সাধক কমলাকান্ত থেকে ভবা পাগলা– এখানে আসতেই হবে কালীভক্তদের

Rupa Mitra
৪ মিনিট
সাধক কমলাকান্ত থেকে ভবা পাগলা– এখানে আসতেই হবে কালীভক্তদের

কালী-ক্ষেত্র কালনার কালী মাহাত্ম্য দেখে নেওয়া যাক এক ঝলকে!

কালনার মেজকালী: নদিয়া জেলার ফুলিয়া থেকে সাহা পরিবার ব্যাবসার জন্য কালনায় আসার কিছু কাল পরেই কালনায় ‘মেজকালী’-র পূজা প্রচলিত হয়। কিন্তু ঠিক কবে থেকে শুরু হয়, তার সঠিক সন-তারিখ জানা

যায় না।এখানে ভুত চতুর্দশীর দিন দেবী মাতার চক্ষুদান হয় এবং তারপর দেবী পাটায় ওঠেন। ওইদিন কালনাবাসী মন্দির চত্বরে উপস্থিত হন। আগে বংশপরম্পরায় পুরোহিতরা পুজো করতেন, এখন নিয়মের কিছু রদবদল হয়েছে। কথিত আছে, দেবীর জন্য বলিপ্রদত্ত পাঁঠা একবার দড়ি খুলে চলে যায়, তারপর থেকে 'বলি' বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৫৪-’৫৫ সালে দেবীর মন্দির সংস্কার করা হয়।

সেজকালী: উনিশ শতকের প্রথমদিকে কালনায় আসেন নফরচন্দ্র কুন্ডু। এখানে এসে তিনি মায়ের পূজারম্ভ করেন। এই দেবী কালনার ‘সেজকালী’ নামে পরিচিত।ঘোর কৃষ্ণবর্ণা দেবীমূর্তি। রূপের ছটায় চতুর্দিক আলোকিত হয়ে ওঠে। ঐতিহ্য মেনে এখনও বংশানুক্রমিকভাবে বাঘনাপাড়ার 'পাল' পরিবার মায়ের মূর্তি গড়েন। নিয়মানুযায়ী, দেবী ছ'পোয়া। বর্তমানে এলাকাবাসী ও অন্যান্যদের সহযোগিতায় এই পূজা সম্পন্ন হয়ে চলেছে। পূর্বে নিশিরাতে এই পূজার প্রচলন ছিল, বর্তমানে তার পরিবর্তন ঘটেছে।

আনন্দময়ী মাতার মন্দির: বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচাঁদ রায় আনুমানিক ১৭৩২-’৩৪ সালের মধ্যে মা আনন্দময়ীর মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় তিনশো বছরের পুরনো এই পূজা মূলত রাজকর্মচারী,যাঁরা ছিলেন শাক্ত মন্ত্রে দীক্ষিত, অনুমেয়– তাঁদের জন্যই প্রচলিত হয়েছিল। রাজবাড়ি–সংলগ্ন চকবাজার এলাকায় এই পূজা হয়। এখনও রাজবাড়ির পুরোহিতেরাই এই পূজা করেন।

সত্যনাথ কালীবাড়ি: যোগীপাড়ার সত্যনাথ কালীবাড়ি একটি মহাপুণ্যস্থান। এই সত্যনাথ প্রথম কালনায় ১৩২৬ সনে দু’টি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তারপর তাঁর বসতভিটেয় তৈরি করেন দক্ষিণেশ্বরী কালী মন্দির, সেনপাড়ার সেনদের কাছ থেকে বেশ খানিকটা মহল্লা কিনে নেন এবং নাম দেন যোগীপাড়া। এই কালীমাতা দশমহাবিদ্যার অন্যতমা এবং শনিদেবের আরাধ্যা। সত্যনাথের জীবন ছিল দুঃখ-যন্ত্রণায় ভরা। কিন্তু তবুও তিনি মাতৃ-আরাধনায় বিরত থাকতেন না। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন, এরপর থেকে নানাভাবে তাঁর জীবনে বিপর্যয়ের শেষ ছিল না।কন্যাসন্তানের অকালমৃত্যু, দোকান লুঠ হওয়া, দারিদ্র– নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।এর মাঝেই কালীমাতার দৈব আদেশ পান। মাতার আদেশে তিনি হন একাধারে সাধক,পূজারী ও সেবাইত। ইংরেজি ১৯০৭ সালে তিনি মায়ের মন্দির ও নহবতখানা তৈরি করেন। এখনও মাতা এখানে নিত্যপূজা পেয়ে চলেছেন এবং মহাসমারোহে কালীপুজোর রাত্রে নিয়মবিধি মেনে পূজা সমাধা হয়।

