সংস্কৃতির নামে ভড়ংকে লাথ মেরে চুমু খায় বিদ্রোহী যোদ্ধারা

Kissing in Public: সেই যে ইডেন গার্ডেনে ফলমূল খেয়ে, জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে, যা কিছু করা হলো, তাকে ভগবান পাপ দাগিয়ে দিলেন, সেই থেকে চলছে এই লুকিয়ে চুরিয়ে খেলা।

Joyraj Bhattacharjee
৪ মিনিট
সংস্কৃতির নামে ভড়ংকে লাথ মেরে চুমু খায় বিদ্রোহী যোদ্ধারা

সিগারেটকে অনেকে হেরোইনের লাইসেন্স মনে করেন। আর হেরোইনকে বলা হয় ক্যুইন অফ অল ড্রাগস। সিগারেট খাচ্ছে মানেই কেউ হেরোইনে পৌঁছবে এমন নয় কিন্তু হেরোইনে পৌঁছে গেছে এমন কাউকে পাওয়া প্রায় অসম্ভব যে সিগারেট দিয়ে শুরু করেনি। তেমনই এমন কোনও বান্দার দেখা পাওয়া মুশকিল যে, চুমু খায়নি কখনও কিন্তু সেক্স করেছে ভরপুর। মোটামুটি চুমু দিয়েই শুরুয়াত হয়, সারা পৃথিবীতেই। যে চার্চ বাচ্চা পয়দা করার নিমিত্ত ছাড়া সেক্সকে মহাপাপ ঠাউরেছে, সেই চার্চও হোলি ওয়েডলকের অন্তে 'ইউ মে কিস ইচ আদার'-এর অনুমতি দেয়। যদিও বাচ্চা পয়দা করার ক্ষেত্রে চুম্বন অপরিহার্য নয়।

মূল ঝামেলাটা পাকান ফ্রান্সে দিদেরো। তিনি প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া রচনা করেন, আর সেখানেই জানিয়ে দেন- সমস্ত কার্যের কারণ আছে। এমনি এমনি কিছুই ঘটছে না। অর্থাৎ ঈশ্বরের ইচ্ছে মুখ্য ব্যাপার নয়। বর্ষার দুপুরে বা শীতের রাতে বা যখন তখন, যেখানে সেখানে আমাদের ইচ্ছেও কারণ হতে পারে কার্যের। আর সেক্সের ক্ষেত্রে আমাদের ইচ্ছে শুধুই সন্তান উৎপাদনের কারণে পবিত্র ইন্টুপিন্টু নয়, ইন্টুপিন্টুর কারণেই ইন্টুপিন্টু। সেক্স করতে আমাদের ভালো লাগে। প্লেজার পাই। প্লেজারই প্রাথমিক কারণ, সন্তান উৎপাদন সেকেন্ডারি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'চুম্বন তো আগেও বহুবার, এবার ঠোঁটে মিলেছে আশ্রয়'

Kiss and Revolution: শুধুমাত্র প্রথা ভাঙতে চাওয়াও নয়। সমস্ত হিংসা, সমস্ত ক্লীব অসুয়ার বিরুদ্ধেও এক প্রতিবাদ এই চুম্বন।

দিদেরোর বন্ধু ছিলেন সাদ। সাদ হোমোসেক্সুয়াল এবং পায়ুকামী, এই কারণে তাঁর ঠাঁই হয় জেলে। সাদ নিজে কিন্তু ছিলেন বুরব্যোঁ রাজপরিবারেরই আত্মীয়। নিজের হোমোসেক্সুয়ালিটি এবং অ্যানাল সেক্সের প্রতি আকর্ষণকে তিনি যদি সোচ্চারে ঘোষণা না করতেন, তাহলে অ্যারিস্টোস্ক্র‍্যাটের বৈভবের জীবনই ছিল সাদের বরাতে। কিন্তু সেক্স বড় বালাই। প্রায় সকলেই করতে চায়, সকলেই করেও, কিন্তু স্বীকার যায় না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঙালির প্রেম ও যৌন জীবন কীভাবে বদলে দিল বিলাতিয়া চুমু?

