গানের জন্য টাইপরাইটার বিক্রি করেছিলেন, চোখে জল আনবে কেকে-র লড়াইয়ের গল্প

কলকাতায় অনুষ্ঠান শেষে কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ তথা কে কে -র অকালপ্রয়াণের শোক কাটিয়ে উঠতে পারছে না কলকাতা সহ গোটা দেশ।গতকাল মুম্বইয়ের ভারসোভার শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। হরিহরণ, শ্রেয়া ঘোষাল,অলকা আগ্নিক, অভিজিতের মতো তারকারা উপস্থিত ছিলেন তাঁকে শেষবারের জন্য শ্রদ্ধা জানাতে। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই ভক্ত, পরিবার, সহকর্মীদের কাছ থেকে শোকবার্তা এসেই চলেছে । কেউই মেনে নিতে পারছেন তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যু। তবে সবথেকে আবেগঘন বার্তা এসেছে কে কে-র বন্ধু গৌতম চিকার তরফ থেকে।

পেশায় লেখক এবং অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট গৌতম চিকারমেন সঙ্গীত শিল্পীর সাথে একসাথে কলেজে পড়তেন। একই ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন কে কে এবং গৌতম। তাঁরা ছাড়াও তাঁদের 'হরাইজন' ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন জুলিয়াস, ফ্রানজ, টম এবং সন্দীপ। কে কেই ছিলেন এই ব্যান্ডের মুখ্য গলা। গৌতম দিল্লীর কিরোরি মাল কলেজে একসাথে কাটানো সময় এবং অনুষ্ঠান করতে বিভিন্ন কলেজে যাওয়ার কথা অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নিয়েছেন। জানিয়েছেন কতখানি সংঘর্ষের পর একজন শিল্পী শ্রেষ্ঠত্বের সিংহাসনে বসতে পারেন। তাঁর করা ট্যুইটগুলি কে কের অনুরাগীদের চোখে জল এনেছে।

গৌতম লিখেছেন,'আমরা প্রায় সব কলেজের অনুষ্ঠানেই গান গাইতে যেতাম। এর মধ্যে বেশিরভাগ জায়গাতেই আমরা গান গেয়ে প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছি। আইআইটি কানপুর এবং দিল্লি, শ্রী রাম কলেজ অফ কমার্সেও আমরা অনুষ্ঠান করেছি।এমনকি সিরি ফোর্ট অডিটোরিয়ামে পেশাদার ব্যান্ড হিসেবে অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছিলাম আমরা। সেই রাতে ৫০০০ টাকা উপার্জন করেছিলাম এবং মনে হচ্ছিল যেন আমরাই রাজা!'

আরও পড়ুন-‘দেবদাস’ থেকে ‘আশিকি টু’- গানের সুরে প্রেমের নদীর খোঁজ দিয়েছিলেন কে কে

 

তবে গৌতম জানিয়েছেন যে তাঁদের ব্যান্ডের কে কে এবং জুলিয়াস ছাড়া বাকী কারোরই সৌভাগ্য হয়নি গানের জগতে থাকার, স্বপ্নের জন্য লড়াই করার। বাকী সকলেই যেখানে চাকরি খুঁজে নিয়েছিল কে কে সেখানে অনন্য। গায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল ছেলেটা।

এখানেই শেষ নয় তিনি আরও লিখেছেন,' ভীষণ প্রাণবন্ত এবং সৃজনশীল কে কে আপনাদের ব্যান্ডের প্রাণ ছিল। সঙ্গে অসাধারণ প্রতিভাশালী ও অতুলনীয় সুন্দর কনস্বরের কারণে ও একজন গায়কই ছিল '।

গৌতমের কথায় জানা যায় কলেজে পড়াকালীন কে কে চুটিয়ে ইংরেজি গান করতো কিন্তু মুম্বই চলে আসার পর কী অনায়াসে আর কী দারুণ ভাবে হিন্দি গান গাইতো তা ভাবা যায় না। এতেই বোঝা যায় কে কে কত বড় মাপের গায়ক ছিলেন। অন্য একটি ট্যুইটে তিনি লেখেন,

"বেশ কিছু বছর আগে আমি মুম্বই গিয়েছিলাম। ও আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। আমরা দু'জনে সারারাত মেরিন ড্রাইভ হেঁটেছিলাম আর আমাদের কলেজের কাটানো দিনগুলি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমাদের দুজনের বেড়ে ওঠা, জীবন, আমাদের স্ত্রী, সন্তান, কর্মজীবন, আমাদের স্বপ্ন, আশা,আমদের গান, পুরোনো গান, নতুন গান ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এমন কত কিছু নিয়ে সারাক্ষণ কথা হল ওর সাথে। ওর আত্মা এক ভিন্ন জগতের যা গানের কর্ড, নোট, সুর,কথা,আলো, শব্দ দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল।"

তিনি আরও বলেছেন, কে কে হিন্দ সিনেমার জগতে যেখানে পৌঁছেছিলেন তার জন্য তাঁকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। বন্ধু গৌতমের কথাতেই উঠে এসেছে যে গান চালিয়ে যেতে একসময় কে কে নিজের টাইপরাইটারও বেঁচে দিয়েছিলেন।

তাঁর কথায়,'কে কে একসময় কাজ ছেড়ে বিভিন্ন হোটেলে গান গাইতে শুরু করেন।তবে কে কে এই কাজ করতে একেবারেই পছন্দ করতেন না। ও আমাকে ওর সংঘর্ষের কথা, লড়াইয়ের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি বলেছে জয়ের গল্পও, কিভাবে সাফল্য এসেছে তাঁর গল্পও শুনেছি ওর মুখে। ওর কাছেই শুনেছি কীভাবে গানের অনুশীলন করতো, গানের জগতে নতুন মানুষের সাথে পরিচয়ের কথা।

'সেদিন রাতে মেরিন ড্রাইভের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে ও আমাকে বললো প্রথম বার মুম্বই এসে আমি ঠিক এইখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আর এই আলোর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম মুম্বই শহর কি তাঁর কোলে আমাকে একটু ঠাঁই দেবে !' গৌতম লিখেছেন।

বন্ধুর এই ট্যুইটেই স্পষ্ট কত লড়াই করে এই জায়গা পেয়েছেন মুম্বইতে। বন্ধুর মৃত্যুতে গৌতম কতখানি ভেঙে পড়েছেন তা তাঁর ট্যুইটেই স্পষ্ট। বন্ধুকে শেষ বিদায় জানিয়ে তিনি লিখেছেন,' মাত্র ৫৩ বছর বয়স। জীবনের শেষ গান গেয়ে নিঃশব্দে চলে গেলেন। সঙ্গীতেই জীবন কেটেছে আর সঙ্গীতেই তাঁর মৃত্যু হল। বাকিদের জন্য দুঃখ রয়ে গেল কিন্তু কে কে স্বর্গদ্বারের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।' মানুষ নশ্বর কিন্তু শিল্পী ও শিল্প অবিনশ্বর।

 

More Articles

;