বর্মনবাড়ির কালী: কালনার বর্ম্মনবাড়ির কালীপূজা প্রায় চারশো বছরের পুরনো।গভীর জঙ্গলের মাঝে এই মাতৃমূর্তিটি প্রয়াত সত্যচরণ বর্মন উদ্ধার করেন এবং মাতৃ-আরাধনা শুরু করেন। প্রত্যেক বছর পূর্বনিয়মানুযায়ী দুর্গাপূজার দশমীর দিন পাটা পুজো করা হয়। এরপর একমেটে, দোমেটে,খড়িমাটি ও রং– এই চার পর্বে মাতৃমূর্তির নির্মাণ চলে। সত্যচরন বর্মন ছিলেন বিত্তবান মানুষ, তাই মায়ের জন্য আসবাবপত্র ও স্বর্ণালংকারের কোনও খামতি রাখেননি। নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি তাঁর দুই কন্যাকে পুজোর দায়িত্ব অর্পন করে যান। বংশানুক্রমিকভাবে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।মা এখানে শোলার সাজে ও স্বর্ণালংকারে ভূষিতা থাকেন। এই পুজোয় পাঁঠাবলির প্রচলন লক্ষ করা যায়।

সাধক কমলাকান্তের কালী: কালনার রীতিমতো প্রসিদ্ধ একটি স্থান হলো বিদ্যাবাগীশ পাড়ার সাধক কমলাকান্তের ভিটে। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই বিদ্যাবাগীশ পাড়াতেই জন্মগ্রহণ করেন। অত্যন্ত মেধাবী, বিদ্যান এবং

বুদ্ধিমান ছিলেন কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। ঈশ্বরমুখী সন্তানকে সংসারমুখী করে তোলার জন্য অল্প বয়সে তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু মনপ্রাণ যার মায়ের পদপ্রান্তে নিবেদিত, সে কী করে সংসারী হবে!তিনি মহারাজা তেজশ্চন্দ্র বাহাদুরের গুরু ও সভাকবি ছিলেন। মহারাজের দান করা ভূমিটির ওপর এই মাতৃমন্দির বিরাজমান। বর্ধমানের বিশালাক্ষী মন্দিরে মহারাজের সঙ্গে কমলাকান্ত ভট্টাচার্যর সাক্ষাৎ ঘটে। শ্যামাসংগীতের অন্যতম কবি ছিলেন তিনি। শাক্ত পদাবলী ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কমলাকান্ত। কবি রামপ্রসাদ সেনের পরেই এঁর স্থান। তাঁর ধর্মচেতনা, তাঁর তন্ত্রসাধনা, তাঁর ভক্তিগীতি এবং বর্ধমানের রাজপরিবারে তাঁর প্রতিপত্তি তাঁকে ভারতের অন্যতম সাধকরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কালনার এই কৃতী সন্তান কালনাকে সুবিখ্যাত করে তুলেছেন। তাঁর লেখা অজস্র ভক্তিগীতির ভাণ্ডার রয়েছে। তাঁর লেখা ‘সদানন্দময়ী কালী’ ঘরে ঘরে সমাদৃত। কালনার এই কৃতী পুরুষ ১৮২১ সালে মাতৃচরণে ঠাঁই নেন।

