কুস্তিগীরদের নাছোড় আন্দোলন থেকে কেন সরে দাঁড়ালেন সাক্ষী?

Sakshi Malik: কেন অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পরেই আন্দোলন থেকে সরে আসতে হল সাক্ষীকে?

Sohini Das
৩ মিনিট
কুস্তিগীরদের নাছোড় আন্দোলন থেকে কেন সরে দাঁড়ালেন সাক্ষী?

'জীবন আসলে বাঁধা পাকস্থলীতে'। না, সে কথাটা মিথ্যে নয়। আর মিথ্যে যে নয়, তা ফের একবার টের পাওয়া গেল কুস্তিগীরদের আন্দোলনের ময়দানেও। গত কয়েক সপ্তাহ জুড়ে খবরের কাগজের পাতা থেকে সংবাদমাধ্যম ভরে ছিল কুস্তিগীরদের প্রতিবাদ-লড়াইয়ের শিরোনামে। 'অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে' - দু'জনেই যে সমান অপরাধে দোষী। সেই শিক্ষা বুকে নিয়েই লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছিলেন কুস্তিগীরেরা। কিন্তু সব শিক্ষা, সব আদর্শকে এ দেশে বরাবর মাথা নোয়াতে হয়েছে ওই পাকস্থলীর প্রশ্নে এসে। এখানেও ব্যতিক্রম হল না। আন্দোলন থেকে সরে এলেন স্বর্ণজয়ী কুস্তিগীর সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগটরা। কার্যত সরে আসতে বাধ্য হলেন।

এক নয়। একের পর এক যৌন হেনস্থা, ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে ভারতীয় কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান ব্রিজ ভূষণ শরণ সিংয়ের বিরুদ্ধে। পদাধিকার বলে দিনের পর দিন মহিলা কুস্তিগীরদের সঙ্গে ওই আচরণ করে এসেছেন তিনি। হবে না-ই বা কেন! একে কুস্তি ফেডারেশনের প্রধান, তার উপরে তিনি আবার বিজেপির হেভিওয়েট নেতা। তার সঙ্গে রয়েছে চড়া হিন্দুত্ববাদীর লেবেলও। ফলে ছ-ছ'বারের সাংসদের যে এমন আচরণের টিকিট রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। টিকিট রয়েছে বলছি, কারণ এত এত অভিযোগ, পদকজয়ী কুস্তিগীরদের আন্দোলন সত্ত্বেও নির্বিকার পুলিশ, নির্বিকার প্রশাসন, সর্বোপরি নির্বিকার সরকার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহিলা কুস্তিগীরদের দিনের পর দিন যৌন হেনস্থার অভিযোগ! কে এই বিজেপির বাহুবলী ব্রিজ ভূষণ?

WFI Chief Brij Bhushan Singh: কুস্তিগীর ভিনেশ ফোগাট দাবি করেছেন, তিনি ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ব্রিজ ভূষণ শরণ সিংয়ের আচরণ সম্পর্কে সবটা বলেছিলেন।

আর এ সবের সামনেই মাথা নোয়াতে হয় সাক্ষী, ভিনেশদের মতো পদকজয়ী রেসলারদের। ধর্ষক, যৌনহেনস্থাকারীর গ্রেফতারি চেয়ে যন্তরমন্তরে ধর্না থেকে গঙ্গায় পদক ভাসাতে চাওয়াটুকুই সার হয়ে থেকে যায়। তার পর কোনও এক শনিবারের বিকেলে ডাক আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে। কথা বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টির চাণক্য। আর সোমবারই তার ফল মেলে হাতে হাতে। সাক্ষী জানিয়ে দেন, আন্দোলনের মাঠ থেকে সরে আসছেন তিনি। ফিরে যান, সরকারের দেওয়া রেলের চাকরিতে। জানিয়ে দেন, এ একান্ত তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

