স্বদেশি আন্দোলনের উত্তরাধিকার, ১০০ কোটির নস্টালজিয়ার নাম পার্লে-জি

Piya Saha
৩ মিনিট
স্বদেশি আন্দোলনের উত্তরাধিকার, ১০০ কোটির নস্টালজিয়ার নাম পার্লে-জি

সকাল হতেই দুধের গ্লাস হাতে মা ছুটছেন সন্তানদের পিছনে। জোর করে দুধ বিস্কুট খাইয়ে দিচ্ছেন সন্তানকে। ব্যাস আর খাওয়ার চিন্তা নেই ! বা বন্ধুদের চা-বিস্কুট সহযোগে অফুরান আড্ডা- নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা মানুষের এসব স্মৃতি মনে আসতেই হলুদ প্যাকেটে মোড়া পার্লে-জি বিস্কুটের কথা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। একটা বিস্কুট কী ভাবে মানুষের জীবনের বহতার সাথে মিশে যেতে পারে তার আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। দিল্লী নিবাসী স্বস্তিকা জজ্জুর ঠাকুরদা বয়সজনিত সমস্যায় ভর্তি হাসপাতালে। নাকে পড়ানো রয়েছে নল। আবছা হয়ে আসছে জীবন স্মৃতি।সুস্থ হয়ে উঠে তিনি প্রথম কি খেতে চান প্রশ্ন করায় তাঁর উত্তর," পার্লে-জি ও চা"। হাসপাতাল থেকে ফিরে তেমনটাই করেছিলেন স্বস্তিকার ঠাকুরদা। সমঝদার মাত্রই জানেন, এমনটাই পার্লেজির ব্র্যান্ড ইমেজ। সময়ের সঙ্গে ব্যাবসায় লাভের পরিমাণ কমলেও কমেনি পার্লে-জি বিস্কুটের জনপ্রিয়তা। আট থেকে আশি তাকে ভরসা করে।

ইংরেজ শাসনকালে ব্রিটেন থেকে আমদানি হতো ক্যান্ডি ও বিস্কুট। ভারতীয় বাজারে সেগুলি বিক্রি হত চড়া দামে যা সাধারণ ভারতবাসীর কাছে ছিল সাধ্যের অতীত। তাই ১৯২৯ সালে ভারতের সাধারণ মানুষের জন্য প্রথম বিস্কুট নিয়ে আসেন পার্লে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা মোহনলাল দয়াল। তিনি ছিলেন মূলত রেশম ব্যবসায়ী। স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই বেকারির ব্যবসা শুরু করেন। জার্মানি থেকে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ শেষে সেই সময় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে ক্যান্ডি মেশিন কিনে দেশে ফেরেন মোহনলাল।মুম্বইয়ের ইরলা ও পারলা নামে দুই গ্রামের মাঝে একটি পুরনো কারখানা কিনে ১২ জন পরিবারের সদস্য নিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। মজার বিষয় হল এই জায়গার নাম খানিক বদলেই কোম্পানির নাম রাখা হয় পার্লে। প্রথম পথ চলা শুরু হয় অরেঞ্জ ক্যান্ডি দিয়ে।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটের সময়ে প্রথম পার্লে বিস্কুট তৈরি করেন মোহনলাল। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মোহনলালকে। স্বদেশি বাজারে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই বিস্কুট। দামে কম , মানেও ভালো পার্লে অল্প সময়েই ভারতবাসীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণঅংশ হয়ে ওঠে।লোকসান হতে শুরু করে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর। তবে চলার পথে চরাই উৎরাই এসেছে অনেক। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর দেশে গমের সংকট তৈরি হলে বন্ধ হয়ে যায় বিস্কুটের উৎপাদন। কিন্তু দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে? পার্লের অভাব বোধ করতে শুরু করেন প্রত্যেক ভারতবাসী। অবশেষে ১৯৮২ সালে ভারতের বাজারে কামব্যাক করে পার্লে গ্লুকো। তবে গ্লুকো শব্দের পেটেন্ট না থাকায় ততদিনে বাজার ছেয়ে গেছে একাধিক গ্লুক বিস্কুটে। ফলে খানিক নাম বদলে হল পার্লে- জি। ট্যাগলাইন জি ফর জিনিয়াস।পার্লে-জির প্যাকেজিং নিয়েও মানুষের কৌতূহল ছিল চোখে পড়ার মতোই। যদিও হলুদ প্যাকেটের ওপর ছোট্ট শিশুর পরিচয় আজও অজানাই থেকে গেছে।

একের পর এক মাইলস্টোন পার করেছে এই বিস্কুট উৎপাদনকারী সংস্থা। ২০০৩ সালে বিশ্বের এক নম্বর বিস্কুট কোম্পানির শিরোপা পায় পার্লেজি। বাজার সংক্রান্ত গবেষণাকারী সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭সালে এই সংস্থার বাজারদর ছিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।অনুমান করা হয় প্রতি ঘণ্টায় এক কোটিরও বেশি পার্লে বিস্কুট খায় ভারতবাসী এবং প্রতি মাসে এক বিলিয়ন প্যাকেট বিস্কুট বিক্রি হয় । ধারাবাহিক ভাবে ভারতের সবচে-য়ে স্থায়ী ব্র্যান্ডগুলির মধ্যে স্থান পেয়েছে পার্লেজি। ফার্জি ক্যাফের মত অভিজাত রেস্তোরাঁর মেনুতে পার্লে-জি চিসকেক ,পার্লেজি মিল্কশেক-এর মত একাধিক রেসিপি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

১৯৩৮ থেকে ২০২১-- বাজারের সাথে পাল্লা দিতে মোনাকো, হাইড অ্যান্ড সিক, ক্র্যাক জ্যাক, ২০-২০ কুকিস, মিলানোর মত ভিন্ন স্বাদের নতুন নতুন বিস্কুট নিয়ে এসেছে এই সংস্থা।তবে ২০১৭ সালে জিএসটি চালু হতেই মন্দার মুখোমুখি হয় কোম্পানি। কর্মী ছাঁটাই,ফ্যাক্টরি বন্ধ করা থেকে শুরু করে প্রতি প্যাকেটে বিস্কুটের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়ার মত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় সংস্থা।ফলে চাহিদার গ্রাফও নামতে শুরু করে বিশেষত গ্রামীণ ভারতে। তবে করোনা অতিমারির কারণে যখন বিশ্ব বাজার মন্দার সম্মুখীন তখন শেয়ার বাজারে পাঁচ শতাংশ মুনাফা বাড়িয়েছে পার্লে। পার্লে প্রোডাক্টস এর অন্যতম শীর্ষকর্তা মায়াঙ্ক শাহ জানিয়েছিলেন যে এই মুহূর্তে দেশের মোট বিস্কুটের বাজারের প্রায় ৩২ শতাংশ রয়েছে পার্লে-জির দখলে।

অতিমারী ফের একবার ভারতবাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে পার্লেজি ছিল, আছে আর থাকবে। হয়তো বাধা আসবে আরো অনেক, আসবে নিত্যনতুন সংস্থা। কিন্তু দরিদ্রের হাতের সম্বল পার্লে জি। ভারতের মন চিনেছে সে। কে না জানে জিনিয়াস যে সে কখনও হারিয়ে যায় না বাজার থেকে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।