বিতর্কের মুখে 'ভূত কোলা'! রহস্যময় লোকসংস্কৃতিতে লুকিয়ে বিচিত্র কোন প্রথা?

Kantara Bhoot Kola: টুলুতে, ‘ভূত’ শব্দের অর্থ ‘সৃষ্টিকর্তা’। কোলা শব্দের অর্থ ‘পারফরমেন্স’ যা সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে। এই উপাসনায় স্থানীয় দেবতাদের পুজো করার মাধ্যমে নিজেদের ভূমি রক্ষা করা হয়।

Shibani
৩ মিনিট
বিতর্কের মুখে 'ভূত কোলা'! রহস্যময় লোকসংস্কৃতিতে লুকিয়ে বিচিত্র কোন প্রথা?

বক্স অফিস হিট করলেও বিতর্ক যে থেমে থাকে না তা সিনেমাপ্রেমীরা খুব ভালো মতোই জানেন। ঋষভ শেঠি পরিচালিত কান্তারার ক্ষেত্রেও এই ঘটনার অন্যথা হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর সিনেমা মুক্তির পর থেকেই শুরু হয় টালমাটাল। এমনিতেও, ভারতীয় চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে বসলে এখন সামনে সারিতে সদর্পে থাকে দক্ষিণ ভারতের একাধিক দুর্ধর্ষ কাজ। কান্তারা চলচ্চিত্রে কর্ণাটকের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। ১৮৪৭ সালের একটি গল্পে কর্ণাটকের একটি আঞ্চলিক গ্রামকে দেখানো হয় এবং একটু একটু করে সেই গ্রামকে ঘিরে মানুষের অনুভূতি এবং গ্রামের ঐতিহ্যের গল্প বলে এই সিনেমা।

কর্ণাটকেরই লোকসংস্কৃতির এক ঐতিহ্য ‘ভূত কোলা’। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু মূলত এই অনুষ্ঠানই। সিনেমা মুক্তির পর পরিচালক ঋষভ শেঠি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সিনেমায় ব্যবহৃত ‘ভূত কোলা’ আসলে হিন্দু সংস্কৃতির একটি অংশ। এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট চেতন অহিংস বলেছেন, “ভূত কোলা কোনওভাবেই হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্য নয় বরং হিন্দু ধর্মের সূচনার অনেক আগে থেকেই এটি বিদ্যমান ছিল।” এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে চেতন অহিংস বলেন, “হিন্দুত্ব মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না সুতরাং এক্ষেত্রেও তা হবে না। এটি দেশের আদিবাসীদের ঐতিহ্য, কখনই এটি হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্যের মধ্যে আসে না।”

অপরদিকে, পরিচালক ঋষভ শেঠি কোনও প্রকার বিতর্কে না জড়িয়েই দর্শকদের সামনে নিজের ভাবনা সহজ ভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “যখন আমি এই সিনেমাটি তৈরি করছিলাম, যাঁরা এই সংস্কৃতির চর্চা করেন তাঁরা আমার সঙ্গে ছিলেন এবং আমি খুব সতর্কভাবেই এই ছবি পরিচালনা করেছি।” তবে অন্যদের বাক স্বাধীনতাতেও তিনি বাধা দেবেন না বলে জানিয়েছেন।

এই ‘ভূত কোলা’ আসলে কী? ভূত কোলার ঐতিহ্য কতটা মানুষের মনে প্রকট সে বিষয়ে ধারণাগুলি একটু স্পষ্ট করে দেওয়া যাক।

ভূত কোলা কী?