এই ভাবে আস্তে আস্তে ময়দান ফাঁকা হতে থাকে। ধর্নাকারীদের ভিড় কমবে একে একে। সকলেই ফিরে যাবেন আপন কুলায়। ভাত মেখে খাবে, ঘাম মুছে ঘুমোতে যাবে। সকাল হলে দুধ কিনতে বেরোবে। জীবন চলবে জীবনের ধর্ম মেনে। এমনটাই হয়। এমনটাই হয়ে এসেছে। সমস্ত উত্তাপ, কণ্ঠস্বর প্রশমিত হলে উড়তে থাকবে শাসকের ধ্বজা। আসলে, কোন সুতোয় টান পড়লে কোন পুতুল নাচবে, কীভাবে নাচবে, তা ছকা আছে আগেই।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নতুন সংসদ ভবন হোক বা কুস্তিগীরদের অবজ্ঞা— বিজেপির চাল তবে সফল?

Wrestler's Protest: সব কিছুরই একটাই হাতে গরম সমাধান মোদি সরকারের কাছে রয়েছে — 'জাতীয়তাবাদ'।

কেন অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পরেই আন্দোলন থেকে সরে আসতে হল সাক্ষীকে? কেন নিজের জায়গায় অনড় থাকতে পারেন না সাক্ষীর মতো আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ, তার উত্তর ঝুলতে থাকে জীবিকা ও পেট নামক 'খুঁড়োর কল'-এর আগায়। মানুষ ছোটে, সাক্ষী-ভিনেশরা ছোটেন। ছুটতে হয়। কারণ ওই যে, জীবন আসলে বাঁধা পাকস্থলীতে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত সহজেই যদি নতিস্বীকার করতে হয়, তাহলে সেই আন্দোলনের সারবত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে হয় বৈকি। কিন্তু এই ব্যর্থতা আদতে সাক্ষী বা ভিনেশের নয়। এই ব্যর্থতা সমাজব্যবস্থার, আমাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির। যেখানে সাক্ষীদের মতো পদকজয়ী ক্রীড়াবিদদেরও শাসকের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। পেট চালাতে বন্ধ রাখতে হয় মুখ। যে পদক একদিন নিজের ক্ষমতায় অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন, সেই পদক নিয়ে গঙ্গার পারে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। এ কার্যত সভ্যতার লজ্জা। যদিও সাক্ষীরা জানিয়েছেন, এর পরেও আন্দোলন চলবে। তবে সত্যিই কি চলবে! রামরাজ্যে প্রশ্ন জাগে বৈকি।

সব আন্দোলন একদিন স্তিমিত হবে। ছাতি চওড়া করে ঘুরে বেড়াবেন ব্রিজ ভূষণেরা। বাবরি ধ্বংস মামলার প্রথম সারির নেতার পর আরও নয়া পালক এসে জড়ো হবে মুকুটে। ফের মিলবে সাংসদ পদ। আর যারা পরবর্তীতে আসবেন ভারতের হয়ে কুস্তি শিখতে। নাম লেখাবেন কুস্তি ফেডারেশনে। ভবিষ্যতে যাঁরা দেশ-বিদেশের প্রতিযোগিতায় ছিনিয়ে আনবেন পদক, তাঁরাও শিখে যাবেন। শিখে যাবেন, উঁচুতে উঠতে গেলে কীভাবে ক্ষমতাশালীর হাতে নিগ্রীহিত হতে হয়। কীভাবে যৌন হেনস্তা সহ্য করে নিতে হয় দাঁতে দাঁত চেপে। কীভাবে অন্যায় সহ্য করে নিতে হবে মুখ বুজে। তবেই মিলবে কুস্তিগীরের মর্যাদা, তবেই মিলবে সরকারি চাকরি। কারণ সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ শিখিয়ে দিয়ে যাবে, প্রতিবাদীদের পাশে প্রশাসন বা সরকার দাঁড়াবে না কোনও মতেই। বিশেষত অভিযুক্ত যদি হেভিওয়েট 'হিন্দুত্ব' ছাপ নেতা হন, তাহলে তো প্রশ্নই ওঠে না।

