সেলফির চোটে ১৫০ বছরের ঐতিহ্য খান খান! ছবি না তুললে কি পিছিয়ে পড়তে হয় সমাজে?

Selfie Obsession: মূর্তিটি ১৫০ বছরের পুরোনো। এই প্রাচীন মূর্তিটির বর্তমান মূল্য প্রায় ২০০,০০০ ইউরো।

inscript
৩ মিনিট
সেলফির চোটে ১৫০ বছরের ঐতিহ্য খান খান! ছবি না তুললে কি পিছিয়ে পড়তে হয় সমাজে?

যেখানে যা কিছু ঘটে যাক না কেন, সেই মুহূর্তটি যদি আপনি ক্যামেরায় না ধরে রাখতে পারেন, আপনার সাতদিনের ফাঁসি, আর তিন মাসের জেল হবেই হবে! বিবাহবাসরে যদি বর কনের সঙ্গে ছবি না তোলেন, যদি ক' পিস মুরগির ঠ্যাং চিবিয়েছেন তার ছবিসহ প্রমাণ না রাখেন, যদি শ্রাদ্ধবাসরে ছবি হয়ে যাওয়া মানুষটির সামনে ফুল দিতে গিয়ে হালকা হেসে ছবি না তুলে থাকেন, যদি বন্যায় ভেসে যাওয়া বাড়িঘরের সামনে আঙুলে ‘ভি’ মুদ্রা বা কাঁচকলা দেখিয়ে ছবি তুলে না রাখেন, ষোলো আনাই মিছা! আর যদি ঘুরতেই গিয়ে থাকেন, আপনার চোখের কোনও কাজই নেই, কাজল-মাস্কারা বা সানগ্লাস পরা ছাড়া। চোখে ইদানীং মানুষ আর কিছুই দেখেন না। দেখেন মোবাইলের স্ক্রিনে, দেখেন ফোনের পশ্চাতে উঁকি দেওয়া মারকাটারি সব লেন্সের মাধ্যমে। তা দেখতে গিয়ে প্রাণ চলে যাক, পা ফসকে যাক, তুলকালাম হয়ে যাক, ১৫০ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে যাক... পরোয়া নেই। সেলফি তুলতেই হবে। এই সেলফিখ্যাপা মানুষের পাল্লায় পড়ে সম্প্রতি ভেঙে খানখান হয়েছে ঐতিহাসিক ভাস্কর্য!

'এখানে ছবি তোলা নিষেধ' লেখা যেমন চোখে পড়ে, তেমনই আজকাল নানা স্থানে সেলফি কর্নারও দেখা যায়। এই দুইয়ের কোনওটাই নেই মানে এই বিশ্ব আমাদের অবাধ সেলফিযোগ্যা ভূমি। যেখানে যা দেখবে, যাকে দেখবে জড়িয়ে, জাপটে, হেলে দুলে ছবি তুলে ইতিহাসের পাতায় প্রমাণ রেখে যেতেই হবে। সোশ্যাল মিডিয়াতে না হলে আপনি পিছিয়ে পড়বেন। আপনি কোথায় কোথায় গেছেন, কী কী করেছেন প্রতি মুহূর্তের আপডেট পাবে না আপনার ফ্যানমহল। এই আপডেট জোয়ারে ভেসে গিয়েই সম্প্রতি খান খান হয়ে গিয়েছে প্রাচীন এক ভাস্কর্য। পর্যটকের সেলফিপ্রেমে সর্বনাশ হয়েছে ইতিহাসের।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পৃথিবীর ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুতে ব্যবহৃত হতো চাকা! নারকীয় যে ইতিহাস অবাক করবে

Breaking Wheel Torture: এই ধরনের নির্যাতন সাধারণত সেই ব্যক্তিদেরই করা হতো, যাদের প্লেগ ছড়ানোর জন্য সন্দেহ করা হতো।

একদল তরুণ জার্মান পর্যটক সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার জন্যই ছবি তুলতে বেরিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন উত্তর ইতালির একটি ভিলায়। সেই ভিলা ভাড়া নিয়ে ছিলেন তারা। মহা মূল্যবান এক মূর্তি দেখে নিজেদের আর ধরে রাখতে পারেননি। মূর্তিকে জড়িয়ে, প্রায় ঘাড়ে উঠে ছবি তুলেছেন। এই করতে গিয়েই ঘটেছে মহা বিপদ। সেলফির ঠেলায় ভেঙে গিয়েছে ওই প্রাচীন মূর্তি, জানিয়েছেন ভিলার ম্যানেজার ব্রুনো গোলফেরিনি। এই গোটা ঘটনাটি আবার অনেক পর্যটক নিজেদের ক্যামেরাতে ধরেও রেখেছেন!

