আজও মহালয়ার ভোর মানেই রেডিও! আকাশবাণী থেকে এফএম, অব্যাহত নস্টালজিয়া

কলকাতায় রেডিওর যাত্রা শুরুর গার্স্টিন প্লেস আজ মাটিতে মিশে গিয়েছে। রেডিওতে নতুন অনুষ্ঠান এবং সম্প্রচারক দর্শকদের নিজেদের অনুষ্ঠান শোনানোর চেষ্টায় ক্রমাগত নিজেদের রূপ বদলে চলেছে।

Raktim Dey
৩ মিনিট
আজও মহালয়ার ভোর মানেই রেডিও! আকাশবাণী থেকে এফএম, অব্যাহত নস্টালজিয়া

"আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি.."

বিগত শতকের শেষ দিকেও রেডিও সম্প্রচারের যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। নতুন প্রযুক্তির আগমনের পর মানুষের মধ্যে সেসবের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে শুরু করে, এবং প্রযুক্তির পৌষমাসই রেডিওর সর্বনাশ কিছুটা হলেও ডেকে এনেছিল। এখন তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। প্রায় একশো বছরের দোরগোড়ায় পৌঁছে বাঙালিদের কাছ থেকে শুধুমাত্র মহালয়ার দিন সকালে আকাশবাণী তার পুরনো খাতির কিছুক্ষণের জন্য ফিরে পায়। যদিও কিছু বেসরকারি সংস্থার রেডিও অফিস বিভিন্ন নতুন নতুন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নিজেদের জনপ্রিয়তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় কিছুটা সমর্থ হয়েছে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
রহস্যমৃত্যুর ডিপো! ডাকবাংলো মানেই অলৌকিকের হাতছানি

ডাকবাংলোর ভূতের গল্পে স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সেগুলি ঘিরে অসংখ্য রহস্যমৃত্যু। আত্মহত্যা থেকে খুন- সবকিছুই ডাকবাংলোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

১৯২৩-১৯২৪ সালে বম্বে, মাদ্রাজ এবং কলকাতার মানুষ নিজেদের প্রচেষ্টায় কিছু রেডিও ক্লাব গড়ে তুলেছিল। ১৯২৩ সালেই জন রুজ স্টেপলটনের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল বেঙ্গল রেডিও ক্লাব। এই জন স্টেপলটন টাইটানিক জাহাজের রেডিও রুমের নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বেঙ্গল রেডিও ক্লাব তাদের অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য মার্কনি কোম্পানির ছোট এফএ রেডিও ব্যবহার করত। আকাশবাণীর প্রথম সম্প্রচার হয়েছিল ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই। তখন তার নাম আকাশবাণী ছিল না। মুম্বই, বা তৎকালীন বম্বেতে ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি নাম নিয়ে আকাশবাণী আত্মপ্রকাশ করেছিল। মুম্বই রেডিও স্টেশন থেকেই আকাশবাণীর প্রথম সম্প্রচার হয়। ১৯২৭-পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানিকে সরকারি দফতরের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ১৯৩৬ সালে তার নাম বদলে হয়ে যায় আমাদের পরিচিত অল ইন্ডিয়া রেডিও। ১৯৫৭ সাল থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিও সাধারণ মানুষের মধ্যে সেই নামেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আকাশবাণীর বিখ্যাত সুরসংকেত তৈরি করেছিলেন জন ফোল্ডাস। বেহালা, তানপুরা, সেলো, ভায়োলা ব্যবহার করে আট সেকেন্ডের সেই সুর তৈরি করা হয়েছিল। একবার সুর বাজার শেষে দশ সেকেন্ডের বিরতির পুনরায় আট সেকেন্ড সুর। এই পদ্ধতিতে সেই বিখ্যাত সুরসংকেত বাজানো হয়।

কলকাতায় আকাশবাণীর প্রথম অফিস ছিল গার্স্টিন প্লেসের দুই এবং তিনতলায়। ১৯২৭ সালের ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় এই বেতার অফিসের উদ্বোধন করেছিলেন বাংলার তৎকালীন গভর্নর স্যর স্ট্যানলি জ্যাকসন। তখন গার্স্টিন প্লেসের একতলায় এক ইউরোপীয়র ওয়াইন শপ ছিল। সেই দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একতলাতেও আকাশবাণীর অফিস খোলা হয়েছিল। গার্স্টিন প্লেসের সিঁড়িগুলি কাঠের ছিল। সেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার ফলে তৈরি হওয়া অবাঞ্ছিত আওয়াজ কাজের ক্ষতি করত। তাই সিঁড়িগুলি মোটা কার্পেট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। কার্পেট দিয়ে ঢেকে অবাঞ্ছিত শব্দ এড়িয়ে গেলেও রেডিও অফিসে ভূতের গল্প এড়ানো যায়নি। গার্স্টিন প্লেসের ভূতের গল্প আজও অনেক সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। দোতলায় চেয়ারে বসে থাকা গোরা সাহেবের ভূত থেকে রাতের বেলা পিয়ানোর আওয়াজের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সেই ভূত দেখা এবং শোনার গল্প। কথিত আছে যে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র এই বাড়ির দোতলায় এক গোরা সাহেবের ভূত দেখেছিলেন।

