গরম ফুলকো লুচি বানাতে অপরিহার্য, কিন্তু 'ময়ান' শব্দের আসল অর্থ কী? ফেল করেছে অভিধানও

রান্নাবান্নার পত্রপত্রিকার বিভিন্ন রেসিপিতেও শব্দটি ঘনঘন পাওয়া যাবে। তবে 'ময়ান' শব্দটির উৎস নিয়ে কিন্তু পাকা অভিধান-প্রণেতারাও বিভ্রান্ত।

Asit Das
৪ মিনিট
গরম ফুলকো লুচি বানাতে অপরিহার্য, কিন্তু 'ময়ান' শব্দের আসল অর্থ কী? ফেল করেছে অভিধানও

এবারের আলোচ্য শব্দ 'ময়ান'। ময়দা মাখার সময় তাতে ময়ান না দিলে যে লুচি 'ফুলকো' হয় না, কচুরি, নিমকিও খাস্তা বা মুচমুচে হয় না, তা জানার জন্য পাকা গিন্নি হওয়ার দরকার নেই। রান্নাবান্নার পত্রপত্রিকার বিভিন্ন রেসিপিতেও শব্দটি ঘনঘন পাওয়া যাবে। তবে 'ময়ান' শব্দটির উৎস নিয়ে কিন্তু পাকা অভিধান-প্রণেতারাও বিভ্রান্ত।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বঙ্গীয় শব্দকোষ'-এ ময়ান শব্দের ব্যুৎপত্তি দেওয়া হয়েছে, [হিন্দি মোয়ন; তুলনীয় 'সং √মুদ্– √মোদি (মিশ্রণ) –মোদন > প্রাকৃত* মোয়ণ]। অর্থ, 'ঠাসিবার সময়ে ময়দায় মিশ্রিত ঘৃত'। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের 'বাঙ্গালাভাষার অভিধান'-এ ময়ানের ব্যুৎপত্তি আছে, '(এ আন্)) [মর্দ্দন বা মলন>]। অর্থ, 'লুচী, কচুরী, নিমকি ইত্যাদি প্রস্তুতের পূর্বে ময়দা মাখিবার সময় তাতে ঘৃত মিশ্রণ।' সুবলচন্দ্র মিত্র প্রণীত 'সরল বাঙ্গালা অভিধান'-এ ময়ান শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে, 'ময়দা প্রভৃতি মাখিবার সময় নরম করিবার জন্য যে ঘৃতাদি সংযোগ করা হয়; কোমলতাসাধক বস্তু।' শব্দটিকে 'বাংলা ভাষায় প্রচলিত' বলে দায় এড়ানো হয়েছে।

সংসদ বাংলা অভিধানে অর্থ দেওয়া হয়েছে, 'ময়দা মাখার সময় তাতে যে ঘি মেশানো হয়, বা ময়দায় ঘিয়ের মিশেল।' শব্দটিকে 'দেশি' বলে অভিহিত করা হয়েছে। ঢাকার বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান-এ ময়ান শব্দটিকে দেশি বলা হয়েছে। অর্থ আছে, 'লুচি প্রভৃতি তৈরির সময় ময়দায় যে ঘি বা তেল মেশানো হয়; ময়দা মাখানোর ঘি বা তেল।'

গোলাম মুরশিদ সম্পাদিত 'বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক অভিধান'-এ ময়ান শব্দটির এন্ট্রি নেই। কেন নেই, সেটাই বিস্ময়ের। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে বাঙালির হেঁশেলের শব্দ ময়ান নিয়ে নানামুনির নানা মত। সংস্কৃত বা তৎসম, হিন্দি, দেশি, বাংলা প্রচলিত, সবই বলা হয়েছে অভিধানগুলিতে। হিমানীশ গোস্বামীর 'অভিধানাইপানাই' দেখা হয়নি অবশ্য!

খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত মাখনের শরণাপন্ন হতে হল। দই থেকে প্রাপ্ত স্নেহপদার্থ বা চর্বির নাম মাখন। এই মাখন এসেছে তৎসম 'ম্রক্ষণ' শব্দ থেকে। সংস্কৃত 'ম্রক্ষণ' থেকে মৈথিলি 'মকখন্' হয়ে বাংলায় মাখন এসেছে। ম্রক্ষণ মানে মাখা বা লেপন করা। মাখনকে জ্বাল দিয়েই তো ঘি তৈরি করা হয়। মাখন ও ঘি তাই একই জিনিসের রূপান্তর। মৈথিলি 'মকখন্' থেকেই ময়ান আসেনি তো? মকখন্ > মঅহন > ময়ন > ময়ান। অসম্ভব কিছু নয়, এলেও আসতে পারে।

আবার, আর একটি দিক চিন্তা করে দেখতেই হল। বাঙালির হেঁশেলে মুঘল অনুপ্রবেশ ঘটেছে তো সেই কবেই। মোগলাই খানার রন্ধনকারীকে 'বাবুর্চি' বলা হতো। শব্দটি তুর্কি 'বাবরচী' থেকে এসেছে। এখন ধনী গৃহে বা হোটেলে সব রাঁধুনিকেই বাবুর্চি বলে। ফরাসি থেকে আসা শব্দ শেফ (Chef) অবশ্য বাবুর্চিকে কিছুটা কোনঠাসা করেছে ইদানীং।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
'যার ধন তার ধন নয়...', কেন 'নেপোয় মারে দই'? অভিধান ঘেঁটে যে উত্তর পাওয়া যায়

বাংলা প্রবাদ 'যার ধন তার ধন নয়, নেপোয় মারে দই।' কোনও কোনও বইয়ে এটি 'নেপো মারে দই' হয়ে গেছে। তা, এই নেপো শব্দের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি কী?

রাঁধুনি, বাবুর্চি, বা শেফ, যাই-ই বলুন না কেন, লুচি, কচুরি, নিমকি বানাতে গেলে ময়দায় ময়ান দিতেই হবে। ময়দা শব্দটি এসেছে ফারসি 'ময়্দহ্' থেকে। ময়ান শব্দটি কি তাহলে আরবি-ফারসি থেকে বাংলায় আসতে পারে? অনুসন্ধান চালিয়ে যেতেই হলো। অনেক খোঁজার পর দেখলাম, মোহাম্মদ হারুন রশিদ সংকলিত ও সম্পাদিত 'বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত আরবি ফারসি উর্দু শব্দের অভিধান'-এ মঈন বা 'ময়িন' বলে একটি শব্দ আছে। বাংলায় এর অর্থ সাহায্যকারী বা সহায়ক। আরবি 'মুয়িন' থেকে বাংলায় এসেছে।

ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমানের 'আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধান'-এ মঈন শব্দটির অতিরিক্ত একটি অর্থ দেওয়া হয়েছে 'রসদ জোগানদাতা'। যাই হোক, ময়ান শব্দটির অর্থ 'সহায়ক' ধরলে, একটি বুদ্ধিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কেমিস্ট্রি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন 'অনুঘটক' বলে যে জিনিসটি আছে, তা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এর ভূমিকা সহায়কের। লুচি ভাজার সময় ময়দার নেচির ঘি বা তেল কড়াইয়ের তরলে যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়, তা লুচিকে বেশি ফুলতে সাহায্য করে। একই সূত্র প্রযোজ্য কচুরি ও নিমকির ক্ষেত্রেও। পরিমাণমতো ময়ান বেশি খাস্তা করে কচুরি ও নিমকিকে।

তাই আরবি মঈন বা ময়িন থেকে ময়ান এসেছে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ময়দা যদি ফারসি থেকে আসতে পারে, ময়ান আরবি থেকে আসতে দোষ কোথায়?