স্থানীয় প্রতিবেদন বলছে, শিল্পী এনরিকো বুট্টির তৈরি এই ভাস্কর্যের নাম ডোমিনা। এই ডোমিনাকে জড়িয়ে ধরতে গেছিলেন জার্মান পর্যটক দলের দুই ব্যক্তি। তার জন্য একটি ফোয়ারায় চেপে উঠে বসেন একজন। আরেকজন লাঠি দিয়ে ধাক্কা মারেন মূর্তিতে। ১.৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের মূর্তিটি মাটিতে ভেঙে পড়ে নিমেষে। যখন ওই পর্যটকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়, তারা বলেন মূর্তিটি বালি দিয়ে তৈরি এবং মেরামতের জন্য ন্যূনতম একটি অর্থসাহায্যের প্রস্তাব দেন পর্যটকেরা।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কারা, কীভাবে তুলেছিলেন ভারতের প্রথম সেলফি? তাক লাগাবে ১৮৮০ সালের এই ইতিহাস

First Indian Selfie: ১৮৮০ সালের দিকে তোলা এই ছবিতে রাজা ও রানিকেই দেখা যাচ্ছে ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনে।

গোলফেরিনি জানাচ্ছেন, স্থানীয় পুলিশের কাছে সেই ১৭ জন জার্মান পর্যটকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে, ভাস্কর্যটির যা ক্ষতি হয়েছে তা সবটা মেরামত করা যাবে না আর। মূর্তিটি ১৫০ বছরের পুরোনো। এই প্রাচীন মূর্তিটির বর্তমান মূল্য প্রায় ২০০,০০০ ইউরো। ফোয়ারার টাইলসের যে অতিরিক্ত ক্ষতি হয়েছে তাও মেরামত প্রায় অসম্ভব।

স্রেফ একটা সেলফি তুলতে গিয়ে এই ভয়াবহ বিপর্যয়! ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা যদি বাদও দেওয়া যায়, সামান্য নিয়ন্ত্রণ রাখাও কি সম্ভব নয় এই সোশ্যাল মিডিয়ার আগ্রাসনের উপর? প্রতি মুহূর্তকে ধরে রাখতে গিয়ে আসলে কি আদৌ কোনও মুহূর্ত থেকে যাচ্ছে মানুষের স্মৃতিতে আজীবন? শুধু তো ইতালি নয়, প্রতি গলি, চৌরাস্তা, বাসে, অটোতে, প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তে, অপার্থিব পাহাড় দেখার সময় হোক বা প্রেমের মুহূর্ত- সব কিছু ক্যামেরাবন্দি করার এই সর্বনেশে তাগিদ এল কীভাবে? এল মানুষেরই ক্ষণিকের যাপনের হাত ধরে, এল মানুষেরই চিরকেলে থেকে সাময়িকের প্রতি আকর্ষণ থেকে। এল, নিজের থাকাটিকে অন্যের চোখে আকর্ষণীয় করতে গিয়েই। তাতে জলাঞ্জলি যাক নিভৃতি, জলাঞ্জলি যাক দু'চোখ ভরে দেখার টান, চুলোয় যাক শরীরের আলাপ। যা কিছু ব্যক্তিগত, সবটুকুই নিয়ন আলোর তলে, এসো, ভোগী হয়ে ওঠো!

