বছরে একদিন খুলে যায় ‘মহাকাব্যের’ মন্দির! কেন এত জাগ্রত এই দেবী কান্নাগির থান?

Mangala Devi Kannagi Temple: প্রায় ২ হাজার বছরের পুরনো এই মঙ্গলা দেবী কান্নাগীর মন্দিরটির অবস্থান সমুদ্র থেকে প্রায় ১,৩৩৭ মিটার উঁচুতে। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির এটি।

Sohini Das
৩ মিনিট
বছরে একদিন খুলে যায় ‘মহাকাব্যের’ মন্দির! কেন এত জাগ্রত এই দেবী কান্নাগির থান?

গোটা বছরে মাত্র একটি বার খুলে যায় মন্দিরের দরজা। ওই একটি দিনই ভক্তদের হাতে পুজো পান মহাকাব্য থেকে উঠে আসা দেবী কান্নাগী। প্রায় ২ হাজার বছরের পুরনো এই মঙ্গলা দেবী কান্নাগীর মন্দিরটির অবস্থান সমুদ্র থেকে প্রায় ১,৩৩৭ মিটার উঁচুতে। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির এটি। কেরলের ইদুক্কি জেলা ও তামিলনাড়ুর থেনি জেলার সীমান্তে অবস্থিত এটি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এই মন্দিরের মালিকানা নিয়ে ঝগড়া লেগেই ছিল তামিলনাড়ু ও কেরলের দুই সরকারের বিরুদ্ধে।

পেরিয়ার ব্যাঘ্র প্রকল্পের ভিতরে থেক্কাডি থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে এই মন্দির। খালি পায়ে হেঁটে মন্দির পৌঁছনোর উপায় নেই। ভরসা জিপ। কুমিলি থেকে জিপ ধরে পৌঁছতে হয় মন্দির চত্বরে। অবশ্য সারা বছর এই মন্দিরের দ্বার ভক্তদের জন্য খোলা থাকে না মোটেই। প্রতি বছর চিত্র পূর্ণমী উৎসব উপলক্ষে একটি দিনই দ্বার খুলে যায় মন্দিরের। সেগিন কেরলের ইদুক্কির এই মন্দির চত্বরে ভিড় করেন হাজার হাজার ভক্ত। ২৩ এপ্রিল, মঙ্গলবার ছিল সেই দিন। যেদিন খুলে গিয়েছিল মন্দিরের দ্বার।

পান্ডিয়ান স্থাপত্য দিয়ে সাজানো এই মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর ও মন্দিরে দিকে যাওয়ার ধাপগুলো বিরাট বিরাট সব পাথর দিয়ে তৈরি। জঙ্গলের মধ্যে দুর্দান্ত নৈসর্গে মোড়া এই মন্দিরটি কেরলের এক প্রাচীন ঐতিহ্য, যাকে একঝলক দেখতে ছুটে আসেন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ। এ মন্দির আসলে বছরের পর বছর ধরে নারীশক্তির প্রমাণ। তামিল মহাকাব্য সিলাপাখিকারমের একটি নারী চরিত্র দেবী কান্নাগি, যাঁকে দেবী হিসেবে পুজো করে আসছেন দক্ষিণের মানুষ।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
খিচুড়ি-লাড্ডু নয়, দেশের এই মন্দিরে দেবতার প্রসাদ নাকি বই!

Mahadeva Temple Prasad: ফলমিষ্টিও নয়। বরং প্রসাদ হিসেবে এই মন্দির আপনার হাতে তুলে দেবে একটি করে বই। তেমনটাই রীতি কেরলের এই মন্দিরের।

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় দু হাজার বছর আগে ভান্নাথিপারাইতে প্রাচীন তামিলনাড়ুর চেরা রাজবংশের শাসক চেরান চেঙ্গুত্তভান তৈরি করেছিলেন মন্দিরটি। প্রতিবছরই এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে একটি দিন মন্দিরের দরজা খুলে যায় ভক্তদের জন্য। সে দিনটা চিত্রপূর্ণামী উৎসব। স্থানীয় বিশ্বাস, তামিল মহাকাব্য 'সিলাপাথিকারম' অনুসারে, দেবী কান্নাগি মাদুরাই থেকে শুরু করে ভেঙ্গাইকানাল নেদুকুন্ড্রম পৌঁছন। প্রায় চোদ্দ দিনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল যেখান থেকে, সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়েছে আজ এই মন্দির। এখানকার মানুষজন বিশ্বাস করেন, স্বামী কোভালানকে স্বর্গে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই মনুষ্যরূপ ধরে পৃথিবীতে আসেন কান্নাগি, এবং তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে ফিরে যান।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নাগ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব মেলে এখানে, আজও নিয়মিত পুজো হয় বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো এই হিন্দু মন্দিরে

