এলিফ্যান্ট ক্রসিং জোন

Hamiruddin Middya
৪ মিনিট
এলিফ্যান্ট ক্রসিং জোন

সবাই এটা জানে যে, শীতকাল এলেই ওরা দল বেঁধে বন থেকে বেরিয়ে আসবে লোকালয়ে আর প্রতিবারের মতো শাকসবজি,ধানের খেত,আখের খেত,কলাবাগান সব তছনছ করে দিয়ে যাবে। এটা জেনে-বুঝেও কেউ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না,কেননা তারা সবাই চাষি। চাষ ছাড়া অন্য কাজ কেউ তেমন জানে না।

এক পাশে শাল-সেগুন, মহুয়ার বন। ফাল্গুন মাস পড়ার আগেই সব পাতা ঝরিয়ে গাছগুলো উলঙ্গ হয়ে যায়। হাতিদের এই সময়টা খাদ্যের বড়ই সংকট।

বনের অন্য পাশে চাষের খেত,ছোট ছোট গ্রাম,গ্রামের পর আবার খেত,খেতের পর আবার গ্রাম। ফসলের ঘ্রাণে ক্ষুধার্ত প্রাণীগুলো বেরিয়ে আসে সন্ধেবেলা,সারারাত পেটপুজো করে সকালের আলো ফোটার আগেই আবার হেলতে দুলতে বনে ফিরে যায়।

একদিন চাষিরা আলোচনায় বসল,বার বার এমন ক্ষয়ক্ষতি তো মেনে নেওয়া যায় না। এর একটা বিহিত করা দরকার। তাদের রাজা করছে কী! বন-জঙ্গল,পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র সবই তো তার সম্পত্তি। কারও গোয়ালের গরু অন্যের খেতে মুখ দিলে যেমন চাষি দু'-টো কথা শুনিয়ে দেয়,পরেরবার আটকে না রাখলে মুড়ির সঙ্গে কীটনাশক বিষ মিশিয়ে খেতের পাশে নামিয়ে দেয়।তুমি বন-জঙ্গলের মালিক হয়ে কেন তোমার জীব-জন্তুগুলোকে সামলে রাখবে না। এ তো ভারী অন্যায়!

কেউ কেউ খুবই উত্তেজিত।বলল,এবার আসুক দেখি হাতিরা।বোম ছুঁড়ে মারব। বিষ-তীর চালাব। দু'একটা হাতি না মরলে রাজার টনক নড়বে না।

ঘরের বউ-ঝি'রা জিভ কেটে বলল,বালাইষাট! এমন কথা মুখে আনো না। গণেশ বাবাজি।ভগবান পাপ দেবে। সংসারের অমঙ্গল হবে।

গৃহিণীদের কথা কানে তুলল না চাষিরা। কত কষ্ট করে,ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায় তারা। সেই ফসল বনের পশুরা এসে খেয়ে যাবে! মগের মুল্লুক নাকি! চাষের যা খরচ,সেই অনুপাতে ফসলের দামই নেই। আবার রাজার কর আছে,খাজনা আছে। সব হিসেব করে দেখতে গেলে,ঘুরে লস। লাভ-লোকসানের অঙ্কটা তো তারা ভালো করে শেখেনি। তারা হল সব মুর্খ চাষি। শুধু লাঙল চালাতে জানে। ফসল ফলাতে জানে। বলতে যাও,শুনিয়ে দেবে— চাষ না করলে খাবে কী!

চাষিরা সব একজোট হল।নানারকম যুক্তি-বুদ্ধি করে ফন্দি এঁটে রাখল। তারপর গুটি গুটি পায়ে শীতকাল নেমে আসতেই প্রতিবারের মতো বাবাজিরাও বেরিয়ে এল দল বেঁধে।

তীর-ধনুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল চাষিরা। হইহই করে উঠল সব। বোম ছোঁড়া হল। বিষ-তীর মারা হল। কেউ বা আগুনে গরম করে লাল টকটকে ছুঁচালো রড ছুঁড়ে মারল। গোঁ-ও-ও,গাঁ-আ-আ করে আকাশে সুড় তুলে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠল হাতিরা। খেপে গিয়ে দু'-একজন মানুষকেও মেরে ফেলল। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে উপরে ডালপালা ঢাকা দিয়ে মরণফাঁদ পেতে রাখা হয়েছিল, একটি হাতির বাচ্চা সেই খালে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেনি। সকালে গ্রামের লোকরা ইট,পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে মেরে ফেলল বাচ্চাটিকে।

