এক তরুণী লাল ব্লাউজ ছুড়েছিলেন উত্তমকুমারের দিকে

উত্তম সবসময় সুচিত্রাকে রমা নামে ডাকতেন। কখনও সুচিত্রা নামটি তাঁর মুখে শুনিনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমাকে এত ভালো দেখতে যে, শুধু ওকে দেখার জন্যই তো হাজার হাজার লোক আসে। আমার সবথেকে সুন্দরী, গ্ল্যামারাস নায়িকা কিন্তু রমা।

Ranjan Bandyopadhay
৩ মিনিট
এক তরুণী লাল ব্লাউজ ছুড়েছিলেন উত্তমকুমারের দিকে

আমার সাংবাদিক জীবনের এক বড় অংশজুড়ে বিরাজ করছেন উত্তমকুমার। সূর্য উঠলে যেমন চাঁদ-তারা সব অদৃশ্য হয়, তেমনই উত্তমকুমারের কথা ভাবলে অন্য সেলিব্রিটিরা সব মন থেকে উধাও হন। উত্তমকুমার আমার স্মৃতিতে একই সঙ্গে আকাশ এবং তেপান্তর। শেষ নেই তাঁর। এবং তাঁর ধারেকাছেও কেউ নেই। এমন বাঙালি আমি আর দেখিনি। বাকি জীবন দেখব না, আমি জানি। যাঁরা উত্তমকে দেখেননি, তাঁর সঙ্গে গল্প করে, আড্ডা দিয়ে সময় কাটাননি, তাঁদের কী করে বোঝাই কেমন সেই দুর্লভ কোহিনুর!

উত্তমকুমারকে প্রথম দেখি স্টার থিয়েটারের মঞ্চে। তিনি 'শ্যামলী' নাটকের নায়ক। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বোবা নায়িকা। আর আমি তখন ছাত্র। পিছন ফিরে থাকলে সেই নাটকের সব ঝাপসা আমার স্মৃতিতে। আমার নস্টালজিয়া ও মনকেমনকে আলো করে আছেন উত্তম। কোনওদিন মুছে যাবে না উত্তমের সেই মঞ্চ উপস্থিতির দীপন। তিনি যে সূর্য, তখনই বোঝা গিয়েছিল। সেই সূর্যকে মঞ্চ সামলাতে পড়েনি। উত্তমকুমারকে শুধু এক ঝলক দেখার জন্য স্টার-এর সামনে এমন প্রবল জনজোয়ার যে, পুলিশ সামলাতে পারত না। কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চল বিপর্যস্ত হতো। আর স্টার-এ মাসের পর মাস শ্যামলীর শো হাউসফুল। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেছে কি?

এই সময় ভয়ংকর বন্যা হলো বাংলায়। উত্তমকুমার বেরিয়েছিলেন ত্রাণ সংগ্রহে। সেই অনন্য দৃশ্য ভুলব না কোনওদিন। কলকাতার রাস্তায় এবং বারান্দায় কুমারী এবং বিবাহিতা সুন্দরীদের উদ্বেল, আগ্রহী সাড়া! এমন ত্রাণদান আর তো কখনও, কোথাও দেখিনি। মেয়েরা সোনার গয়না ছুড়ে দিচ্ছেন উত্তমকুমারের হাতে! সত্যি দেখেছি। কিন্তু এক বিবাহিতা তরুণী নিজেকেই দিয়ে দিলেন উত্তমকুমারকে! কীভাবে? দৃশ্যটা এইরূপ। উপচে পড়ছে দোতলার বারান্দা। আমি সেই বারান্দার সামনে শ্যামবাজারের রাস্তায়। সাদা ডুরে শাড়ি আর টুকটুকে স্লিভলেস ব্লাউজ পরা সুন্দরী সেই বারান্দার মধ্যমণি। পাশের পুরুষটি সম্ভবত তাঁর স্বামী। উত্তম জোড়হাত করে প্রার্থী ছিপছিপে সুন্দরীর কাছে। সুন্দরী মুহূর্তে এলো করলেন তাঁর ঢেউ তোলা কেশ। তারপর খুলে ফেললেন তাঁর অঙ্গের লাল ব্লাউজ। ছুঁড়ে দিলেন উত্তমের দিকে। ঝিলিক দিল সুন্দরীর পার্শ্ব স্তনরেখা! বন্যার শ্রেষ্ট ত্রাণদান!

