কোথাও ন্যাড়া পোড়া, কোথাও হোলিকা দহন, বিজ্ঞান নাকি মিথ? কোন সত্যি লুকিয়ে আছে এই প্রথায়?

Nera pora or Holika Dahan ritual : এই যে ইতিহাস, এই যে রীতি তার আসল সত্যিটা ঠিক কী? কীভাবে বাংলায় শুরু হল এই প্রথা, জানেন? শুধুই কি মিথ নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

Kankana Mukherjee
৩ মিনিট
কোথাও ন্যাড়া পোড়া, কোথাও হোলিকা দহন, বিজ্ঞান নাকি মিথ? কোন সত্যি লুকিয়ে আছে এই প্রথায়?

“আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া, কাল আমাদের দোল।

পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে, বলো হরিবোল...”

আজকের আধুনিক প্রজন্ম এই ছড়াটির সঙ্গে কতটা পরিচিত তা অবশ্য জানা নেই, তবে একটা সময় দোল মানেই ছিল এই প্রচলিত ছড়ার অনুরণন। তখন যদিও যান্ত্রিকতা গ্রাস করেনি জীবনকে, তখন উৎসব মানে ছিল অফুরান আনন্দ। কচিকাঁচাদের শব্দে মুখরিত পরিবেশ। এখন বাচ্চাদের হাতেও অ্যান্ড্রয়েড ফোন, যা কিছু উৎসাহ সব যেন সেঁধিয়ে গিয়েছে ওই কয়েক ইঞ্চি মুঠোফোনেই। তবে পুরনো বাক্সটা হাতড়ে দেখলে এখনও খোঁজ মেলে এইসব ঐতিহ্যের। এখনও কলকাতা সহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় দোলের আগের দিন গনগনে অঙ্গুনের আঁচ ওঠে। চোখের নিমেষে ছাই হয়ে যায় জীর্ণ পুরাতন। আর সেই আগুনের পরশ এসে লাগে বাঙালির রঙের উৎসবে। রাত পেরিয়ে ভোর হয়, আবির রঙে শুরু হয় বসন্তের উদযাপন।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
জামা ছিঁড়ে খালি গায়ে রঙ খেলার কাছে হাজার গোলে হেরে যায় তিন আঙুলের আবিরের দোল

Holi 2023: এই কয়েকদিন আগেও দোলের শেষে সবার জামা একসঙ্গে ছিঁড়ে পরপর বেঁধে রাস্তায় উঁচু তারে ঝুলিয়ে খালি গায়ে বাড়ি ফিরতাম!

কিন্তু এই যে ইতিহাস, এই যে রীতি তার আসল সত্যিটা ঠিক কী? কীভাবে বাংলায় শুরু হল এই প্রথা, জানেন? শুধুই কি মিথ নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

রাজনীতি প্রেমীরা আজকাল প্রায়শই বিপক্ষ দলের কুশ পুতুল পুড়িয়ে থাকেন। ন্যাড়া পোড়াও খানিক সেরকম। বাঁশের ওপর খড় দিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ ন্যাড়া, তার পর তাকে পোড়ানো হয় বলেই এরকম নাম। এখানেই শেষ নয়, শুকনো পাতা, খড়, বাঁশের গায়ে নারকেল দড়ি দিয়ে বেঁধে তৈরি করা হয় ন্যাড়ার ঘর। তারপর বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার যে রেওয়াজ তাকেই বাঙালিরা বলেন ন্যাড়া পোড়া। তবে অবাঙালিদের কাছে এটি 'হোলিকা দহন' নামেই খ্যাত।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
টানা দশ দিন ধরে দোল খেলা হয় নবদ্বীপে, কোন রহস্য লুকিয়ে আড়াইশো বছরের পুরনো ইতিহাসে?

Dol Yatra 2023 at Nabadwip, Mayapur : প্রতিবছরের মতো এবারেও নবদ্বীপে সাজো সাজো রব। এই স্থান থেকে যাতে কোনও ভক্তরাই বিনা প্রসাদে না ফেরেন তার জন্যও শুরু হয়ে গিয়েছে ব্যবস্থাপনা।

