এক তরুণী লাল ব্লাউজ ছুড়েছিলেন উত্তমকুমারের দিকে

উত্তম সবসময় সুচিত্রাকে রমা নামে ডাকতেন। কখনও সুচিত্রা নামটি তাঁর মুখে শুনিনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমাকে এত ভালো দেখতে যে, শুধু ওকে দেখার জন্যই তো হাজার হাজার লোক আসে। আমার সবথেকে সুন্দরী, গ্ল্যামারাস নায়িকা কিন্...

আমার সাংবাদিক জীবনের এক বড় অংশজুড়ে বিরাজ করছেন উত্তমকুমার। সূর্য উঠলে যেমন চাঁদ-তারা সব অদৃশ্য হয়, তেমনই উত্তমকুমারের কথা ভাবলে অন্য সেলিব্রিটিরা সব মন থেকে উধাও হন। উত্তমকুমার আমার স্মৃতিতে একই সঙ্গে আকাশ এবং তেপান্তর। শেষ নেই তাঁর। এবং তাঁর ধারেকাছেও কেউ নেই। এমন বাঙালি আমি আর দেখিনি। বাকি জীবন দেখব না, আমি জানি। যাঁরা উত্তমকে দেখেননি, তাঁর সঙ্গে গল্প করে, আড্ডা দিয়ে সময় কাটাননি, তাঁদের কী করে বোঝাই কেমন সেই দুর্লভ কোহিনুর!

উত্তমকুমারকে প্রথম দেখি স্টার থিয়েটারের মঞ্চে। তিনি 'শ্যামলী' নাটকের নায়ক। সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বোবা নায়িকা। আর আমি তখন ছাত্র। পিছন ফিরে থাকলে সেই নাটকের সব ঝাপসা আমার স্মৃতিতে। আমার নস্টালজিয়া ও মনকেমনকে আলো করে আছেন উত্তম। কোনওদিন মুছে যাবে না উত্তমের সেই মঞ্চ উপস্থিতির দীপন। তিনি যে সূর্য, তখনই বোঝা গিয়েছিল। সেই সূর্যকে মঞ্চ সামলাতে পড়েনি। উত্তমকুমারকে শুধু এক ঝলক দেখার জন্য স্টার-এর সামনে এমন প্রবল জনজোয়ার যে, পুলিশ সামলাতে পারত না। কলকাতার হাতিবাগান অঞ্চল বিপর্যস্ত হতো। আর স্টার-এ মাসের পর মাস শ্যামলীর শো হাউসফুল। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেছে কি?

এই সময় ভয়ংকর বন্যা হলো বাংলায়। উত্তমকুমার বেরিয়েছিলেন ত্রাণ সংগ্রহে। সেই অনন্য দৃশ্য ভুলব না কোনওদিন। কলকাতার রাস্তায় এবং বারান্দায় কুমারী এবং বিবাহিতা সুন্দরীদের উদ্বেল, আগ্রহী সাড়া! এমন ত্রাণদান আর তো কখনও, কোথাও দেখিনি। মেয়েরা সোনার গয়না ছুড়ে দিচ্ছেন উত্তমকুমারের হাতে! সত্যি দেখেছি। কিন্তু এক বিবাহিতা তরুণী নিজেকেই দিয়ে দিলেন উত্তমকুমারকে! কীভাবে? দৃশ্যটা এইরূপ। উপচে পড়ছে দোতলার বারান্দা। আমি সেই বারান্দার সামনে শ্যামবাজারের রাস্তায়। সাদা ডুরে শাড়ি আর টুকটুকে স্লিভলেস ব্লাউজ পরা সুন্দরী সেই বারান্দার মধ্যমণি। পাশের পুরুষটি সম্ভবত তাঁর স্বামী। উত্তম জোড়হাত করে প্রার্থী ছিপছিপে সুন্দরীর কাছে। সুন্দরী মুহূর্তে এলো করলেন তাঁর ঢেউ তোলা কেশ। তারপর খুলে ফেললেন তাঁর অঙ্গের লাল ব্লাউজ। ছুঁড়ে দিলেন উত্তমের দিকে। ঝিলিক দিল সুন্দরীর পার্শ্ব স্তনরেখা! বন্যার শ্রেষ্ট ত্রাণদান!