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
৩০ বছরে প্রথমবার স্নান আর তারপরেই মৃত্যু দুনিয়ার সবচেয়ে নোংরা ব্যক্তিত্বের

Amou Haji:ইরানের সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, মৃত্যুর কিছুদিন আগে দেজগার কিছু বাসিন্দা আমুর সবথেকে অপছন্দের কাজটি করে ফেলেন। তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে দেন। তারপর থেকেই নাকি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

কর্ণাটকের লোকসংস্কৃতির এক ঐতিহ্যবাহী রূপ হল এই ভূত কোলা অনুষ্ঠান। যার মাধ্যমে প্রধানত ভূত বা আত্মাদের আরাধনা করা হয়ে থাকে। মনে করা হয়, যিনি আরাধনা করেন তিনি আসলে সেই সময়ের জন্য ঈশ্বরের এক রূপ হয়ে ওঠেন এবং ঈশ্বরের দূত হয়ে সকল মানুষের সব সমস্যার উত্তর দিতে পারেন। দক্ষিণ কন্নড়, উত্তর কন্নড় এবং উডুপি জেলায় টুলুভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যে এই পুজো প্রতিবছর পালন করা হয়ে থাকে।

ভূত কোলার 'কোলা' আসলে কারা?

কর্ণাটকের বেশিরভাগ গ্রামেই নির্দিষ্ট কিছু মানুষ বা পরিবার রয়েছে যারা এই কোলাগুলিকে সংগঠিত করেন এবং সেই পরিবারই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বংশ পরম্পরায় কোলা হিসেবে দেবতার আরাধনা করে থাকেন। যেহেতু একটি কোলা সংগঠিত করার দায়িত্ব নির্দিষ্ট পরিবারের উপর পড়ে, তাই এই দায়িত্বগুলি প্রতিটি প্রজন্মের পুরুষ উত্তরাধিকারীর কাছেও চলে যায়। পরিবারগুলি সাধারণত কোলার জন্য প্রস্তুত হতে প্রায় এক মাস সময় নেয়।

ভূত কোলা কীভাবে পরিচালিত হয়?

কোলা মূলত স্থানীয় এলাকায় বড় খোলা মাঠের কাছাকাছি অথবা মাঠের মধ্যে গান, নাচ, আবৃত্তি ইত্যাদির মাধ্যমে সঞ্চালন করা হয়। পুরনো টুলু ভাষায় প্রচলিত আবৃত্তির মাধ্যমে দেবতার উৎস থেকে শুরু করে বর্তমান পরিস্থিতি সকল বিষয়ে গল্প বলা হয়।

ভূত কোলায় কি অশুভ আত্মার পুজো হয়?

‘ভূত’ শব্দের সাধারণত একটি নেতিবাচক অর্থ রয়েছে। ‘অশুভ আত্মা’ বা ‘ভূত প্রেত’ সমস্যার সৃষ্টি করে- এই ধারণা সাধারণ মানুষের অজানা নয় কিন্তু টুলুতে, ‘ভূত’ শব্দের অর্থ ‘সৃষ্টিকর্তা’। কোলা শব্দের অর্থ ‘পারফরমেন্স’ যা সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে। এই উপাসনায় স্থানীয় দেবতাদের পুজো করার মাধ্যমে নিজেদের ভূমি রক্ষা করা হয়। যদিও কবে থেকে এই অনুষ্ঠান পালন করা শুরু হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। অনেকে মনে করেন, গত ৫০০ বছর ধরে এই প্রথা পালন করা হয়। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ‘ভূত আরাধনার’ অনুশীলন ১৮০০ দশকেরও আগে থেকে শুরু হয়েছে।

যদিও কান্তারাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক শুধুমাত্র ভূত কোলা অনুষ্ঠানেই থেমে থাকেনি। কেরলের একটি মিউজিক ব্যান্ড ‘থাইকুদাম ব্রিজ’ পরিচালক ঋষভ শেঠির উপর কপিরাইটের নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে। ব্যান্ডের অভিযোগ, কান্তারার ‘ভারাহা রূপম’ গানটি সঙ্গীত পরিচালক আজনীশ লোকনাথের সুর করা ‘নাভারসম’ গানেরই অনুকরণ। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে থাইকুদাম ব্রিজ স্পষ্ট জানায় যে, কান্তারার সঙ্গে তাঁরা কোনওভাবেই যুক্ত নন এবং তাঁরা এর বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেবেন। যদিও পরিচালক ঋষভ শেঠি এই বিষয়ে নীরবতার পথই অনুসরণ করেছেন।

লিখেছেন
Shibani
Shibani
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।