এই ঘটনার বহু বছর পর আমি উত্তমের ময়রা স্ট্রিটের বিপুল অ্যাপার্টমেন্টে। এই অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই বাঁদিকে চারটে বন্ধ সাদা দরজা। পরপর ঘর। মাঝের ঘরটি উত্তম-সুপ্রিয়ার বেডরুম। যে ঘরে আমি উত্তমের সঙ্গে, সেটি সুপারস্টারের লিভিং রুম। সামনের দেওয়ালে তিনি এক দেওয়ালজোড়া ছবিতে তাকিয়া ঠেস দিয়ে কার্পেটের ওপর ভুবনভোলানো হাসি হেসে তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক‍্যামেরার দিকে তাকিয়ে। ঘরের মাঝখানে বিশাল এক গণেশ মূর্তি। পিছনে দশজন বসার মতো পেল্লাই ডাইনিং টেবিল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'দুষ্টু লোক' বলে ইন্টারভিউ দিলেন না সুচিত্রা সেন

সুচিত্রা তেমনভাবে শরীর দেখাননি কখনও। তাঁর ছিল ঢাকা না-ঢাকার খেলা। এই খেলার তিনি দেবী। কামকলা তাঁর শরীরে বইছে নদীর মতো। এই নিরন্তর বহতা নিয়ে তিনি তাঁর বাড়ির দীর্ঘ বারান্দা পেরিয়ে আমার কাছে, একেবারে সামনে, এসে দাঁড়ালেন।

গণেশের পাশেই বসার রাজকীয় আয়োজন। সেখানে উত্তম আর আমি সামনাসামনি। এক বর্ষার বিকেলে। অবিস্মরণীয় বিকেল আমার জীবনে। উত্তমকে প্রশ্ন করলাম, মেয়েরা আপনাকে দেখে নিজেদের সামলাতে পারেনা কেন?

প্রশ্ন শুনে উত্তমের হাসি আজও মনকেমনের গায়ে বিদ্যুৎ রেখা। এই বিদ্যুতে কোনও লোডশেডিং নেই। হাসতে হাসতে উত্তম বললেন, মেয়েরা কখন নিজেদের সামলাতে পারে বা পারে না, দেবতারাও জানে না। আমি বললাম, এই যুগের মেয়ের মন জানা সত্যিই দেবতার সাধ্যের অতীত। আপনিই একমাত্র ভরসা। আবার হাসতে হাসতে উত্তম তাকালেন কোনাকুনি বসে থাকা এক মহিলার দিকে। বললেন, কী গো, উত্তমকুমারকে তোমাদের এমন ভালো লাগার রহস্যটা কী ? রসিকা মহিলার উত্তরটি আমাদের অবাক করলো। মহিলা বললেন, আপনি যতটা ইনোসেন্ট, ঠিক ততটাই ডেঞ্জারাস! মেয়েদের পাগল হওয়ার কারণ এটাই। উত্তম এই উত্তর শুনে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, তুমি যে আমার চরিত্র হনন করলে। জানো, তোমার বিরুদ্ধে আমি মামলা ঠুকতে পারি? তারপর সেই অতুলনীয় হাসি!

আর একদিন ময়রা স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টে উত্তমকুমার আড্ডার মেজাজে। এই দিন আমরা বসেছি তাঁর ছোট্ট অ্যান্টি-রুমে। অ্যাপার্টমেন্টের পিছনে। ভারি সুন্দর করে সাজানো ঘর। এই ঘরে পেয়েছি নির্জনতম, অন্তরঙ্গ উত্তমকে। জানতে চেয়েছিলাম, উত্তম-সুচিত্রা জুটির এমন সুপারহিট হওয়ার কারণ কী?

