্ধ করতে মরিয়া গোদার ও ত্রুফো স্ক্রিনের পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন। সেই বছর ফেস্টিভ্যাল শেষ হওয়ার পাঁচ দিন আগেই ফেস্টিভ্যাল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন কর্তৃপক্ষ। পরের বছর থেকে কান চলচ্চিত্র উৎসবে নতুন একটি বিভাগ সংযুক্ত হয়। সেখানে বিপ্লবী ভাবনার ছবিকে স্ক্রিনিং-এর সুযোগ দেওয়া হয়।

'হেইল মেরি' ও গোদার

১৯৮৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত জঁ লুক গোদারের 'হেইল মেরি' ছবিটি নিয়েও খ্রিস্টধর্ম বিশ্বাসীদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। 'হেইল মেরি' ছবিতে মাতা মেরিকে এক ছাত্রী এবং বাস্কেটবলপ্রেমী হিসেবে দেখান গোদার। তাঁর প্রেমিক হয় কলেজ ড্রপআউট। মেরি এবং তাঁর প্রেমিকের যৌন সম্পর্কই হয়ে ওঠে এই ছবির মূল রাজনীতি।

'হেইল মেরি' ছবির দৃশ্য

এই ছবির জন্য গোদারের সমালোচনায় মুখর হন স্বয়ং পোপ দ্বিতীয় জন পল। সারা পৃথিবীর খ্রিস্টধর্মবিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে গোদারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সমালোচনার ঝড় ওঠে।

অস্কার ফিরিয়ে দেওয়া

২০১০ সালে গোদার-কে সাম্মানিক অস্কারে মনোনীত করে অস্কার কর্তৃপক্ষ। গোদার-কে বলা হয়, আমেরিকায় গিয়ে তাঁকে গ্রহণ করতে হবে সাম্মানিক অস্কার। চিরজীবন আমেরিকার শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো গোদার প্রত্যাখ্যান করেন অস্কার। সেই প্রসঙ্গে পরে গোদার বলেছিলেন, 'এই বয়সে এতদূর গিয়ে অস্কার নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া আমার অস্কারে কিছু যায় আসে না।'

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?