আরও পড়ুন: ‘দুষ্টু লোক’ বলে ইন্টারভিউ দিলেন না সুচিত্রা সেন

এই ঘটনার বহু বছর পর আমি উত্তমের ময়রা স্ট্রিটের বিপুল অ্যাপার্টমেন্টে। এই অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতেই বাঁদিকে চারটে বন্ধ সাদা দরজা। পরপর ঘর। মাঝের ঘরটি উত্তম-সুপ্রিয়ার বেডরুম। যে ঘরে আমি উত্তমের সঙ্গে, সেটি সুপারস্টারের লিভিং রুম। সামনের দেওয়ালে তিনি এক দেওয়ালজোড়া ছবিতে তাকিয়া ঠেস দিয়ে কার্পেটের ওপর ভুবনভোলানো হাসি হেসে তারাপদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক‍্যামেরার দিকে তাকিয়ে। ঘরের মাঝখানে বিশাল এক গণেশ মূর্তি। পিছনে দশজন বসার মতো পেল্লাই ডাইনিং টেবিল।

গণেশের পাশেই বসার রাজকীয় আয়োজন। সেখানে উত্তম আর আমি সামনাসামনি। এক বর্ষার বিকেলে। অবিস্মরণীয় বিকেল আমার জীবনে। উত্তমকে প্রশ্ন করলাম, মেয়েরা আপনাকে দেখে নিজেদের সামলাতে পারেনা কেন?

প্রশ্ন শুনে উত্তমের হাসি আজও মনকেমনের গায়ে বিদ্যুৎ রেখা। এই বিদ্যুতে কোনও লোডশেডিং নেই। হাসতে হাসতে উত্তম বললেন, মেয়েরা কখন নিজেদের সামলাতে পারে বা পারে না, দেবতারাও জানে না। আমি বললাম, এই যুগের মেয়ের মন জানা সত্যিই দেবতার সাধ্যের অতীত। আপনিই একমাত্র ভরসা। আবার হাসতে হাসতে উত্তম তাকালেন কোনাকুনি বসে থাকা এক মহিলার দিকে। বললেন, কী গো, উত্তমকুমারকে তোমাদের এমন ভালো লাগার রহস্যটা কী ? রসিকা মহিলার উত্তরটি আমাদের অবাক করলো। মহিলা বললেন, আপনি যতটা ইনোসেন্ট, ঠিক ততটাই ডেঞ্জারাস! মেয়েদের পাগল হওয়ার কারণ এটাই। উত্তম এই উত্তর শুনে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, তুমি যে আমার চরিত্র হনন করলে। জানো, তোমার বিরুদ্ধে আমি মামলা ঠুকতে পারি? তারপর সেই অতুলনীয় হাসি!

আর একদিন ময়রা স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টে উত্তমকুমার আড্ডার মেজাজে। এই দিন আমরা বসেছি তাঁর ছোট্ট অ্যান্টি-রুমে। অ্যাপার্টমেন্টের পিছনে। ভারি সুন্দর করে সাজানো ঘর। এই ঘরে পেয়েছি নির্জনতম, অন্তরঙ্গ উত্তমকে। জানতে চেয়েছিলাম, উত্তম-সুচিত্রা জুটির এমন সুপারহিট হওয়ার কারণ কী?

উত্তম সবসময় সুচিত্রাকে রমা নামে ডাকতেন। কখনও সুচিত্রা নামটি তাঁর মুখে শুনিনি। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, রমাকে এত ভালো দেখতে যে, শুধু ওকে দেখার জন্যই তো হাজার হাজার লোক আসে। আমার সবথেকে সুন্দরী, গ্ল্যামারাস নায়িকা কিন্তু রমা। আমার অনেক ভাগ্য যে রমা আমার একের পর এক হিট ছবির নায়িকা!

শুধু ছবির নায়িকা? জীবনের নয়? সিনেমা পেরিয়ে আপনাদের প্রেম কোনওদিন আপনাদের জীবনে পৌঁছয় নি? আপনি সুচিত্রা সেনের প্রেমে পড়েননি?

আমার এই অকপট প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন উত্তম। সেকথা আমি লিখেওছিলাম একটি লেখায়। উত্তম-সুচিত্রা দু'জনেই তখন জীবিত।

পরের লেখায় সেই প্রসঙ্গ!

More Articles

;