শুরুতে আকাশবাণীর ঠিকানা গার্স্টিন প্লেস হলেও পরবর্তীকালে হাই কোর্টের কাছে ইডেন গার্ডেনসের পাশের বাড়ি আকাশবানীর ঠিকানা হয়েছিল। সেখানেই বর্তমানে আকাশবাণীর অফিস রয়েছে। আকাশবাণী কলকাতার সঙ্গে বহু বিখ্যাত মানুষের নাম জড়িয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে পঙ্কজ মল্লিক, রায়চাঁদ বড়াল, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, কাজি নজরুল ইসলাম বিভিন্ন সময় আকাশবাণী কলকাতার বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন।

ভারতে রেডিও সম্প্রচারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে যে, সময়ের সঙ্গে রেডিও এবং সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের ধরনে অনেক বদল এসেছে। প্রথমে ছোট রেডিও ক্লাবগুলো শুধুমাত্র গান এবং আলোচনা-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করত। ধীরে ধীরে রেডিওতে দৈনিক সংবাদ এবং শ্রুতিনাটক সম্প্রচার শুরু হয়েছিল। সংবাদ ছাড়াও বিভিন্ন নতুন ধরনের সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। সেই সময় প্রতি রবিবার সম্প্রচারিত হওয়া 'বিরূপাক্ষর আসর' মানুষের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল ।মহালয়ার সকালে সম্প্রচারিত মহিষাসুরমর্দিনী যেমন আজও মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়।

কলকাতায় আকাশবাণীর একচেটিয়া আধিপত্য প্রথমে টেলিভিশন এবং পরে নতুন এফএম চ্যানেলগুলোর দৌলতে কমতে শুরু করে। এই নতুন এফএম চ্যানেলগুলো শুধুমাত্র সংগীত অথবা টুকটাক খবর পরিবেশনে থেমে থাকেনি। তারা নিজেদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে তুলতে থাকে। শ্রোতারা তাদের ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দিতে শুরু করেন। এছাড়া বিভিন্ন গল্পপাঠ এবং হাসির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তারা শুধু গান এবং খবরের একঘেয়েমি কাটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকে। কলকাতায় এই শতকের শুরু থেকে রেড, পাওয়ার, রেডিও মির্চি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে শুরু করে। নতুন শতকে রেডিও শ্রোতাদের জন্য নতুন সম্প্রচারকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় নাম মীর। রেডিও মির্চির সকালবেলার অনুষ্ঠান হোক অথবা সানডে সাসপেন্সের গল্পপাঠ- মীর সাধারণ মানুষের মধ্যে খুব পরিচিত একটা নাম। তাই তাঁর রেডিও মির্চি ছেড়ে দেওয়া আলোড়িত করেছে অনেককেই।

বর্তমানে সম্প্রচার শুনতে আর রেডিওর আলাদা যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না। বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের মুঠোফোন সেই কাজ করে দিতে পারে। কলকাতায় রেডিওর যাত্রা শুরুর গার্স্টিন প্লেস আজ মাটিতে মিশে গিয়েছে। রেডিওতে নতুন অনুষ্ঠান এবং সম্প্রচারক দর্শকদের নিজেদের অনুষ্ঠান শোনানোর চেষ্টায় ক্রমাগত নিজেদের রূপ বদলে চলেছে। এই সবকিছুর মধ্যেই বাঙালি আজও মহালয়ার সকালে রেডিও চালিয়ে শুনতে চায়, কখন বেজে উঠবে "অশ্বিনের শারদপ্রাতে... ।"

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কৈলাসী থেকে দশাবতারী, দুর্গার চালচিত্রে যেভাবে ধরা পড়ে বাংলার পুরাণ ও লোকবিশ্বাস

Durga Puja Chalchitra: প্রতিমার ঠিক পিছনে যে অর্ধবৃত্তাকার বা বিস্তৃত কাঠামো থাকে, তাকে বলা হয় চালি। আর তার উপর অঙ্কিত কাহিনিমূলক চিত্রই হলো চালচিত্র। তবে এই চালচিত্রকে শুধুমাত্র শৈল্পিক অলংকরণ হিসেবে দেখা যায় না, বরং বহু শতাব্দীর ধর্মীয় স্মৃতি, লোকবিশ্বাস, পুরাণকথা, সামাজিক কল্পনা ও নন্দনতাত্ত্বিক চেতনার এক জটিল ও সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হলো এই চালচিত্র।

অথর ইজ ডেড, যে লেখে সে আমি নয় এআই?

Caine Prize winning story AI allegations: ১১ অক্টোবর লেখক ও সাংবাদিক ভোহিনি ভারা ‘দ্য আটলান্টিক’-এ একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন—যার শিরোনাম ছিল “Yet Another Literary Prizewinner Seems to Be AI”। সেখানে তিনি জানান, ‘পাংগ্রাম’ নামের একটি এআই-ডিটেকশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে গল্পটি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে এটি প্রায় পুরোটাই কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত।

জমিদারগিন্নির অপমানের জবাব দিতেই শুরু পাঞ্জা বাড়ির দুর্গাপুজো

Panja family Durga Puja: এক বর্ষামুখর দুর্গাষ্টমীর দিনে জমিদারবাড়ির মহিলারা, জমিদারগিন্নির সঙ্গে, বাড় সিউড়ির দুর্গাপ্রতিমা দর্শনে যান। ফেরার পথে কর্দমাক্ত রাস্তা পেরোনোর সময় দামি শাড়ি কাদা থেকে বাঁচাতে তাঁরা শাড়ির পাড় কিছুটা তুলে হাঁটছিলেন। কথিত আছে, তা দেখে পাড়ার কয়েকজন কটূক্তি করে বলেন— “পাঞ্জা বাড়ির বউ কাপড় উঠিয়ে চলছে!”

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?