বিদ্যাসাগরের সঙ্গে ময়ানের সম্পর্ক কী? তিনি যেমন বিদ্যার সাগর ছিলেন, তেমনই ভোজনরসিকও ছিলেন। যদিও ১৮৬৬ সালে স্কুল পরিদর্শন করে ফেরার সময় ঘোড়ার গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে যকৃতে আঘাত পাওয়ার পর তিনি স্বল্পাহারী হয়ে পড়েন। একবার স্কুলপরিদর্শনে গেলে এক মধ্যবিত্ত ছাপোষা ভদ্রলোকের বাড়িতে ভোজনের ব্যবস্থা করা হয় তাঁর। তিনি খেতে খেতে ভূয়সী প্রশংসা করছিলেন রান্নার। সাদামাটা রান্নাই গৃহস্বামীর আন্তরিকতায় অসাধারণ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে। তাই তিনি মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করছিলেন রান্নার।এই দৃশ্য দেখে এক ধনী ব্যক্তি কয়েকদিন পরে বিদ্যাসাগরমহাশয়কে তাঁর নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে ভূরিভোজে আপ্যায়িত করলেন। বিদ্যাসাগর খেয়ে যাচ্ছিলেন সবই, কিন্তু কোনও প্রশংসা বা স্তুতি করছিলেন না রান্নার। এই দেখে গৃহকর্তা বড়ই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। বিদ্যাসাগরকে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, 'স্যর, রান্না ঠিক আছে তো?'

বিদ্যাসাগর ছিলেন রসের সাগর। মুচকি হেসে বললেন, 'ঠিকই আছে, তবে ময়ান নেই।'

গৃহকর্তা ভীষণ ঘাবড়ে গিয়ে জানতে চান, 'কীসের ময়ান, কীসের?'

বিদ্যাসাগর গম্ভীরভাবে বললেন, 'মনের ময়ান।'

তার মানে ময়ানের ক্যাটালিস্ট-ভাবমূর্তি বিদ্যাসাগরের সময়েও ছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমগ্র রচনাবলিতে 'ময়ান' শব্দের উল্লেখ নেই। অন্তত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের 'BichitraTagore Variorum' খুঁজলে 'ময়ান' শব্দের খোঁজ মেলে না। অথচ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পাকশালে মুসলমান বাবুর্চি, বার্মিজ রাঁধুনিও ছিল। হিঁদু রান্নার ঠাকুররা তো ছিলই। ময়ান কি তাহলে অন্য নামে পরিচিত ছিল ঠাকুরবাড়িতে? কে জানে!

ময়ান নিয়ে সাতকাহন করার একটাই উদ্দেশ্য, পাকা রাঁধুনিদের এই শব্দের উৎস সম্বন্ধে সচেতন করা। গরম গরম ফুলকো লুচি তৈরি করা তো যে সে রাঁধুনির কম্মো নয়! আলুর দমে ময়ান লাগে কিনা সেটা অবশ্য আমার জানা নেই।

লিখেছেন
Asit Das
Asit Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

ঋত্বিক: ফিরে দেখা

Ritwik Ghatak: আমরা যখন ছোট ছিলাম, মানে ষাটের দশকের সেই শেষ দিকে বা সত্তরের দশকে, তিনি কত না অদ্ভুতভাবে আমাদের প্রভাবিত করতেন। যেমন একদিন আমাদের রবীন্দ্রসদনের সামনে দেখতে পেয়ে তিনি হঠাৎ বললেন, আমাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে?