যোগানন্দের কালীমাতা: স্বামী যোগানন্দ মুলত উত্তরপ্রদেশের মানুষ। ধর্মসাধনার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি কালনায় এসেছিলেন। আর ফিরে যাননি। ১৯২৪ সালে যোগানন্দ তাঁর মাতৃমন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। যোগানন্দ যেখানে বাস করতেন, সেখানেই এই মন্দির স্থাপন করেন। তিনি নিজ বাসগৃহটিকে ‘ঝুপড়ি’ বলতেন। তাই তাঁর বাসভবনটি 'যোগানন্দের ঝুপড়ি' নামেই পরিচিত। তিনি কখনও কাউকে দীক্ষা দিতেন না, বলতেন মায়ের প্রতি ভালবাসা ও ভক্তিই হলো আসল দীক্ষা।

সিদ্ধান্ত কালীবাড়ি: বর্ধমানের রাজা তিলকচাঁদের আমলে, ১৭৪৪ থেকে ১৭৭১– এই সময়েই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। কালনার একটি সুবিখ্যাত কালীবাড়ি এটি, এখানে রয়েছে দেবীর পঞ্চমুন্ডির আসন। এই আসনে বসে অম্বরীশ মুনি না কমলাকান্ত ভট্টাচার্য– কে সিদ্ধিলাভ করেছেন, তা নিয়ে যথেষ্ট মতান্তর রয়েছে। কিন্তু নিঃসন্দেহে 'সিদ্ধিলাভ' থেকেই 'সিদ্ধান্ত কালীবাড়ি' নামকরণ হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী দেবীপুজোর সময় কোনও ঢাক বাজে না, দেবীর দৈবাদেশে ঢাক বাজানো নিষিদ্ধ।রামরাম তর্কসিদ্ধান্ত পরিবারের দ্বারা পূজিতা দেবী বর্তমানে ব্যানার্জি পরিবারের দ্বারা পূজিতা হন।

ভবার ভবানী: ভবা পাগলার আসল নাম ছিল ভবেন্দ্রমোহন। তিনি ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আসেন।

বাংলাদেশ এবং ভারতে মোট সাতটি মাতৃমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে পড়াশোনায় ইতি টানেন, কিন্তু অগাধ জ্ঞানভাণ্ডার ছিল তাঁর। কালনার পুরনো হাসপাতালের কাছে একটি জমি কিনে তিনি তাঁর মাতৃমন্দিরটি স্থাপন করেন। তিনি যেখানেই যেতেন, সঙ্গে করে কষ্টিপাথরে গড়া মায়ের মূর্তিটি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তিনি জাতপাত-ধর্মের বিভেদ মানতেন না। তাঁর বাণী ছিল, “মায়ের কাছে সবাই সমান, কিবা হিন্দু, কি মুসলমান।” তিনি বলতেন, “যারা ছোঁয়াছুঁয়ির ধার ধারে না, তারাই ভবার গৌরসুন্দর।” প্রসঙ্গত, বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আশ্রমে গেলেই মায়ের প্রসাদ হিসেবে 'লজেন্স' দেওয়া হয়। জনশ্রুতি আছে, মন্দিরের দরজা বন্ধ করে ভবাপাগলা তাঁর ভবানী মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন। ১৯৮৪ সালে মাতৃচরণে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন।

কালনাকে যেমন বলা যায় মন্দির শহর, ঠিক তেমনই কালী-ক্ষেত্র কালনা বললেও অত্যুক্তি হবে না।

[তথ্যসূত্র: কালনার জনশ্রুতি, ইউটিউব চ্যানেল ‘Memacts’ (অঙ্কিতা রায়চৌধুরী ও হিমাংশু দত্ত‌‌‌-কর্তৃক আলোচিত)]

লিখেছেন
Rupa Mitra
Rupa Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।