এই মহাদেশে বড় তাড়াতাড়ি বিস্মৃতির সন্ধ্যা নামে। এই সব অভিযোগ, প্রতিবাদ-আন্দোলনের কথা বেশিদিন মনে থাকবে না কারও। ঝাঁ-চকচকে সংসদভবন, জাঁকজমকের পুজোপার্বণ আর 'আজাদির অমৃত মহোৎসব'-এর ফাঁকে এসব তেতো-কথা হারিয়ে যাবে দেখো ঠিক..

লিখেছেন
Sohini Das
Sohini Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

সরবোন থেকে যন্তরমন্তর: যে আগুন বারবার বদলে দেয় পৃথিবীকে

May 1968 France student protests: এই যে ছেলেমেয়েরা যন্তরমন্তরের রাস্তায় স্লোগান দিচ্ছে, ধারাশ্রাবণের ভয় পিছনে ফেলে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের দিকে এগিয়ে গেল, দক্ষিণী এক বৃদ্ধ তার ধুতি সামলাতে সামলাতে ছুটছেন তাদের সঙ্গে—কী মনোরম এই বারিপাত! কেমন যেন একটা দুর্দান্ত ফ্ল্যাশব্যাকে ঘুরে গেল সময়।

অঙ্কিতা ভাণ্ডারী মামলা: তিন অভিযুক্তের সাজা হয়েও মেটেনি ‘ভিআইপি’ রহস্য

Ankita Bhandari case highlights :অঙ্কিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, গৌতমই সেই ভিআইপি, যিনি তাঁদের মেয়েকে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে গৌতমের রাজ্যপাল নিয়োগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন, এই যুক্তিতে যে এই ‘ভিআইপি’কে কোনো পদে বহাল থাকার অনুমতি দেওয়ার আগে সিবিআই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত।

জিডিপির বাইরে উন্নয়নের হিসাব, ভারতের অর্থনীতিকে অন্য চোখে দেখতে শিখিয়েছেন জঁ দ্রেজ

Economist Jean Drèze: দিল্লিতে সিজেপি বিক্ষোভের সময় পুলিশ আটক করল অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজকে। অমর্ত্য সেনের সহযোগী এই অর্থনীতিবিদ MGNREGA ও জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ২০২৬- এ পেয়েছেন গ্লোবাল ইনইকুয়ালিটি রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড।

জ্ঞানেশ বিরোধী আন্দোলন: তারুণ্য যা শেখালো ইন্ডিয়া জোটকে

Youth Protests and Opposition Unity: সংসদীয় রাজনীতিতে যেখানে প্রবীণ নেতারা ঐক্যের পথ খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছিলেন, সেখানেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে রাজপথে নামা তরুণ প্রজন্ম বিরোধীদের নতুন করে এক ছাতার তলায় আসার পথ তৈরি করছে।

কেন তুলে দিতে হচ্ছে মাদ্রাসা কমিশন? প্রশ্ন শিক্ষামহলের

West Bengal decides to merge Madrasah Service Commission: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৫ অক্টোবরের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের সঙ্গে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার।

আমার উৎসব, ওঁদের আরও একটা দীর্ঘ কাজের দিন

Durga Puja for Gig Workers: গিগ কর্মীদের দুর্গাপুজোর চার দিন কীভাবে কাটে? বাড়তি উপার্জনের আশায় ব্যক্তিগত আনন্দ, উৎসবের আমেজ আর প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটানোর সময় থেকে কতটা বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের?

বাংলাদেশে রবীন্দ্র-বিরোধিতা নিয়ে কী বলছেন বুদ্ধিজীবীরা?

Tagore graffiti vandalism Bangladesh: বাংলাদেশে কেন টার্গেট রবীন্দ্রনাথ? বুদ্ধিজীবীরা কী বলছেন?

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।