এই প্রাচীন প্রথাটির শুরু হয়েছিল এক পৌরাণিক কথন অনুসারে। অনেকেরই অজানা সেই গল্প। পুরাণ মতে, রাক্ষসরাজ হিরণ্যকশিপ একবার তাঁর প্রজাদের পুজো করা বন্ধ করে দিয়ে নিজে অমরত্ব লাভের আশায় ব্রহ্মার তপস্যা করা শুরু করেন। ব্রহ্মা অবশ্য বর দেওয়ায় সিদ্ধ হস্ত। হিরণ্যকশিপকেও খালি হাতে ফেরালেন না। একটা দুটো নয়, পাঁচ পাঁচটি বর দিলেন তাঁকে। সেই বর অনুসারে হিরন্যকশিপ-এর মৃত্যু দিনেরবেলাও হবে না, রাত্রিবেলাও হবে না। চারদেওয়ালের ভিতরেও হবে না, চারদেওয়ালের বাইরেও হবে না। কোনও মানুষের হাতেও হবে না, প্রাণীর হাতও হবে না। জলে-স্থলে মহাশূণ্যে কোথাও তাঁর মৃত্যু হবে না। এখানেই শেষ নয়, অস্ত্র অথবা শাস্ত্র কোনোকিছুর সাহায্যেই তাঁর মৃত্যু সম্ভবপর হবে না, এমনটাও নির্ধারিত হল ওই বরে।

এই অমরত্বের বরলাভই শেষে কাল হয়ে দাঁড়ালো। অসুর বধে ঠিক যেভাবে ব্যর্থ হয়েছিলেন দেবতারা ঠিক তেমনই ঘটল আবার। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লেন না হিরণ্যকশিপও। আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন তিনি। প্রজাদের ওপর শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। কিন্তু ঘর শত্রু বিভীষণ গিয়ে দাঁড়াল হিরম্যকশিপ-এর নিজের ছেলে প্রহ্লাদ। সে পিতাকে ঈশ্বর বলে মানতেন না। প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। শোনা যায়, রাগে তাই নিজের ছেলেকেও হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন হিরণ্যকশিপ। এই কাজে তিনি সাহায্য নেন নিজের বোন তথা রাক্ষসী হোলিকার। প্রসঙ্গত, হোলিকাও আবার ছিলেন ব্রহ্মা দ্বারা বরপ্রাপ্ত। ব্রহ্মার বাইরে তিনি কখনই আগুনে পুড়বেন বলে স্থির ছিল। তাই রাক্ষসী হোলিকার কোলে প্রহ্লাদকে নিয়ে বসা অবস্থায় পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে হিরণ্যকশিপ। যাতে আগুনে না পোড়ার বরে রাক্ষসী হোলিকার কিছুই না হয়, বরং সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় প্রহ্লাদ। কিন্তু ধর্মের কল যে সত্যিই বাতাসে নড়ে, তার প্রমাণ মিলল অচিরেই। ভক্ত প্রহ্লাদের ভক্তিতে প্রসন্ন হতে ভগবান বিষ্ণু তাঁকে বাঁচিয়ে দেন। কিন্তু হোলিকা তাঁর এই ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সেই থেকেই যা-কিছু অন্যায়, যা-কিছু খারাপ সেই সবকিছুর অবসান করে ন্যায় কিছু প্রতিষ্ঠার সূচক হিসেবে পুরাণকে স্মরণ করে আজও পালিত হয় ন্যাড়া পোড়া বা হোলিকা দহন।

হোলিকার পুড়ে মরা থেকেই এই প্রথা, তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বাস্তব সত্যি। রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও। আসলে এই প্রথা অন্যায়, খারাপ তথ্য পরিবেশে দূষণ সৃষ্টিকারী যা কিছু তার পুড়ে যাওয়াকে বোঝায়। আমরা জানি বসন্তকাল মানেই বাতাসে রোগের উপদ্রব। জানা অজানা অজস্র ভাইরাসের আনাগোনা এই সময়। এছাড়া শীতের শেষ এবং গরমের শুরু এই দুয়ের পরিবর্তনেও অসুখ ছড়ায় এই সময়। আর এই সময়েই যাবতীয় রোগ-জীবাণু-ব্যাকটেরিয়া বাতাসে ভেসে বেড়ায়। যার ফলে ফ্লু, ভাইরাসঘটিত জ্বর এবং পক্সের মতো একাধিক রোগ শরীরে বাসা বাধার সম্ভাবনা থাকে।

তাই এই সময় ঝড়ে পড়া শুকনো পাতা, যেমন - নারকেল, সুপুরি, খড় ইত্যাদি জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। যার জেরে বাতাসে ছড়ানো ভাইরাস বিনাশ সম্ভব বলেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, আগুনে আবর্জনা পোড়াতে গিয়ে অতিরিক্ত বায়ু দূষণ হয় এমন কিছু যাতে না পোড়ানো হয়। এতেই হয়তো মনের সব পাপ, অশুচি, লোভ, হিংসের পাশাপাশি বাতাসে ছড়িয়ে যাওয়া অকাল রোগও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আর একটা নতুন সকাল আসবে, যেখানে থাকবে নানান রঙের মিশেল।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।