উত্তম সবসময় সুচিত্রাকে রমা নামে ডাকতেন। কখনও সুচিত্রা নামটি তাঁর মুখে শুনিনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমাকে এত ভালো দেখতে যে, শুধু ওকে দেখার জন্যই তো হাজার হাজার লোক আসে। আমার সবথেকে সুন্দরী, গ্ল্যামারাস নায়িকা কিন্তু রমা। আমার অনেক ভাগ্য যে রমা আমার একের পর এক হিট ছবির নায়িকা!

শুধু ছবির নায়িকা? জীবনের নয়? সিনেমা পেরিয়ে আপনাদের প্রেম কোনওদিন আপনাদের জীবনে পৌঁছয় নি? আপনি সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েননি?

আমার এই অকপট প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন উত্তম। সেকথা আমি লিখেওছিলাম একটি লেখায়। উত্তম-সুচিত্রা দু'জনেই তখন জীবিত।

পরের লেখায় সেই প্রসঙ্গ!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সুচিত্রা সেনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন উত্তমকুমার, উত্তরে কী বলেছিলেন মহানায়িকা?

উত্তম মৃদু হেসে বলেন, রমার সঙ্গে আমার কেমিস্ট্রির মিল, বুঝলে হে! এই জিনিস অভিনয় করে তৈরি করা যায় না। কেমিস্ট্রির বাংলাটা কী হবে বলো তো?

মানহানির মামলার হুমকি দিয়েছিলেন উত্তমকুমার, কী ছিল সেই বিতর্কিত সাক্ষাৎকারে

একটা সিম্পল ইন্টারভিউ। যে ইন্টারভিউ প্রমাণ করবে, উত্তমকুমারের গ্ল্যামার, কারিশমা সব নেহাত ওপরের ব্যাপার। ভেতরের মানুষটা নেহাত সাধারণ। অর্থাৎ, খুব আস্তে আস্তে মানুষটির পায়ের তলা থেকে কার্পেটটা সরিয়ে নিতে হবে।

প্লেনে দু'জনে দাঁড়িয়ে গল্প করেছিলাম, অপর্ণার মতো বন্ধু হয় না

একবার উড়ানে দেখা হলো অপর্ণার সঙ্গে। একেবারে অপ্রত্যাশিত দেখা হওয়া। দু'জনেই যাচ্ছি আমেরিকায়। অপর্ণা বিজনেস ক্লাস। আমি সাধারণ শ্রেণি। আমরা ক্লাসলেস হয়ে স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করলাম। এই অপর্ণাকে কোনওদিন ভুলব না।

'হিমালয়ের মতো পথ আগলে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তাই দুম করে মারলাম হিমালয়কে লাথি'

দুর্গাপুজোর মধ্যে চলে গেলেন সুনীলদা। সকালবেলা টিভি চ্যানেল থেকে ফোন, সুনীলদা নেই, কিছু বলবেন?

'দুগ্গাপুজোয় শুধু নতুন জুতো হলেই হবে! নতুন সেক্স চাই না?' পুজোর সোনাগাছির গোপন কথা

Redlight Area: অষ্টমীর অপরাহ্ন গড়িয়ে যায় অষ্টমীর সন্ধ‍্যায়। বাবুদের ভিড় বাড়তেই থাকে। লক্ষ্য করি, নাগরীরা সবাই পড়েছে নতুন কাপড়। নিজেরা কিনেছে? না বাবুরা দিয়েছে?

মহাভারতে সতীত্বের কোনও চিহ্ন নেই, বলেছিলেন রাধাপ্রসাদ গুপ্ত

Bengali Journalism: আজকাল দেখেছি অধিকাংশ সাংবাদিক নানা বিষয়ে পড়াশোনা করেন না। একটা সময় এমন ছিল না।

দুর্ঘটনায় একা হয়ে যাওয়া, আদরের উপোস! কাবেরী বসুকে যেভাবে চিনেছি

Kaberi Basu: দুর্ঘটনার পরে কাবেরী বহুদিন সিনেমা করেনি। অনেকদিন পরে কাবেরী সিনেমায় ফিরল সত্যজিৎ রায়ের 'অরণ্যের দিনরাত্রি' ছবিতে...