চতুর্দিকে 'প্রেতে'র ভিড়! রোম খাড়া হয়ে যায় ভারতের ১৪ দিনের এই ভূতমেলায়

Ghost Fair in India: দু'দিনের এই মেলায় মানুষের উপস্থিতি প্রতি বছর ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

inscript
৩ মিনিট
চতুর্দিকে 'প্রেতে'র ভিড়! রোম খাড়া হয়ে যায় ভারতের ১৪ দিনের এই ভূতমেলায়

ভারতবর্ষ উৎসবের দেশ। এমন কোনও ঘটনা পাওয়াই মুশকিল, যার জন্য পৃথক উদযাপন নেই! সম্পর্ক এখানে পূজিত হয়, স্বাস্থ্য ফিরে পেতে, পড়াশোনা বা জ্ঞান বাড়াতে, সম্পদ বাড়াতে এখানে মানুষ পুজো করেন, প্রকৃতির ঋতুপরিবর্তন, ফসল কাটা বা রোপণ করাও এখানে পুজো আর উৎসবের মাধ্যমে পালিত হয়। এমনকী বহুকাল আগে ছেড়ে চলে যাওয়া স্বজনদের স্মরণ করতেও রয়েছে ভিন্ন উৎসব। সবই যখন হলো, ‘ভূত'রাই বা বাদ যায় কেন? বাদ যায়নি, ভূতদের জন্য এই ভারতেই আয়োজিত ও উদযাপিত হয় এক মেলা। সেই মেলা 'মানুষের মিলনক্ষেত্র' নাকি 'তেনাদের মিলনস্থল' বোঝা দুষ্কর। এই হালফিল গেজেট নির্ভর সমাজেও, ভূত মেলা যে ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয়, তা স্পষ্ট করে বিশ্বাসের শিকড় এখনও প্রবল আঁধারেই। কোথায় পালিত হয় এই ভূতমেলা? কীই বা হয় এই ভূতমেলাতে?

এক নয়, দুইখানি মেলা! 'ভূতাদি অমাবস্যা' বা ভৌতিক অমাবস্যার দিন বসে একটি মেলা। মধ্যপ্রদেশে অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, আচার-অনুষ্ঠান এবং ভুতুড়ে চিৎকারের এক বিচিত্র, উদ্ভট, ভয়াবহ সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায় ভূতমেলায়। মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরম জেলায় মেলা পিতৃপক্ষের ১৪ তম দিনে অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা এবং অমাবস্যার গভীর রাত্রি পর্যন্ত চলতে থাকে। শুধু যে গ্রামের অন্ধবিশ্বাসী মানুষই ভিড় জমান এমন নয়। দু'দিনের এই মেলায় মানুষের উপস্থিতি প্রতি বছর ১ লাখ ছাড়িয়ে যায়। আর এই মধ্যপ্রদেশেরই রাজধানী ভোপাল থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দূরে বেতুল জেলার সাতপুরা পর্বতমালার পাহাড়ের মধ্যে একটি গ্রাম হচ্ছে মালাজপুর। মালাজপুর গ্রামে তিন সপ্তাহব্যাপী ভূতের মেলা চলে! মানুষের বিশ্বাস, মালাজপুর ভূত মেলা নাকি ৪০০ বছর ধরে চলে আসছে।

মালাজপুর ভূত মেলার নেপথ্যের গল্পটি ১৮ শতকের। লোককথা অনুযায়ী, দেবজি মহারাজ নামে এক ব্যক্তির নাকি কিছু অদ্ভুত জাদুক্ষমতা ছিল। তিনি একবার এই গ্রামে এসেছিলেন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর আশ্চর্য ক্ষমতা দিয়ে তিনি মাটিকে গুড় এবং পাথরকে নারকেলে বদলে দিয়ে বন্ধুদের খাওয়াতেন। পরে, এই দেওজি নিজের 'জাদুক্ষমতা' দিয়ে অশুভ আত্মাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন এবং ভূতে পাওয়া মানুষদের 'রোগ' নির্মূলে সাহায্য করেন। তিনি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে গ্রামবাসীরা পরে গ্রামে একটি মন্দিরের মতো তৈরি করেন। এই মন্দিরের পুরোহিতরা দেওজিকেই তাদের পূর্বপুরুষ বলেন এবং উত্তরাধিকার হিসেবে নাকি এখন মানুষকে অশুভ আত্মা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করেন। 'গুরু মহারাজ দেওজি কি জয়' বলতে বলতে ঝাঁটাপেটা থেকে শুরু করে চুলের মুঠি ধরে মার, বাদ যায় না কিছুই!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মানুষের বসতি, না ভূতের আস্তানা? বিশ্বের সবচেয়ে 'নিঃসঙ্গ' বাড়ি ঘিরে আজও ঘুরে বেড়ায় রহস্য