Oldest Hindu Temple : সারা বছরই ভক্ত এবং পর্যটকদের কম বেশি ভিড় থাকলেও রামনবমী ও শিবরাত্রির দিন বিশেষ করে ভক্তের ঢল নামে এই মন্দিরে, কোন দেবতার পুজো হয় এখানে?

তবে কোভালান আর কান্নাগির এই প্রেমের পথ কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। কোভালান স্ত্রী কান্নাগিকে ভুলে লিপ্ত হয়েছিলেন নর্তকী মাধবীর মোহে। বণিক কোভালান ভাগ্যের ফেরে সর্বশান্ত হন, এবং চলে যান সোজা মাদুরাইয়ে। সেখানে গিয়ে রানির নূপুর বলে স্ত্রীর নূপুর বিক্রি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যান। রাজার দরবারে পেশ করা হয় কোভালানকে, তাঁকে রাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এ সময় কোভালামকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পৌঁছন কান্নাগি। নিজের অন্য পায়ের পান্না খচিত নূপুরটি নিয়ে হাজির হন সেখানে। তিনি জানানা, রানির পায়ের নূপুরটি মুক্তখচিত ছিল। রাজা ভুল বুঝতে পারেন এবং নিরপরাধতে দণ্ডিত করার অপরাধবোধে সিংহাসনেই মারা যান রাজা। সেই সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর স্ত্রীও।

কান্নাগি কোনও মহাকাব্যের প্রথম কোনও সাধারণ মহিলার চরিত্র, যে ওই তামিল মহাকাব্যের নায়িকা হয়ে উঠেছিলেন। স্বামীবিচ্ছেদ সহ্য করতে না পেরে তিনি হাঁটতে শুরু করেন। চোদ্দো দিনের এই যাত্রায় চেরা হয়ে কেরালার কুমুলিতে পৌঁছন তিনি। স্থানীয় উপজাতিদের থেকে কান্নাগির গল্প জানতে পারেন রাজা চেঙ্গুতুভান। আর তারপরেই রাজা স্বয়ং হিমালয় থেকে নিয়ে এসেছিলেন মন্দির তৈরির জন্য় পাথর। তাঁর এই উদ্যোগে যোগ দেন সিলনের রাজা কায়ভাগুও।

প্রাথমিক ভাবে মন্দিরটি তামিলনাড়ুর অন্তর্গত ছিল। ১৮১৭ সালে করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমীক্ষাও ১৮৮৩ সালের সেন্ট জর্জ গেজেট অনুযায়ী, মন্দিরটি পড়ে কেরল অঞ্চলে। দীর্ঘদিন এই মন্দিরের মালিকানা নিয়ে বিবাদ চলেছে দু'রাজ্যের মধ্যে। ইতিমধ্যে জারি হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনও। তবে তার ফয়সালা হয়নি এখনও।

কান্নাগি মন্দির ট্রাস্ট সূত্রের খবর, এই মন্দিকে ১১ শতকের রাজারাজা চোল ও ১৩ শতকের কুলাশেকার পান্ডিয়ানের দু'টি শিলালিপি রয়েছে। মহাকাব্যের এই মন্দির ঘিরে রয়েছে পাইন গাছের সারি। মহাকাব্যের উপজাতিরা এখনও এই মন্দিরের পাদদেশে বসবাস করেন। এমনকী মহাকাব্যে উল্লিখিত জলাশয়টাও রয়েছে মন্দিরের কাছেই। তবে সুপ্রাচীন এই মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কোনও উদ্যোগ নেয়নি সরকার। যার ফলে মন্দিরের আশ্চর্য কাজ এবং কাঠামো ক্ষয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। এমনকী মন্দিরটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও তহবিলের ব্যবস্থাও নেই। মন্দিরে মঙ্গলা দেবী ছাড়াও রয়েছে কারুপুস্বামী, শিব ও একটি গণেশের মূর্তি। তবে সংরক্ষণের অভাবে কতদিন টিকে থাকবে প্রাচীন এই মন্দির, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বৈকি।

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।