কলকাতায় চালু হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস

West Bengal School of Magic: মুখ্যমন্ত্রী ‘পশ্চিমবঙ্গ স্কুল অফ ম্যাজিক, ইল্যুশন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস’ স্থাপনের প্রস্তাবে অনুমোদন করেছেন। পুজোর পর উপদেষ্টা কমিটির সদস্যরা বৈঠক করবেন।

বিভূতিভূষণের উপন্যাস কেবল দৃশ্যের নয়, শব্দেরও এক জগৎ তৈরি করে

Bibhutibhushan Bandyopadhyay: বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণকে আমরা সাধারণত প্রকৃতির কবি বলেই চিনি। তাঁর বর্ণনায় নদী, মাঠ, বন, আকাশ, ঋতু আর গ্রামীণ জীবনের যে ছবি ফুটে ওঠে, তা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যকে যদি একটু অন্য দিক থেকে দেখা যায়? যদি আমরা শুধু দৃশ্যের দিকে না তাকিয়ে শোনার চেষ্টা করি?

স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও আমেরিকার অভিবাসন: আমেরিকার ইতিহাসে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা কোথায়?

Statue of Liberty: স্ট্যাচু অব লিবার্টির ধারণার সূত্রপাত ১৮৬৫ সালে। ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ এদুয়ার্দ দ্য লাবুলে আমেরিকার স্বাধীনতার শতবর্ষ এবং ফ্রান্স-আমেরিকার বন্ধুত্বকে স্মরণ করে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ধারণা দেন।

এশিয়ার সেরা মিউজিয়ামের স্বীকৃতি পাটনার, কীভাবে বিশ্বসেরাদের টেক্কা দিল বিহার মিউজিয়াম?

Patna Outranks paris: বিশ্বের সেরা ১০০টি মিউজিয়ামের তালিকায় নবম স্থান অর্জন করে কীভাবে ল্যুভর ও মেটের মতো বিখ্যাত জাদুঘরকে পিছনে ফেলে এশিয়ার সেরা মিউজিয়াম হয়ে উঠল পাটনার বিহার মিউজিয়াম?

দেশভাগের ইতিহাসকে নারীর চোখে দেখা: অংশুমান করের ‘হিরণবালা’

Hiranbala Novel Review: বাংলা উদ্বাস্তু-আখ্যানের বড় অংশে দেশভাগের অভিজ্ঞতা এসেছে পুরুষের জীবন, তার মনস্তত্ত্ব ও তার গতিবিধির ভিতর দিয়ে। ‘হিরণবালা’ প্রথমেই এই কাঠামো ভেঙে দেয়। উদ্বাস্তু পরিবারের গল্পে একজন নারীকে নিষ্ক্রিয় বা পরোক্ষ ভূমিকায় না দেখিয়ে, উদ্বাস্তু হওয়ার অভিজ্ঞতাটিকে প্রত্যক্ষভাবে বুনে দেয় নারীটির জীবন। দেশভাগকে প্রায় অদৃশ্য করে হিরণকে উদ্বাস্তু করা শুরু হয় ১৯৪৬ সালে, বিয়ের মধ্য দিয়ে।

সুকুমার রায়ের সঙ্গে চার্লি চ্যাপলিনের ভীষণ মিল পাই: স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত

Sukumar Ray Literature: কেউ যদি অনেক বড় বয়সেও ছোট থাকতে চায়— যেমন আমি বলি যে আমার বয়স বাড়েনি— আর যদি নিজের বয়সটাকে একই জায়গায় ধরে রাখতে ইচ্ছে করে, তবে মনে হয় সুকুমার রায়ের সমগ্র তাঁর সারাজীবন বিছানার পাশে গীতবিতানের মতোই চিরসঙ্গী হয়ে থাকতে পারে।

বাংলার দেশি খাসির মাংস থেকে চিংড়ি শুঁটকি, জিআই তকমার অপেক্ষায় কোন কোন খাবার?

GI Tag Registration: বাংলার দেশি খাসির মাংস, ইলিশের বিভিন্ন পণ্য ও চিংড়ি শুঁটকি জিআই স্বীকৃতি পেতে চলেছে। আবেদন প্রক্রিয়া এগিয়েছে, আগামী এক বছরের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার আশা। কিন্তু জিআই তকমা কী এবং এই স্বীকৃতি পেলে বাংলার উৎপাদকদের কী লাভ হবে?