World's Loneliest House Mystery : বিশ্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ, একা বাড়িটি ঘিরে মানুষের উৎসাহের শেষ নেই। তৈরি হয়েছে একের পর এক মিথ।

কেন এত জনপ্রিয় এই মেলা? উত্তর হয়তো, ভয়ই মানুষের সেরা বিনোদন! এই মেলায় ঢুকে পড়লেই চারদিকে যা দৃশ্য দেখা যাবে, সে ভারতকে চেনেন না অনেকেই। খানিক মজা লাগলেও, আখেরে অস্বস্তি হতে বাধ্য! স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই মেলার সময় নর্মদা নদীতে স্নান করলে মানুষ অতিপ্রাকৃত নানা সমস্যা থেকে মুক্তি পায়। মেলায় নদীর ধারেই, কালাজাদু, প্রেততন্ত্র, বাবা, তান্ত্রিক এবং এই ধরনের নানা মানুষের দেখা মেলে। স্থানীয় মানুষের মতে, এত এত লোক মেলায় জড়ো হন পড়িহারো বাবার (স্থানীয় এক দেবতা) কাছ থেকে 'চিকিৎসা' পেতে। নর্মদার জলে দাঁড়িয়ে ভক্তরা নিজেদের কথ্য গ্রাম্য ভাষায় নিজেদের সমস্যা বর্ণনা করতে থাকেন। আর যারা অলৌকিক কোনও সমস্যায় ভুগছেন, মানে ভূতে ধরেছে, বা এমন কোনও রোগ যা তাঁদের জ্ঞানের বাইরে, তার থেকে নিরাময় পেতে তারা স্নান করে কাদা মাখেন দেহে। মন্দিরে দু'টি বটগাছ রয়েছে। পুরোহিতদের মতে, হাজার হাজার ভূত এবং অশুভ আত্মা যাদের মানুষের দেহ থেকে বের করে আনা হয়, তারা 'পরিত্রাণ' পেয়ে এই গাছেই বাসা বাঁধে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
সময় পেরলেও মরচে পড়েনি এতটুকুও, ভারতের এই মন্দিরে আজও রয়েছে পরশুরামের কুঠার

Tanginath Dham Parshuram Axe : সিঁদুর, ফুল লাগানো এই লোহার অস্ত্রটি নাকি হাজার হাজার বছর ধরে এভাবেই এই জায়গায় রয়েছে। মরচে পড়েনি এতটুকুও।

বিশ্বাসের নামে কুসংস্কারের এই আজব খেলা মাঝে মাঝে হিংসাত্মকও হয়ে ওঠে। মেলায় এই ত্রাণকর্তা বাবাদের তরোয়ালের ব্যবহারে উপস্থিত বিশ্বাসীদের গুরুতর আঘাতও লাগে। ভূত ছাড়াতে অনেককে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, ব্যাপক মারধরও চলে। তবে ভূতের মেলায় এসব আঘাত, অত্যাচারকে গুরুত্ব দিতে নেই। বিশ্বাসে চিরকালই মেলায়...

ভূত মেলা মূলত 'প্রেত ছাড়ানোর মেলা'। লোকবিশ্বাসে, প্রেত অর্থাৎ তারাই যাদের অকালমৃত্যু হয়েছে। এই প্রেতরা অস্বাভাবিক তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত। তাই ছটফটে প্রেত কারও উপর চেপে বসলে তার একেবারে রক্ত শুষে খায়! মনোবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান বলছে, এই জাতীয় অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক সমস্যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্কিজোফ্রেনিয়া রোগটিই মূল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১.৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার ভারতে প্রায় ১ শতাংশ রোগীই স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সেই এই রোগ দেখা দিতে শুরু করে। তবে কখনও কখনও লক্ষণগুলি পরেও দেখতে পাওয়া যায়। সঠিক চিকিৎসার অভাব এবং প্রচলিত কুসংস্কারের কারণে, ভারতে রোগীদের গন্তব্য চিকিৎসক না হয়ে, হয়ে ওঠে প্রায়ই এই ধরনের ভূত মেলা এবং জাদুবিদ্যায় পারদর্শী কিছু মানুষ।

হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত মানুষরা এভাবেই সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে আজীবন রোগ সারানোর নামে অত্যাচারিতই হন। অবৈজ্ঞানিকভাবে রোগীদের মারধর করে ভূত ছাড়ানোর এই খেলা আসলে নিজেই এক রোগ!

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।