Kiss in Literature: বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিষবৃক্ষ’ ইত্যাদি উপন্যাস পড়েই বাঙালি ছেলেমেয়েরা চুম্বনের কায়দাকানুন শিখছে।

সেই যে ইডেন গার্ডেনে ফলমূল খেয়ে, জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়ে, যা কিছু করা হলো, তাকে ভগবান পাপ দাগিয়ে দিলেন, সেই থেকে চলছে এই লুকিয়ে চুরিয়ে খেলা। কিন্তু আমাদের দেশে তো অমনধারা ব্যাপার ছিল না। আজ সনাতনীরা যৌনতাকে যে বাইবেলের ধাঁচেই মনুসংহিতা দিয়ে বাঁধতে চাইছে, তা হিন্দুদের ইতিহাসেই সার্বিক মান্যতা পায়নি। খাজুরাহো-সহ মন্দিরের দেওয়ালগুলোতে চোখ রাখলেই অ্যানাল সেক্স, অর্জি, ওরাল সেক্স, ফেমডম, সকলই দেখতে পাওয়া যাবে। অর্থাৎ সকলই ছিল ভরপুর এবং তার প্রদর্শনও ছিল স্বাভাবিক। প্রদর্শন থাকলেই দর্শনও নিশ্চিত ছিল। এক্ষেত্রে কার্যই কারণের প্রমাণ। যৌনতার ক্ষেত্রে এক্সিবিশিনিজম এবং ভয়্যারিজম স্বাভাবিক প্রবণতা। যেমন স্বাভাবিক মাস্টারবেশন, অ্যানাল পেনিট্রেশন, ওরাল পেনিট্রেশন। সবই স্বাভাবিক, যদি সম্মতি থাকে। আমাদের সমস্ত যৌনকর্ম আসলে যৌথকর্ম। একমাত্র মাস্টারবেশন খানিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা দাবি করতে পারে। তাই একমাত্র মাস্টারবেশনকেই চূড়ান্ত প্রাইভেট কাজ বলা যায়। তাই পথেঘাটে বাসের পেছনের সিটে বসে সামনের কাউকে যখন মাস্টারবেশন দেখতে বাধ্য করা হয়, সেটা পারভার্সন। সেখানে এক্সিবিটর আর স্পেকটেটরের মধ্যে কোনও মেমোরেন্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে না। এই মাস্টারবেশন ছাড়া বাকি সব পাবলিক ডিসপ্লে অফ অ্যাফেকশনের একটা অলিখিত মউ আছে। আপনি দেখবেন কী দেখবেন না- আপনার ওপর, কিন্তু যাঁরা ডিসপ্লে করছেন, তাঁদের মরাল জাজমেন্ট দেওয়া নিতান্তই আনস্মার্ট ব্যাপার। তারা আপনার পরোয়া করে না, তোয়াক্কা করে না এবং সেটা একক নয়, যৌথভাবে। তারা অন্তত দু'জন। তারা অন্তত দু'জনের একটা দল। একটা গোষ্ঠী। আপনি যদি সেই ডিসপ্লের, এক্সিবিশনের পজিটিভ স্পেকটেটর হন, তাহলে আপনাকে নিয়ে দলটি তিনজনের।