ব্যাস! চারিদিকে এবার ত্রাহিত্রাহি রব উঠল। ছুটে এল জঙ্গলের রক্ষকরা। রাজার পাইক-বরকন্দাজরা। কয়েকজনকে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হল। পশু-হত্যার বিচার হবে।

এতদিন বেশ সুখনিদ্রায় দিন কাটাচ্ছিল বনের রক্ষকরা,এবার পড়ল মহাচিন্তায়।শুধু হাতিকে মারা হয়েছে বলে রাজা একপেশে বিচার করলে,তা তো কেউ মানবে না। যেহেতু হাতিতেও মানুষ মেরেছে।

চাষিরা রাজার বনরক্ষককে স্পষ্ট শুনিয়ে দিল,হাতিগুলোকে আটকে রাখো তোমরা। বার বার আমাদের ফসল খেয়ে নিলে,তছনছ করে দিলে আমরা খাব কী! আবার যদি ফসল খেতে আসে, তো দেখিয়ে দেব এবার!

বনরক্ষকরা জানাল,বনের কোনো পশুকেই তো মারা চলবে না। সেটা রাজার নির্দেশ। সবাই এটা ভালো করেই জানো যে রাজার নির্দেশ কেউ অমান্য করলে কঠোর সাজা ভোগ করতে হয়।

তো আমাদের ফসলের কী হবে?

রাজা ক্ষতিপূরণ দেবে।

মানুষ মারলে?

তারও ক্ষতিপূরণ দেবে।

চাষিরা এবার একটু শান্ত হল।

নিয়ম করে শীত আসে। মাঠের ফসল পেকে হলুদ হয়। আর বনের হাতিরাও ঠিক হাজির হয়ে যায় সময় মতো। সন্ধে থেকেই সতর্ক থাকে চাষিরা। কেউ আর বিষ-তীর ছুঁড়ে না,বোম ছুঁড়েও মারে না। মরণফাঁদও পাতে না। খেতের ধারে ধারে মশাল জ্বেলে দাঁড়িয়ে থাকে। টিন বাজিয়ে,হই-হুল্লোড় করে খেদিয়ে দেয় হাতিদের। হাতিরা ভয়ে অন্য গ্রামের দিকে পা বাড়ায়। যে গ্রামের দিকেই যাক না কেন,এটা জেনে রাখা দরকার কোনও গ্রামের চাষিই কিন্তু নাক ডেকে ঘুমায় না। হইচই শুনলেই বেরিয়ে আসে। সারারাত এ গ্রাম,সে গ্রাম চরকি ঘোরা ঘুরে ঘুরে ক্ষুধার্ত হাতিরা খেপে ওঠে। দল ভেঙে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সামনে যাকে পায়,পায়ের তলায় পিষে দেয়। পরদিন খবর হয়। বনরক্ষকরা ছুটে আসে। রাজার কাছে ক্ষতিপূরণের আর্জি পাঠানো হয়।

ক্ষতিপূরণ দিতে দিতে রাজা আলাতন হয়ে পড়ল। একদিন ভাবল,হাতিতে যদি রোজ এত এত মানুষ মেরে ফেলে, খেত,ফসল তছনছ করে দেয়,তাহলে তো রাজ-কোষাগার খালি হয়ে যাবে!

ভাবতে ভাবতেই ব্যবস্থা নিয়ে ফেলল রাজা। হাজার হাজার মানুষকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গলের চারিধার দশহাত গভীর খাল কাটা করাল। কোথাও কোথাও দেওয়া হল কাঁটাতারের বেড়া। এবার বেরোও দেখি হাতি বাবাজিরা!

রাজা প্রজাদের নির্দেশ দিল,কেউ কাঁটাতার ডিঙিয়ে ভেতরে ঢুকবে না। হাতিরাও আর এপারে আসবে না। এই নিয়ম যেই ভাঙবে,তাকে গুলি করে মারা হবে।

কিন্তু রাজার নির্দেশই তো শেষ কথা নয়। আর বনরক্ষকদেরও রাজার কথা শুনলে পেট ভরে না। জঙ্গলের কাঠ,মধু,মোম সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করে বেশ কিছু মানুষ। ফলে কাঁটাতার ডিঙিয়ে তাদের ভেতরে ঢুকতেই হয়। আর শীতকালে পেটের টান পড়লে হাতিরাও এপারে আসার চেষ্টা করে। তাই কাঁটাতারের দু'-পাশ থেকেই মাঝেমধ্যে গুলির শব্দ ভেসে আসে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।