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ক্লাইভের মুখে দুগ্গা দুগ্গা, কেমন ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রথম দুর্গাপুজো

Shobhabazar Rajbari Durgapuja: শোভাবাজারের গর্ব সাবেকী এক চালার প্রতিমা। প্রতিমা শিল্পী, মোদক, ঢাকি বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছেন এই পুজোর সঙ্গে। দশমীর পুজোর অন্যতম নিয়ম ‘কনকাঞ্জলি প্রথা’। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর।

জিতাষ্টমী থেকে শুরু দেবীর আরাধনা, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজো চলে পনেরো দিন

Jhargram Rajbari Durga Puja: রাজপুতানার ফতেহপুর সিক্রি থেকে আসা চৌহান বংশের ক্ষত্রিয় বীর সর্বেশ্বর সিংহ চৌহান। মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলা অভিযানের সময় তিনি জঙ্গলখণ্ডে আসেন। স্থানীয় জংলি মাল রাজাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত করে তিনি এই জঙ্গলমহলে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। নামের সঙ্গে জুড়ে নেন 'মল্লদেব' উপাধি। আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা সেই জায়গার নাম দেন ঝাড়গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

The Tagore Myth: ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির সামনে রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর দাবি, 'রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাননি।' ফ্যাক্ট-ওয়াচ ও প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মতে, দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ইতিহাসের তথ্য ও তর্কের পরিপ্রেক্ষিতে, দেখে নেওয়া যাক, এই দাবিগুলি কতটা মিথ, কতটা মিথ্যা।

থিম নেই, জাঁকজমক নেই: মানুষের ভালবাসায় গড়া আমার গ্রাম কেশাতড়ার দুর্গাপুজো

Keshatara village Durga Puja: পুজোর সম্পূর্ণ খরচ বহন করেন গ্রামের মানুষই। ইদানীং সরকারি অনুদান মেলে ঠিকই, কিন্তু পুজোর ভোগের চালটা আজও আসে গ্রামের মানুষের দেওয়া টাকা থেকেই।

দুর্গা মুখ তুলে তাকাবেন হকারদের দিকে?

Durga Puja Economy in Bengal: কর্পোরেট পুঁজির প্রভাব, অসংগঠিত অর্থনীতির সংকট, হকার উচ্ছেদ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের আবহে কতটা সুরক্ষিত থাকবে শারদোৎসবের নিজস্ব চরিত্র? পুজোর জৌলুস বাড়লেও নাগরিক স্বাধীনতা, শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হবে?

দুর্গাপুজোর উৎসব, অসুরের শোক: বাংলার ইতিহাসে কার জয়, কার পরাজয়?

Mahishasur Puja: ২০১১-র পুরুলিয়া পার করে ২০১৪-র মালদার গাজল। নিত্যানন্দ হেমব্রমরা শুরু করলেন অসুর আন্দোলন। ততদিনে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে অসুর পুজোর সংখ্যা ৬৫০ ছাড়িয়েছে। কেউ মূর্তি বানিয়ে মহিষাসুর স্মরণ করেন, কেউ ফ্লেক্স বানিয়ে আলোচনা সভা।

প্রতিদিন বদলায় মেনু, বদলায় খাবারের দাম: তবু স্বাদে অটুট কলকাতার সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম

Hotel Siddheswari Ashram: সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে চোখ পড়বে সুবিশাল মেনু বোর্ডে, যাতে মুদ্রিত আছে হোটেলটির সামগ্রিক খাদ্য সমাহার। বোর্ডটিতে সেই দিনের প্রাপ্ত পদের পাশে চকখড়িতে হাতে লেখা সেই দিনের দাম। আর অতি অবশ্যই বাংলা ও ইংরাজিতে লেখা থাকে তারিখ।

যে দুর্গাবাড়ির পঞ্চমুণ্ডির আসনে আজও বসেন দেবী, সেখানেই একদিন শপথ নিতেন বিপ্লবীরা

Gangarampur Durgabari,: তন্ত্রশাস্ত্র অনুসারে, পঞ্চমুণ্ডি আসন সাধারণ কোনো বেদি নয়। পাঁচটি নির্দিষ্ট খুলি বা করোটি—যেমন চণ্ডাল বা ডোমের, শিয়ালের, বেজি বা নেউলের, বিষধর সাপের এবং হনুমানের খুলি মাটির নিচে নির্দিষ্ট নিয়মে পুঁতে এই আসন তৈরি করা হয়।