পাবলিক ডিসপ্লে কি অশ্লীল? এই প্রশ্নের সোজা জবাব, পাবলিক ডিসপ্লে তখনই অশ্লীল যখন সেই ডিসপ্লে এক্সিবিটরের বৈভব আর স্পেকটেটরের অভাবকে প্রকট করে। যেমন আম্বানিদের বিয়ে, জয়ললিতার শাড়ি, ধারাভি বস্তিতে ল্যাম্বারগিনি চড়ে সোশ্যাল ওয়ার্ক করতে যাওয়া ইত্যাদি। স্বামীজি বক্তৃতা দিয়েছিলেন যে চিকাগো শহরে, যার আসল নাম শিকাগো আমরা পরে জেনেছি, সেই শহর খানিক অদ্ভুত। আধুনিকতম শহর, অথচ বেশ কিছু ক্ষেত্রে শহরটা তার প্রাচীন চরিত্র ধরে রেখেছে। বড়লোকি চাল, ইতালিয়ান মাফিয়া, ক্যাসিনো দেখতে পাওয়া যাবে। সাদা থ্রি-পিস শ্যুট পরে, চুরুট মুখে দিয়ে, সাদা ক্যাডিলাক থেকে অহরহ নামতে দেখা যাবে বিত্তবানদের, আর ডাউনটাউনে গেলে হোমলেস কালো মানুষরা রাস্তায় একটা ডাইমের (ডলারকে এক টাকা ধরলে, দশ পয়সা) জন্য চিল্লাচ্ছে। শিকাগোকে উইন্ডি সিটি বলা হয়, শীতে তাপমাত্রা থাকে মাইনাস পঁচিশ আর উইন্ড চিল হয় মাইনাস চল্লিশ। তার মধ্যে এই গৃহহীন মানুষরা সারারাত দাঁড়িয়ে থাকে, বড় বড় হোটেলের এক্সস্ট ভেন্টিলেটরের সামনে, একটু গরম হাওয়া পাওয়ার জন্য। দাঁড়ানোর জায়গা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ক্যালাকেলি হয়। খুনখারাপিও হয়ে যায় মাঝেমধ্যেই। সেক্সও হয়। পুরো সেক্স না হয়ে খানিক মেকআউট হয় কখনও। আর কিছু না হয়ে লম্বা একটা চুমু হতে পারে, মুখের মধ্যে জিভ ঢুকিয়ে দিয়ে গভীর আশ্লেষী চুমু। ছেলে-মেয়েতে হতে পারে, ছেলেতে -ছেলেতে হতে পারে, মেয়েতে-মেয়েতে হতে পারে, ট্রান্সজেন্ডার হতে পারে। হোটেল থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলে দেওয়া হলে, চুমুর বন্ধন থেকে নিজেদের ছাড়িয়ে নিয়ে সেই খাবার কুড়িয়ে এনে আবার চুমু রিজ্যুম করে নিতে হয়।

এখন এই উচ্ছিষ্ট ফেলে দেওয়ার নতুন নিয়ম হঁয়েছে ইউরোপ, আমেরিকার কিছু জায়গায়। এক্সপায়ারি ডেট পার হলে খাবার ফেলে দিতে হয়। সেই খাবার কুড়িয়ে নেওয়ার জন্য অভুক্ত মানুষ অপেক্ষা করে থাকে। নতুন নিয়মে এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে যাওয়া খাবার খাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। আসলে দেখা যাচ্ছিল, কোভিডের সময় আরও কিছু মানুষ এই ফেলে দেওয়া রুটি সংগ্রহ করছেন। যাঁরা আগে সুপারমার্কেট থেকে কিনতেন, এখন আর পেরে উঠছেন না, ফলে সুপারমার্কেটের বড় ব্যবসায়ীদের বিক্রি কম হচ্ছে। তাই তারা ফেলে দিতে পারেন, কিন্ত অভুক্ত মানুষ যেন সেটা কুড়িয়ে না নেয়, নিশ্চিত করতে হবে। সরকার নিশ্চিত করেছে। আইন করেছে। এই আইন অশ্লীল। আর এই আইনের সামনে দাঁড়িয়ে যাঁরা চুমু খায়, স্তনে হাত রাখে, মিউচুয়াল ফ্যাপিং শুরু করে তাঁরা বিদ্রোহী যোদ্ধা। তাঁরা সংস্কৃতির নামে যত ভড়ংকে লাথ মারে। উপেক্ষা করে মধ্যবিত্তের উপস্থিতিকে। উপেক্ষা করে মধ্যবিত্তের অস্বস্তিকেও। আর তাঁরা একা নয়। অন্তত দু'জন। চুমু তো শুরুয়াত।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।